অভীক সরকার:‌ ‘‌ডর কে আগে জিত হ্যায়/ দাদর কে আগে সীট হ্যায়’‌
মুম্বই মহানগরীর প্রাণভোমরা হচ্ছে তার লোকাল ট্রেন সার্ভিস। ঢাকার আয়ুর্বেদিক ঔষধালয় দেখে নাকি জনৈক বিবসনা সাধু অত্যাশ্চর্য একটি মন্তব্য করেছিলেন, ‘‌অ্যায়সা কাম সত্য ত্রেতা দ্বাপরমে কোই নেহি কিয়া’‌, এই ঘোর কলিতেই প্রথম। মুম্বই লোকালের মতন এমন বহুবর্ণ বিচিত্র প্রতিষ্ঠান দেখে তিনি কী বলতেন সে ভাবতেও রোমাঞ্চ জাগে।
দুরন্ত গতিময় এই শহর কখনও থামে না এমনিতে, সে সন্ত্রাসবাদী হামলাই হোক আর অতিবর্ষণ। কিন্তু যদি লোকাল ট্রেন থেমেছে,  তো ব্যাস,আক্ষা  মুম্বই বন্ধ, বিড়ু ! লোকাল হলো মুম্বইএর লাইফলাইন, সাতরাজার ধন এক মাণিক, অন্ধের যষ্টি, বুকের পাঁজর। ইতিহাসের জানকারি রাখনেওয়ালা প্রাজ্ঞ জনগণ নিশ্চয়ই জানেন, ভারতবর্ষে প্রথম ট্রেন চলে মুম্বইতে,  ভিক্টোরিয়া টার্মিনাস বা ভিটি (তখন নাম ছিল বোরি বন্দর) থেকে ঠানে অবধি। অবিশ্যি সে রামও নেই, অযোধ্যাও নেই। ভিটির নাম পালটে হয়েছে সিএসটি, ছত্রপতি শিবাজি টার্মিনাস। কুলোকে অবশ্য বলে এটাই ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সেক্স চেঞ্জ অপারেশন,  তবে সে কথায় কান না দেওয়াই মঙ্গল। এই লাইনটি বর্তমানে সেন্ট্রাল লাইন বলে পরিচিত। গত সপ্তাহে বলেছিলাম, তিনটি লোকাল লাইন আর দুটি এক্সপ্রেসওয়ে, এই পঞ্চপাণ্ডব মিলে মুম্বইয়ের ভূভার বহন করেন। এদের মধ্যে বয়সে ও পদমর্যাদায় সেন্ট্রাল লাইন হলেন নৈকষ্যকুলীন। এর পর আছেন ওয়েস্টার্ন লাইন, মুম্বইয়ের পশ্চিম দিক দিয়ে। এঁয়ার দৌড় চার্চগেট থেকে ভিরার অবধি। আর নবীনতম সদস্য হচ্ছেন হারবার লাইন, নভি মুম্বইবাসীদের জন্যে। এঁর বিস্তার সিএসটি থেকে পানভেল অবধি। 
একটা জিনিস জানিয়ে রাখা ভাল, এই পাঁচটি জনগণপথই উত্তর থেকে দক্ষিণে বিস্তৃত। মুম্বই শহরে পূর্ব থেকে পশ্চিমে যাওয়া অনেক হ্যাঙ্গাম মশাই। ভাইসি ভার্সা পশ্চিম থেকে পূবেও তাই, তবে কিনা আজকাল একবার পশ্চিমে পাড়ি জমাতে পারলে কেউ পুবে বিশেষ ফিরছে টিরছে না দেখে বাহুল্যবোধে আর উল্লেখ করিনি!
