অনির্বাণ ঘোষ:‌ নিজের মা গেয়া–র প্ররোচনায় দেবতা ক্রোনাস বাবা ইউরেনাসকে আক্রমণ করে। একটা কাস্তে দিয়ে কেটে ফেলে ইউরেনাসের পুরুষাঙ্গ। সেটি সমুদ্রে পড়লে তার ফেনা থেকে তৈরী হয় অ্যাফ্রোদিতি বা ভেনাস। জন্ম হয় সৌন্দর্যের আর প্রেমের দেবীর।
—গ্রীক পুরাণ।

❏‌ ৭ ফেব্রুয়ারি,১৪৯৭, ফ্লোরেন্স

ফ্লোরেন্স শহরের প্রাণকেন্দ্র পিয়াজা দেল সিগনোরিয়া। পালাজো ভেচ্চিও–র সামনেই এই ফাঁকা জায়গাটা। শহরের সব আনন্দ উৎসবগুলো এখানেই হয়। আজকেও এক উৎসবে মেতেছে বেশ কিছু লোক। তবে তাতে কতটা আনন্দ মিশে আছে তাতে সংশয় রয়েছে। যেটা আছে সেটাকে পাশবিক উন্মত্ততা ছাড়া আর কিছু বলা যায় না। পিয়াজা দেল সিগনোরিয়ার ঠিক মাঝখানে এখন আগুন জ্বলছে। সাততলা বাড়ির সমান উঁচু একটা স্তুপ সেই আগুনের জ্বালানি। স্তুপটা তৈরি হয়েছে ক্যানভাস আর কাঠের ওপরে আঁকা ছবি, মূর্তি, অজস্র বই, মায়েস্ত্রোদের লেখা পাণ্ডুলিপি, শহরের মেয়েদের অলংকার, পরনের আধুনিক পোষাক, আয়না, কাঠের তৈরি বাজনা আরও আরও কতকিছু দিয়ে। বলতে গেলে রেঁনেসার একটা সোনার সময়কে গিলে নিচ্ছে ওই আগুন।
পাঁঁচবছর আগেই লোরেঞ্জো দি ম্যাগনিফিসেন্ট মারা গেছেন। মেদিচিদের সরিয়ে ফ্লোরেন্সের মসনদে চড়ে বসেছেন সাভানোরোলা। সাভানোরোলা গোঁড়া খ্রিষ্টান। মেদিচিদের ছাতার নিচে ফ্লোরেন্সে মানুষ পুজোর জোয়ার এসেছিল। আঁকায়,লেখায় স্থাপত্যে তখন ভগবানের সেরা সৃষ্টির জয়জয়কার চলছে। এখানেই সাভানোরোলার আপত্তি। প্রভুই শ্রেষ্ঠ, যদি মূর্তি তৈরি হয় তবে সেটা প্রভুরই হবে, ছবিও আঁকা হবে তাকে ঘিরেই। পদ্য গদ্যে থাকবে তারই মহিমা। তা না করে এই হীন শহরবাসী এতদিন মেতে ছিল রংচঙে ছবি, নগ্ন মূর্তি, প্রেমের রসে ডুবে যাওয়া কবিতাগুলো নিয়ে!‌ ছি ছি, এভাবে  প্রভুর কাছে পৌঁছানো যায় নাকি থোড়াই? একটাই দাওয়াই এর, পুড়িয়ে দাও সব কিছু।
ধর্ম আর রাজনীতি হল গলায়-গলায় বন্ধু, সবসময় হাতে হাত মিলিয়ে চলে। আর তাদের আদর্শ চাপিয়ে দেয় সাধারণ মানুষের মতো। মানুষ সেটা মেনেও নেয়। পোষা ভেড়ার মত নিজেদের চিন্তাশক্তি ভুলে জড়ো হতে থাকে মেষপালকের ছড়ির নিচে। সেবারেও তেমনটাই হল। ফ্লোরেন্সের মানুষের হঠাৎ মনে হল সাভানোরোলাই ঠিক। শহরের নামী শিল্পীরাও মস্তিষ্ক প্রক্ষালিত হয়ে ভাবল কি ভুলটাই না করেছে তারা এতদিন ধরে। নিজেরাই নিজেদের সৃষ্টিগুলোকে এনে জড়ো করতে লাগল পিয়াজা দেল সিগনোরিয়ার মাঝখানে। তারপরে আগুনের স্পর্শটুকু দিতে তো সময়ের অপেক্ষা। দাউদাউ করে জ্বলতে থাকা লেলিহান শিখার চারিদিকে সাভারোনোলার ভক্তরা যখন উল্লাসে মত্ত তখন তাদের মধ্যে দেখা গেল ৫২ বছরের এক মাঝবয়সি লোককে। উদ্ভ্রান্ত দৃষ্টি নিয়ে একটা কোণে দাঁড়িয়ে রয়েছে সে। বাকি শিল্পীদের মতো তারও মনে হয়েছে সাভানোরোলাই ঠিক। নিজে হাতে নিজের আঁকা ছবিগুলোকে বিসর্জন দিয়েছেন বুভুক্ষু আগুনের মুখে। বাদবাকি জীবনে এঁকে আর কখনও ধর্মীয় ছবি ছাড়া আর কিছু আঁকতে দেখা যাবে না। তবে সব ছবিই কি পুড়িয়ে ফেললেন?
না, সাভানোরোলা–কে লুকিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছেন কিছু ছবি। তার মধ্যে দু’‌টি তাঁর খুব খুব কাছের। দু’‌টি ছবিই গ্রীক–রোমান দেবী ভেনাসের। এমন একটা পেগান দেবীর ছবি লুকানো আছে জানতে পারলে সাভানোরোলা তাঁর প্রাণও নিতে পারে। কিছু এসে যায় না যদিও তাতে। ওই ছবি দুটোই তার প্রাণ, ওখানেই অমর করে রেখেছেন তিনি এক মেয়েকে।
শিল্পীর নাম?‌ সান্দ্রো বতিচেল্লি।


