রাজা ভট্টাচার্য : যাঁরা ‌‘‌চলাচল’‌ প্রথম খণ্ড পড়েছেন, তাঁদের নিশ্চয়ই মনে আছে, আমাদের ছোট্ট ইশকুলের প্রথম বছরের অনুষ্ঠান তো হয়ে গেল খুব হই হই করে। পরের বছর সব ক্লাসের ছেলেদের গান তুলে দেওয়া হল একটা করে। মানে, এই ধরুন ক্লাস ফাইভ গাইল ‘‌আলো আমার আলো ওগো’‌। সিক্স গাইল ‘‌ওগো নদী আপন বেগে’‌, এই রকম আর কী, যার যেমন দৌড় তেমনই এক–একটা গান বেছে দেওয়া হল। গাইতে লাগল সব খুব উৎসাহ ভরে। ক্লাস টেনের ভাগ্যে পড়েছিল 'আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে'। অন্যদের তুলনায় ওদের গানটা যেন বড্ড ভারি-সারি, গম্ভীর-গোছের। তালটাও বড় ধীর - ধেয়ে-চলা নদীর মতো 'পাগলপারা' ছন্দ নেই এই গানে। পছন্দ হল না বিশেষ - যখন প্রথমবার আমি গানটা ওদের গেয়ে শোনালাম। হওয়ার কথাও না - সে বয়েসই হয় নি ওদের। তা আমি সাধ্যমত বুঝিয়ে বললাম - "দেখ, তোরা হলি গোটা ইশকুলের মধ্যে সবচেয়ে উঁচু ক্লাস। গান যদি একটু গম্ভীর না হয় - নীচু ক্লাসের ছেলেরা তোদের মান্যি করবে কেন!" ওরা অবিশ্যি খুব-একটা খুশি হল না এসব ছেঁদো যুক্তিতে - তবে ওই...রাজাবাবু স্যার বলেছেন...কী আর করা যাবে। নিমরাজি হয়ে তেতো ওষুধ গেলার মতো অনিচ্ছুক মুখে গাইতে লাগল।
                      কিন্তু এইবার একটা অবাক কাণ্ড ঘটল। গানের কথাটা ভারি বটে, সুরটা তো এক্কেবারে সিধে - আপনারা সব্বাই জানেন সে কথা। তায় কথাগুলোও কেমন যেন মন্ত্রের মতো শুনতে। ফলে হল কি - একতলার মস্ত হলঘরে যেমনি আমার সাথে গলা মিলিয়ে ওরা গাইতে আরম্ভ করছে গানটা - অমনি যেন চিরচেনা বেঞ্চি-ভরা বোর্ড-ঝোলানো ঘরটা ভরে উঠছে সুরে - যেন মন্দিরে বেজে উঠছে সন্ধ্যারতির ঘন্টাধ্বনি,ভেসে আসছে ধুপের গন্ধ। একটা অদ্ভুত পবিত্রতার আঁচ এসে লাগছে ওদের মুখে ; হয়তো অর্থ না-বুঝেই ওরা গেয়ে চলেছে -'মহিমা তব উদ্ভাসিত মহাগগনমাঝে, বিশ্বজগত মণিভূষণ বেষ্টিত চরণে।' অনেকে নিজের অজান্তেই হাত জড়ো করে ঠেকাচ্ছে বুকে, চোখ আসছে বন্ধ হয়ে - যেন ইশকুল শুরুর প্রার্থনা-গানটাই গাইছে। বুঝি আমি ওদের অবস্থা, কেননা অনেক বছর আগে বাবা যখন শেখাত আমায় গানটা - কিচ্ছু না বুঝেও ঠিক এমনিধারা আমারও চোখ আসত বুজে। আজ ওদেরও সেই দশা।
                     সমস্যা হল অন্যদিকে। ছেলেরা লিখে নিয়েছে নিজের নিজের 'ভাগের' গানখানাই। গাইছে সেটাই। অন্যেরা তখন বসে থাকছে চুপটি করে। কিন্তু যেই না গাইতে আরম্ভ করছে ক্লাস টেন - অমনি সব ক্লাসের ছেলেরা গলা মেলাচ্ছে তাতে। নয় থেকে ষোল - নানা বয়েসের শিশু-কিশোর এক সুরে গেয়ে উঠছে গান - সে এক ব্যাপার বটে! ইতিমধ্যে পুরনো ভগ্নপ্রায় প্রাসাদটা ছেড়ে আমাদের ইশকুল উঠে এসেছে পাশেই নতুন তিনতলা বাড়িতে। একতলার হলঘরে চলছে রিহার্সাল। গমগম করে উঠছে মস্ত হলঘরটা। 