তা এই তিনটি লাইনের মধ্যে অবশ্য ভাব–ভালোবাসার কমতি নেই। ওয়েস্টার্ন লাইন যেখানে সেন্ট্রাল লাইনের বুকে গুগাবাবার শেষে সন্তোষ দত্তের স্টাইলে ‘‌দাদারে’‌ বলে ঝাঁপিয়ে পড়েছে, তার নাম দাদর। এখানেই লোকে লাইন চেঞ্জ করে ওয়েস্ট থেকে সেন্ট্রাল বা সেন্ট্রাল থেকে ওয়েস্টে যায়। অতি জনবহুল, ব্যস্ত স্টেশন, তার খ্যাতি লেখার শুরুয়াতেই উল্লিখিত স্লোগানটি শুনে হৃদয়ঙ্গম হবে আশা করি। অরণ্যের প্রাচীন প্রবাদ হলো দাদর থেকে কল্যাণ বা ভিরারের জন্যে ‘‌ফাস্ট’‌ ট্রেনে (কলকাত্তাই ভাষায় গ্যালপিং ট্রেনে) যারা উঠতে পারে, তাদের দুএকজনকে ঠেলেঠুলে অলিম্পিকে পাঠাতে পারলে রেসলিং এ দু’‌–চারটে গোল্ড মেডেল নিয়ে নিশ্চিন্ত হওয়া যায়। তবে নেহাত অলিম্পিক ভিলেজে ভড়া পাও পাওয়া যায় না বলেই হয়তো প্রস্তাবটা খাতায় কলমেই রয়ে গেছে। 
হারবার লাইন যেখানে প্রেয়সীর মতন সেন্ট্রাল লাইনের গায়ে সাগর জলে সিনান করা মাথাটা এলিয়ে দিয়েছে, তার নাম কুরলা। এও বেশ জনবহুল স্টেশন বটেক। তবে হারবার থেকে ওয়েস্টার্ন লাইন যাওয়া অবশ্য অনেক হাঙ্গামা। আগে হিসেব করে দেখতে হবে আন্ধেরি কোথায়, বা কুরলা কোথায় থাকতে পারে। তারপর দেখতে হবে ওয়াডালা কই। তারপর দেখতে হবে সেই হিসেব মতন যখন আন্ধেরি কী কুরলা থেকে যখন ওয়াডালা গিয়ে পৌঁছবে, তখন ট্রেন কোথায় থাকবে...
পাতি কথা বলছি দাদা, নেহাত বাধ্য না হলে লোকে অটো নিয়ে নেয়! 
মুম্বই লোকালের খ্যাতি অবশ্যই তার ভীড়ের জন্যে। মুম্বই লোকালের ভীড় আধুনিক ভারতের একটি আর্বান লেজেন্ড বিশেষ। প্রায় আড়াই হাজার লোকাল ট্রেন সর্বসাকুল্যে রয়েছে মুম্বইতে, ভোর চারটে থেকে রাত একটা অবধি চলতেই থাকে, চলতেই থাকে। রোজ কত লোক যাতায়াত করেন জানেন? মাথাটা চেপে ধরুন,  বাঁই করে ঘুরে গেলে কোম্পানী দায়ী নহে! 
পঁচাত্তর লাখ! 
মানে এক বছরে আড়াইশো কোটির একটু বেশি, পৃথিবীর জনসংখ্যার প্রায় এক তৃতীয়াংশ!  
যাকগে, এসব নাম্বারের কচকচি বাদ দিয়ে মুম্বই লোকালের সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাতের গল্পটাই না হয় বলি।
প্রথম যখন এই মহানগরীতে পদার্পণ করি, সেটা ছিল দশ বছর আগে, দু’‌হাজার ছয় সালে, সামার ট্রেনিং নিমিত্ত। তা প্রথম দিন তো এয়ারপোর্ট থেকে নেমে সোজা অফিসে গেছি। আমাকে আমার তদানীন্তন বস তথা গাইড বললেন যে ‘‌ভাইটি,  কাল সকাল দশটা নাগাদ ঘাটকোপার থেকে ট্রেন ধরে সিএসটি এসো। কোলাবা মার্কেট ভিজিটে যাবো।’‌ তা আমিও তো সুবোধ বালকের মতন পরের দিন ছানটান করে চুল আঁচড়ে খেয়েদেয়ে, ঘাড়েমুখে পাউডার বুলিয়ে স্টেশনে গিয়ে তো হাজির। 
গিয়েই দেখি, উরিত্তারা! ই কি?  সারা স্টেশন জুড়ে থিকথিক করছে লোক, কিলো কিলো প্যাসেঞ্জার মশাই !  দুর্গাপুজোয় অষ্টমীর দিন সুরুচি সঙ্ঘ আর একডালিয়া এভারগ্রীনের মিলিয়ে যা ভীড় হয়, তার চারগুণ বললেই চলে। অফিস টাইমে শ্যালদা দেখেছি, এ তো তার এককাঠি নয়, রীতিমতো একবাঁশ ওপরে! 