আর মেয়েটির নাম সিমোনেতা।


❏‌ ফেব্রুয়ারি ১৪৭৬, ফ্লোরেন্স
‘‌রূপ হল মেয়েদের একটা অস্ত্র, একটা হাতিয়ার, ক্ষমতার উৎস।’‌
সেই কোন ছোট্টবেলা থেকে এই কথাটা শুনে আসছে সিমোনেতা। বাবা মা তাকে পাখি পড়ার মতো শিখিয়েছেন এই কথাগুলো। শেখাবেন নাই বা কেন? গোটা উত্তর ইতালিতে সিমোনেতার রূপের কোনও জুড়ি নেই। অসামান্যা সুন্দরী সে। লম্বা লম্বা চোখ, টিকলো নাক, পাতলা ঠোঁট, সরু গ্রীবা, সোনার মতো গায়ের রঙ। শরীরের কোথাও মেদের বাহুল্য নেই। শরীর, এই সুন্দর শরীরই তো আজকে ওকে সমাজের উঁচুতলার মানুষদের সাথে এক আসনে বসার সুযোগ করে দিয়েছে। সিমোনেতার বাবা মায়ের পয়সাকড়ি ছিল না, কিন্তু বুদ্ধিটি ছিল যথেষ্ট। তাই তাদের সুন্দরী কন্যাটির সাথে বিয়ে দিয়ে দেন উচ্চবিত্ত মার্কো ভেসপুচির সাথে। সিমোনেতার বয়স তখন ষোলো। বিয়ে থেকে পাওয়া যৌতুকে সিমোনেতার বাবা মায়েরও বেশ লাভ হল। ভেসপুচিরা আবার ফ্লোরেন্সের সর্বেসর্বা মেদিচিদের খুব ঘনিষ্ঠ। তাই মার্কো আর সিমোনেতার বিয়ে হয়েছিল মেদিচিদের বিশাল প্রাসাদে। বিয়ের পরে তারা ফ্লোরেন্সেই থাকতে শুরু করে।
এই মুহূর্তে সিমোনেতা বসে আছে ফ্লোরেন্সের পিয়াজা সান্তা ক্রোচের ফাঁকা জায়গাটার চারিদিকে বানানো গ্যালারিতে। ওর সাথে বসে আছেন সিগনোরির সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি এবং তাদের স্ত্রী–রা। সিমোনেতার সাথে তার স্বামীও রয়েছেন। পিয়াজার লম্বা বড় ফাঁকা জায়গাটা ঘিরে রাখা আছে সিগনোরির পতাকা দিয়ে। রোমহর্ষক এক খেলা শুরু হবে এখন, এর নাম জিওস্ত্রা। দুদিক ঘোড়ায় চড়ে  ছুটে আসবে দুই যুযুধান প্রতিপক্ষ, তাদের হাতে থাকবে একটি করে বর্শা। লক্ষ্য প্রতিদ্বন্দ্বীকে আঘাত করে ঘোড়া থেকে ফেলে দেওয়া। দিতে পারলেই জিত। খুব মারাত্মক এই খেলা। বর্শার আঘাতে বা ঘোড়া থেকে পড়ে মৃত্যু হয়েছে আগে অনেকের। বেঁচে গেলেও পঙ্গু হয়ে কাটাতে হয়েছে বাকি জীবন।