                   তা নয় হল - কিন্তু সে কথা ক্লাস টেন মানবে কেন ! সবার মতোই তাদেরও ভাগে পড়েছে একটি মাত্র গান। সেই সবেধন নীলমণিতেও যদি ভাগ বসায় সক্কলে মিলে - কেমন লাগে! কাজেই প্রথমে ঠারেঠোরে, শেষে একেবারে সটান ধমকে উঠে বাকিদের তারা বুঝিয়ে দিল - মোটেই তাদের পছন্দ হচ্ছে না এই ভাগাভাগি। ছোটরাও ছাড়ার পাত্তর নয় ; তারাও কচি গলায় তেড়ে ঝগড়া করতে লাগল -"বা রে, আমরা কি আর আসল দিনে গাইতে যাচ্ছি না কি! এখন তো এমনিই এট্টু গলা মেলাচ্ছিলাম। কী ভাল যে গানটা !" আমিও সাধ্যমতো গম্ভীর হয়ে বললাম -"দেখিস বাপু, সেদিন আবার সবার সামনে গলা মিলিয়ে ফেলিস নে।" তারাও সমস্বরে কথা দিল -"না স্যার, কী যে বলেন - আমরা কি এতই ছোট !" ছোট মুখের মস্ত ভরসা শুনে ক্লাস টেনও ঠান্ডা হল।
                    কার্যকালে দেখা গেল - সগর্বে 'বড় হয়ে যাওয়ার' দাবী জানান ছেলেরা বিশেষ বড় নয়। রবীন্দ্রজয়ন্তীর দিন সবার গান-আবৃত্তি হয়ে যাওয়ার পর গাইতে উঠল ক্লাস টেন। চমৎকার শুরুয়াত হল। কিন্তু যেই-না স্থায়ী শেষ করে তারা প্রথম অন্তরায় ঢুকেছে - অমনি যোগ হতে লাগল একটা একটা করে গলা। আমার চোখ-পাকানো বা ক্লাস টেনের দাদাদের চোখ-রাঙানো তারা টেরই পেল না - কেননা ততক্ষণে তাদের সব্বার চোখ বন্ধ ; একসুরে তন্ময় হয়ে তারা গেয়ে চলল -'গ্রহতারক চন্দ্রতপন ব্যাকুল দ্রুত বেগে'...! ক্রমে ঠোঁট নড়তে লাগল শিক্ষকদেরও। একসময় গোটা ঘর সুরে সুরে ম ম করে উঠল - কচি আর পাকা গলা মিশে গেল সুরের এক ব্যাপ্ত মহা-আবর্তে। বুড়ি কলকাতার ব্যস্ত বড়রাস্তার পাশে, একটা ছোট্ট  স্কুলের হলঘরে সহসা দেখা দিল সেই অনির্বচনীয় আনন্দলোক, জ্বলে উঠল মঙ্গল-আলোক।
                এরপর থেকে নিয়মটা কাজে কাজেই পাকাপাকি ভাবে বদলে গেল। সব ক্লাসের গান-আবৃত্তি-নাটক - সব হয়ে যাওয়ার পর একযোগে সবাই গলা মিলিয়ে গাওয়া হয় 'আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে'। রোজকার ইশকুল শুরুর প্রার্থনার জন্য দাঁড়িয়ে-থাকা বাচ্চাদের মধ্যেও কেউ হঠাৎ গেয়ে ওঠে এই গান - সবচেয়ে কড়া ধাঁচের শিক্ষকও আপত্তি করেন না তাতে। এই গানটাও হয়ে উঠল প্রায় জাতীয় সঙ্গীতের মতোই।

জনপ্রিয়

Back To Top