তা ভাবলুম হয়তো কোথাও কোনও জনসভাটভা আছে। এই ট্রেনটা ছেড়ে দিই, পরেরটায় বেশ আয়েশ করে যাবো না হয়।
তা তিনি এলেন। আগমন নয়, আবির্ভাব বললেই চলে। তিনি আসছেন এই খবর চাউড় হতেই লোকজন দেখি সব স্ট্র‍্যাটেজিক পজিশন নেওয়া শুরু করেছে। সে কি একাগ্র লক্ষ্য, সে কি একরোখা তেজী ভাব, সে কি ভীতিপ্রদ চাউনি, দেখলে ভয়, ভক্তি, শ্রদ্ধা তিনটেই জাগে। 
তা তিনি যখন এলেন, ও হরি দেখি তিনিও তদ্রুপ! ট্রেনের কামরার ভেতরে থিকথিক করছে লোক। বেশ কয়েকজন বাইরেও ঝুলছে। দুএকজনকে স্পষ্ট দেখলুম কোনও অবলম্বন ছাড়াই ঝুলতে, ভেতর থেকে কেউ কলার ধরে টেনে রেখেছে, তাই বাঁচোয়া! 
এইবারে আমার মনে গূঢ় চিন্তার উদয় হলো। সহৃদয়া পাঠিকা জানেন, চিরকালই পরের জন্যে আমার প্রাণ কাঁদে। ভাবলাম, তাই তো, এইবার এই এত লোক যাবে কি করে? অনেকেরই তো আর্জেন্ট কাজও থাকতে পারে। ইনটারভিউ, হাসপাতাল, মিটিং, ইলেক্ট্রিক বিল, বসের বাড়ির বাজার করে দেওয়া, মায় গার্লফ্রেণ্ডের সঙ্গে ডেটিং অবধি, কিছু না কিছু তো আছেই।
ও মা, ভাবতে ভাবতেই দেখি মিনিটের মধ্যে সেই এক প্ল্যাটফর্ম লোক দিব্যি ট্রেনের মধ্যে সেঁধিয়ে প্ল্যাটফর্ম পুরো ফরসা, ট্রেনও দেখি সেই কলারের ওপর ভরসা করে ঝুলতে থাকা ছোকরাকে নিয়ে ধাঁ! যদি ওই এক প্ল্যাটফর্ম ভর্তি লোক যদি ট্রেনের মধ্যে সেঁধুতে পারে তাহলে ট্রেনের ভেতর কারা ছিল? যদি ওই ট্রেনে ভর্তি লোকই থাকবে তো প্ল্যাটফর্মে কারা ছিল? তিনকেজির বিড়াল যদি এককেজি মাংস খাওয়ার পরেও যদি তার তিনকেজি ওজন হয় তাহলে মাংসটা গেলো কই? ডিমনির পরেও যদি সেই পুরো পনেরো হাজার কোটিই ফিরে আসে তাহলে ব্ল্যাক মানি....
খানিকক্ষণ হাঁ হয়ে চেয়ে থাকার পর বুকে একটু নিশ্চিন্দির ভাব এলো। যাক, প্রায় ফাঁকা প্ল্যাটফর্ম, পরের ট্রেনে উঠতে কষ্ট হবে না। কিন্তু...দেড় মিনিট। ঠিক দেড় মিনিট। ফের পিলপিল করে লোক এসে ঘাটকোপার স্টেশন যেন ব্রিগেডের জনসভা! 
কবি লিখেছিলেন আধুনিক জীবনে মানুষের শোকের আয়ু দেড়দিন। মানুষের সুখের আয়ু যে দেড় মিনিট, সেটা কেউ কোথাও লিখে যাননি। লিখে রাখা উচিৎ ছিল! এর পর কি করে অকুস্থলে পৌঁঁছই তার বিবরণ চেয়ে সুধী পাঠিকা আমাকে বিপদে ফেলবেন না বলেই বিশ্বাস রাখি! 