প্রথম ঘোড়সওয়ার বেড়িয়ে এলেন। ধীর চালে এগোতে লাগল ঘোড়া। কিন্তু দর্শকদের চোখ উল্টোদিকে। তারা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন অন্য কারও জন্য। খানিক পরেই সেদিক থেকে আর এক ঘোড়সওয়ার বেরিয়ে আসতেই সবাই উল্লাসে ফেটে পড়ল। ফ্লোরেন্সের সেরা জিওস্ত্রা খেলোয়ারকে স্বাগত জানাতে অনেকে উঠে দাঁড়ালো চেয়ার থেকে। বেশ লম্বা চওড়া দেহের গঠন। গায়ে অন্য ঘোড়সওয়ারটির মতোই শক্ত বর্ম। গাঢ় নীল রঙের। বুকের কাছে দেখা যাচ্ছে সিগনোরির চিহ্ন। হাতে একটা লম্বা বর্শা। তার সুচালো মাথাটা মোড়া পিতল দিয়ে। সেখানে লাগানো একটা হলুদ পতাকা। তাতে আঁকা থাকার কথা গ্রীক যুদ্ধের দেবী অ্যাথেনার ছবি। কিন্তু তাতো নেই!
দর্শকদের নজর এবারে ঘুরে গেল সিমোনেতার দিকে। সিমোনেতা নিজেও এবারে বেশ অপ্রস্তত বোধ করছে। অ্যাথেনার জায়গায় যে তারই মুখ আঁকা! নীচে লেখা ‘অতুলনীয়া’। বিবাহিতা সিমোনেতাকে এই লোকটি ভালবাসে। সিমোনেতা সেটা ভাল ভাবেই জানে। কিন্তু প্রকাশ্যে সেটা জাহির করতে এর এতটুকুও বাঁধল না! অবশ্য বাঁধবেই বা কেন। গোটা শহরটা চলে এঁর অঙ্গুলীহিলনে। সিমোনেতার স্বামীরও তাই মাথা নিচু করে বসে থাকা ছাড়া আর কিছু করার নেই। সেও এর হাতের পুতুল। গোলাপ ফুটলে তার গন্ধ ছড়িয়ে পরতে সময় লাগে না। সিমোনেতার যৌবনের গন্ধে পাগল হয়েছে গিউলিয়ানো মেদিচি, লোরেঞ্জো দি ম্যাগনিফিসেন্টের নিজের ভাই। সিমোনেতা গিউলিয়ানোর এই প্রেমকে উস্কানি দেয়। এই ওকে নিয়ে যাবে আরও আরও উঁচুতে। কিন্তু গিউলিউয়ানোর প্রেমটা কি শরীরের নয়? কতটুকু চেনে সে সিমোনেতাকে? কতটুকু জানতে চায় তার মনকে।

ওর এই সৌন্দর্যই ওর অভিশাপ। পুরুষের চোখের কামনাগুলো কেমন সাপের মতো জড়িয়ে ফেলে ওর শরীরটাকে। দম বন্ধ হয়ে আসে...‌
এমন সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতেই সিমোনেতার মনে পড়ে পরে যায় অন্য এক জোড়া চোখের কথা। কদিন আগেই ওর ছবি আঁকার জন্য গিউলিয়ানো বছর তিরিশের এক শিল্পীকে পাঠিয়েছিল ওর কাছে। সেই মুখচোরা ছেলেটা ওই চোখজোড়ার মালিক। একটু একটু করে সেদিন সিমোনেতার একটা স্কেচ বানিয়ে ছিল সে। দু’‌জনের মধ্যে একটা শব্দেরও আদান প্রদান হয়নি। শুধু কয়েকবার চোখে চোখে ঠোকাঠুকি হয়েছিল। কিন্তু ছেলেটা চলে যাওয়ার পরেও সিমোনেতা চোখ দুটো ভুলতে পারেনি। সেখানে কোনও কামনা, লালসা নেই। অন্যকিছু ছিল যেটা ও বুঝে উঠতে পারেনি। গিউলিয়ানোর বর্শার পতাকার ছবিটাও ওই যুবকেরই আঁকা।
সান্দ্রো বতিচেল্লিকে আর একবার খুব দেখতে ইচ্ছা করছে সিমোনেতার।

❏‌ ২৮শে এপ্রিল, ১৪৭৬, ফ্লোরেন্স
সিমোনেতার সাথে আবার দেখা হল বতিচেল্লির। এবারে একাকী ঘরের মধ্যে নয়, ভায়া পর সান্তা মারিয়ার রাস্তায়। যেখানে হাজার হাজার মানুষ ভীড় করে আছে ইতালির সেরা সুন্দরী লা বেলা সিমোনেতাকে দেখার জন্য। এই শেষ বারের জন্য। কাল রাতেই ধুম জ্বরের মধ্যে মেয়েটা চলে গেল। সান্দ্রো নির্নিমেষ দৃষ্টিতে দেখল ঘুমিয়ে থাকা সিমোনেতাকে। ওর চোখের কোলে একটু একটু করে জল জমছে তখন। বুকের কাছটা মুচড়িয়ে উঠছে। মাথা নিচু করে ভীড় ঠেলে বেড়িয়ে এল ও। ফিরে তাকাবার শক্তিটুকু অবশিষ্ট নেই আর ওর মধ্যে।