মুম্বই লোকালের প্রতিটি কামরা আদতে এক একটি  মিনি ভারতবর্ষ। সুবেশ টাইধারী বাঙালি কর্পোযুবার পাশেই দেখবেন প্রৌঢ় গুজরাটি শেয়ার ব্রোকার, মালয়ালী দোকানদারের পাশে আধঘুমন্ত বিহারি ড্রাইভার, মারাঠি গৃহপরিচারিকার কোল ঘেঁষে পাঞ্জাবী উঠতি অভিনেত্রী। ভাষা, ধর্ম, জাতি, সংস্কৃতি, জীবিকা সবকিছু দিয়ে সঞ্জীবিত বহুবিচিত্র ভারতভূমির এমন শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান আর কোথাও পাওয়া যায় না বলেই বিশ্বাস। কার ঘাম কার ঘাড়ে, কার আঙুলের ওপর কার পা, কার কাঁধে কার মাথা বোঝা দায়। আর মুম্বই এর যা বৈশিষ্ট্য,  কেউ কারো পারসোনাল স্পেসে হানা দেয় না। কলকাতার মতন এখানে সম্পূর্ন অনাত্মীয় সহযাত্রীর সঙ্গে ধোনির রিটায়ারমেন্ট টু ডিমনিটাইজেশন, সারদা টু শ্রীরামকৃষ্ণ নিয়ে জ্ঞানগর্ভ আলোচনা ভাবাই যায় না! ওই প্রচণ্ড চাপাচাপি গরমে বেশিরভাগই মোবাইলে গান শুনছে, বা গেম খেলছে বা ফেসবুক করছে দেখতে পাবেন। বৃদ্ধারা হয়তো বাবা রামদেবের জীবনচরিত পড়ছেন, তার পাশের উদ্ভিন্নযৌবনা খুকিটি হয়তো পেন্টহাউস লেটার্স, কারোরই কিছুতে কিছু এসে যায় না! বিগতযৌবন লোকটি হয়তো খবরের কাগজে মন দিয়ে শেয়ারের ভাও দেখছেন, সেই পেপারেরই পাশের পেজে মল্লিকা শেরাওয়াতের স্বল্পবসনা ছবিতে মগ্ন এক ইউপি’‌র যুবক, এ খুবই স্বাভাবিক দৃশ্য। এহ বাহ্য, আমি নিজে স্বচক্ষে চিঁড়েচ্যাপটা ভীড় ট্রেনে এক স্থূলাঙ্গী মারাঠি মহিলাকে সিটে বসে বাড়ির আনাজপাতি কাটতে দেখেছি, অন্য পরে কা কথা! মোটমাট মুম্বই লোকালে পূজানমাজ, শৌচকার্য আর নিজ পার্টনারের সঙ্গে ঝিঙ্কুলুলুটুকুই যা করা যায় না আর কি! 
মুম্বইয়ের জীবনযাপনের এক অন্যতম লক্ষণ হলো নন-ইন্টারফেয়ারেন্স। কেউ কারও বিষয়ে আগ বাড়িয়ে উদগ্র কৌতূহল প্রকাশ করতে যায় না। লিভ অ্যান্ড লেট লিভ, তুমি কি আমার পর? এই হচ্ছে মুম্বইয়ের আত্মার মূল কথা। মুম্বইয়ের লোকাল ট্রেনও তার ব্যত্যয় নয়। এই প্রসঙ্গে পড়ে গেলো, আমার এক মুম্বইবাসী বন্ধু কর্মব্যপদেশে একবার কলকাতা যান, ডেরাডাণ্ডা বাঁধেন পিয়ারলেস ইনে। তা কোনও এক মিটিঙে তাঁকে যেতে হবে সল্টলেকে, এদিকে শখ কলকাতার মেট্রো চড়বেন।  আমি মশাই ভারি পরহিতৈষী মানুষ, একবার জিগাতেই এসপ্ল্যানেড থেকে মেট্রোতে  শোভাবাজার, আর তারপর সেখান থেকে অটো ধরে উল্টোডাঙা হয়ে কি করে সল্টলেক যাওয়া যায় বাতলে দিলুম। 
তা সন্ধেবেলা যখন তত্ত্বতালাশ নিচ্ছি, তিনি ভারী গোমড়ামুখে বললেন ‘‌তোমরা বাঙালিরা কার্টেসি জানো না।’‌ 
এই রে! হঠাৎ এহেন অভিযোগ? 
জিজ্ঞাসাবাদের পরে প্রকাশ পেলো, তিনি এসপ্ল্যানেডে উঠেই দরজার পাশে একটা সিট পেয়ে সেখানে জমিয়ে বসে নিজের প্রেয়সীকে হোয়াটসঅ্যাপে একটি রগরগে মেসেজ করছিলেন। অনেকটা লিখে ফেলার পর হঠাৎ কাঁধে একটা টোকা পেয়ে চমকে দেখেন এক প্রৌঢ় ভদ্রলোক তাকে ডাকছেন। ‘‌ইয়েস, হোয়াট হ্যাপেন্ড’‌ এর উত্তরে সেই ভদ্রলোক জানান যে তিনি একজন প্রাইভেট টিউটর এবং বন্ধুবর এতক্ষণ যা যা লিখেছেন তার গ্রামারে নাকি গণ্ডাখানেক ভুল! আর ‘‌ম্যাস্টারবেশন’‌ শব্দটার স্পেলিং কী করে এক নব্যযুবা ভুল করতে পারে সেটা উনি ভেবেই পাচ্ছেন না! হতভম্ব বন্ধুটি কিছু জবাব দেওয়ার সুযোগই পাননি, কারন এর পরই নাকি আরেক ভদ্রলোক, যিনি নিজেও লেখাটা ওঁর ঘাড়ের ওপর দিয়ে পড়ছিলেন, তিনি তীব্র প্রতিবাদ করেন এবং ওল্ড ইংলিশ স্পেলিং অ্যান্ড নিউ ইংলিশ স্পেলিং নিয়ে কামরাতে ধুন্ধুমার বেঁধে যায়! শেষে দুজনেই পরস্পরের দিকে যথাক্রমে নেসফিল্ড এবং রেন অ্যান্ড মার্টিন ছুঁড়ে মারলে সেদিনকার মত ঝগড়ার ইতি হয়!  