❏‌ জুলাই, ১৪৮৪, ফ্লোরেন্স
অ্যাঞ্জেলো পলিজিয়ানো ফ্লোরেন্সের বেশ নাম করা কবি। খুব সম্প্রতি তিনি গ্রীক কবি হেসিওডের একটা কবিতা পড়ে লিখে ফেলেছেন নিজের একটা পদ্য। তাতে লেখা আছে ভেনাসের জন্মের পরের কিছু মুহূর্তের কথা। কবিতাটা তিনি পড়িয়েও ফেলেছেন তার পৃষ্ঠপোষক লোরেঞ্জো দি মেদিচিকে। লোরেঞ্জোর ছাতার তলায় অ্যাঞ্জেলো ছাড়াও আছে ইতালির সেরা আঁকিয়ে আর স্থাপত্যশিল্পীরা। অ্যাঞ্জেলোর কবিতাটা তাই পড়েই লোরেঞ্জোর মনে হয়েছিল ইশ, এই দারুণ দৃশ্যকল্প যদি চোখে দেখা যেত! সেইজন্যই আজকে লোরেঞ্জো ডাক পাঠিয়েছেন তার অ্যাকাদেমির অন্যতম সেরা এক আঁকিয়েকে। সান্দ্রো বতিচেল্লি কয়েক বছর আগেই সিস্টিন চ্যাপেলের দেওয়ালে ফ্রেস্কো এঁকে বেশ বিখ্যাত হয়েছেন।
—‘‌সান্দ্রো আপনাকে কিন্তু এবারে খ্রিষ্টানদের মন জুগিয়ে কিছু আঁকলে চলবে না। আপনি আমার জন্য একটা দারুণ ভেনাস আঁকুন।’‌
—‘‌ভেনাস তো বছর দু’‌য়েক আগেই আঁকলাম। পিরফ্র‍্যাঞ্চেস্কোর জন্য।’‌
পিরফ্র‍্যাঞ্চেস্কো দি মেদিচি সম্পর্কে লোরেঞ্জোর খুড়তুতো ভাই। তার বিয়ে উপলক্ষেই সান্দ্রো এঁকেছিলেন ভেনাস, স্বর্গের উদ্যানে। সেই ছবি এখন শোভা পাচ্ছে পিরফ্র‍্যাঞ্চেস্কোর শোয়ার ঘরে। অনেক গুজব যদিও ছড়িয়েছিল সেই সময় এই ছবিটাকে নিয়ে। সান্দ্রোকে অনেক কথাও শুনতে হয়েছিল। কিন্তু বরাবরের শান্ত মানুষটা মুখে কুলুপ এঁটে ছিলেন। লোরেঞ্জোও জানেন এই ছবির কথা।
—‘‌হ্যাঁ, সেই ছবি তো আমি দেখেছি। কিন্তু এটা ভেনাসের জন্ম নিয়ে।’‌
—‘‌ওহ আচ্ছা, গ্রীক পুরাণে যেমনটা ছিল?’‌
—‘‌না ঠিক তেমন নয়, একটু অন্যরকম। আপনি অ্যাঞ্জেলো পলিকজিয়ানোর লেখা কবিতাটা পড়েছেন?’‌
—‘‌না, সেটা পড়া হয়নি।’‌
—‘‌পড়ে দেখুন একবার।

ওইরকম কিছু একটা আমাকে বানিয়ে দেখান তো।’‌
লোরেঞ্জোর আবদার রাখতে নয়, নিজের মনের একটা লুকিয়ে রাখা ইচ্ছা থেকেই সান্দ্রো আঁকতে শুরু করল ভেনাসকে। দু’‌বছর পরে, আবার।

❏‌ এপ্রিল, ১৪৮৫, ফ্লোরেন্স
সান্দ্রো ছবিটা আঁকা শেষ করেছেন। ক্যানভাসে আঁকা। আকারে বেশ বড়। ন’ফুট লম্বা, প্রস্থে ছ’ফুট। সেটিকে আজকে নিয়ে আসা হয়েছে লোরেঞ্জোর রিকার্ডি প্যালেসের বিশাল হলঘরে। সেখানে স্বয়ং লোরেঞ্জো ছাড়াও রয়েছেন সিগনোরির বাকি সদস্যরা। আর আছেন অ্যাকাদেমির শিল্পীরা। ছবিটাকে ঘরের মাঝে দাঁড় করিয়ে ওপরের পাতলা কাপড়ের আচ্ছাদনটা সরিয়ে দিলেন বতিচেল্লি। স্তব্ধ হয়ে সবাই দেখতে লাগল একটা অসামান্য সৃষ্টিকে। কিন্তু কয়েক মিনিট পরে নিঃস্তব্ধতা ভেঙে ঘরে একটা চাপা গুঞ্জন শুরু হল।
সমুদ্রে জন্মাবার পরে ভেনাস একটা ঝিনুকে করে আসছে তীরে। ছবির বাঁদিকে বাতাসের দেবতা জেফাইরাস, তাকে জড়িয়ে আছে হাওয়ার পরি ক্লোরিস, জেফাইরাস ফুঁ দিয়ে এগিয়ে দিচ্ছেন ঝিনুকটাকে। ছবির ডানদিকে তটে দাঁড়িয়ে রয়েছেন বসন্তের দেবী পোমোনা। নগ্ন ভেনাসের গায়ে জড়িয়ে দেওয়ার জন্য তার হাতে আছে ফুলের কাজ করা চাদর। জেফাইরাসের ফুঁয়েতে উড়ছে সেই চাদর। যেমন উড়ছে পোমোনার পিছনে থাকা কমলালেবু গাছের পাতাগুলো।
ছবির প্রায় মাঝখানে দাঁড়িয়ে রয়েছেন সদ্যজাত ভেনাস। সম্পুর্ণ নগ্ন সে। এর আগে তো কেউ নগ্ন নারীর ছবি আঁকেননি! চরম দুঃসাহসিক কাজ করেছেন বতিচেল্লি। কিন্তু এক ঐশ্বরিক সৌন্দর্য ভেনাসের শরীরে। লম্বা চেহারা। গায়ের রঙ মুক্তোর মতো। তাতে কোন দাগ নেই, কোন পাপ নেই। প্রায় হাঁটু অবধি লম্বা সোনালী চুল। সেই চুল আর নিজের হাত দিয়ে ভেনাস লজ্জাকে ঢেকে রেখেছেন। আর সবচেয়ে মায়াময় হল মুখখানি। সরু গ্রীবা, টিকোলো নাক, পাতলা ঠোঁট।
খুব চেনা চেনা লাগছে না মুখটা?
সব মিলে যাচ্ছে।
স্বয়ং সিমোনেতা দাঁড়িয়ে রয়েছে ভেনাসের জায়গায়। আজ ওর নগ্নতা কারোর মনে কামনা জাগাচ্ছে না। আলোর মতো রূপের সামনে দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধায় আনত হচ্ছে মাথা। দুবছর আগের ভেনাসের ছবিতেও সিমোনেতাকেই এঁকেছিলেন বতিচেল্লি। গুঞ্জনটা সেই কারণেই উঠেছিল। যেমনটা আজকে আবার উঠল। অন্যদিকে কি অদ্ভুত আরেক সমাপতন। সিমোনেতার জন্ম হয়েছিল সাগরের ধারে পোর্তো ভেনেরে শহরে। যার মানে ভেনাসের শহর। যে মেয়েকে ভালবেসেছিল ফ্লোরেন্সের সবচেয়ে শক্তিশালী পরিবারের পুরুষ, যে মেয়েকে পাশে ট্রফির মতো নিয়ে ঘুরে বেড়াত মার্কো ভেসপুচি, সেই মেয়েকে ভালবেসেছিল একজন আপাতসাধারণ শিল্পী। তাই সিমোনেতা অমর হয়ে রইল ওর তুলিতে। সান্দ্রো বতিচেল্লি তার জীবন যাপনে আর কোনও নারীসঙ্গ করেননি কখনও। কখনও কেউ শোনেনি তার মুখে তার প্রেমের কথা। বতিচেল্লির ভালবাসায় শরীর ছিল না, কোন চাওয়া ছিল না, অভিমান,অনুরাগ, আদর..কিচ্ছু ছিল না। সিমোনেতাও কখনও তার মুখে শোনেনি, ‘ভালবাসি’। ওই শব্দটুকু ছিল অনুচ্চারিত, অব্যক্ত।
সান্দ্রো বতিচেল্লি তার জীবদ্দদশায় একমাত্র একবার সিমোনেতার নাম নিয়েছিলেন প্রকাশ্যে। তার শেষ ইচ্ছার কথা বলার সময়। ১৫১০ সালের ১৭ই মে মানুষটা মারা যাওয়ার পরে তাই তার সেই ইচ্ছা অনুযায়ী তাকে কবর দেওয়া হয় সিমোনেতার কবরের পাশে। ফ্লোরেন্সের অগনিসান্তি চার্চে।
আজও ওরা পাশাপাশি শুয়ে আছে ওইখানেই।

❏‌ শেষের কথা:‌ বতিচেল্লির আঁকা ভেনাসের প্রথম ছবিটার নাম পরে ভাসারি রেখেছিলেন প্রাইমাভেরা। মানে বসন্ত। ১৪৮২ সালে আঁকা প্রাইমাভেরা আর ১৪৮৫ সালে আঁকা বার্থ অফ ভেনাস রেঁনেসার দুই ঐশ্বর্য। দুটো ছবিই এখনও রাখা আছে ফ্লোরেন্সের উফিজি গ্যালারিতে।

জনপ্রিয়

Back To Top