মুম্বইতে আর একটি ভারী ভালো অভ্যাস আছে। চট করে এখানে রাস্তা, স্টেশন ইত্যাদির নামকরণ করা হয় না। একেবারে যে হয়না তা নয়, তবে কলকাতায় যেমন আপনি রাত্তিরে কলু মিস্ত্রি লেনে ঘুমোতে গেলেন, আর সকালে উঠে দেখলেন তার নাম বদলে হয়েছে দেশবরেণ্য লোকনায়ক মহাত্মা অশ্বিনীকুমার দত্ত সরণি, এখানে তেমন এপিডেমিক হারে হয় না। রাজনৈতিক নেতাদের হুঁশপর্ব কিছু আছে, বেকার অপ্রয়োজনীয় কাজে ত্যানা প্যাঁচান না। সাকি নাকা বোধহয় সেই আদি অনন্ত কাল থেকেই সাকি নাকা। মালাড বা ভিরার অথবা পাওয়াই এর নাম বোধহয় গত একশো বছরে বদলায় নি। কোলাবা কি মালাবার হিলসের উল্লেখ তো বোধহয় ঋগ্বেদেও পাওয়া যাবে বলে আমার সন্দেহ! মুম্বই বোঝে এসব ফালতু কাজে দিমাগ না লাগিয়ে শেয়ার বাজারে লাগালে বরং দুটো পয়সা ঘরে আসে। 
তা যেহেতু অধিকাংশ ক্ষেত্রে পুরনো নামই বজায় আছে, মাঝেমধ্যে একই স্টেশনের নাম তিনটে বিভিন্ন ভাষায় শুনলে চমক লাগে। যেমন যে স্টেশনের নাম ইংরেজিতে স্পষ্টাক্ষরে Byculla লেখা আছে, ও আপনি বাইকুল্লা বাইকুল্লা জপতে জপতে বলে নামবেন বলে রেডি হচ্ছেন, তার নাম অ্যানাউন্সড হলো ‘‌ভায়খালা’‌, ওটাই আদত মারাঠি উচ্চারণ কি না! তারপর ধরুন সায়ন। ইংরেজিতে বলে সিয়ন, হিন্দিতে সায়ন, মারাঠিতে শীন! আর তো আর,  বহুখ্যাত বান্দ্রা স্টেশনের নামই তিন আলাদা উচ্চারণে শুনতে পেয়ে রীতিমতো আমোদ পেয়েছিলুম মনে আছে, বান্দ্রা, ব্যান্ড্রা, ওয়ান্দ্রে! 
আবার অনেক অদৃশ্য স্টেশনের অস্তিত্বও মুম্বইয়ের শতাব্দী প্রাচীন ট্রেনলাইনে বর্তমান। দাশনগর থেকে হাওড়া ঢোকার মুখে যেমন ‘‌একটু দাঁড়া’‌, ‘‌আবার দাঁড়া’‌ এবং ‘‌দাঁড়া ** ’‌ নামের তিনটি আধিভৌতিক স্টেশনের জন্ম দিয়েছেন ডেলি পাষণ্ডরা, ইহারাও তেমনি। এদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত অবশ্য, বোরিভিলি আর কান্দিভিলির মাঝের অনির্দেশ্য স্টেশনটি, রসিক মারাঠি যার নাম দিয়েছে থাম্বিভিলি!
যাকগে, অনেক প্যাঁচাল পাড়লাম। কী করি, বয়েস বাড়ছে, পেটে দু’‌পাত্তর পড়লেই কথায় পেয়ে বসে। তা মুম্বই লোকাল নিয়ে নানা কিসসা মুম্বইয়ের অলিগলিতে উড়ে বেড়ায়। তারই দুয়েকটা উমদা নমুনা রসিকজনের খিদমতে পেশ করে দাঁড়ি টানবো।
ইউপির গ্রাম থেকে এক ‘‌ভাইয়া’‌ এসেছেন মুম্বইতে রিস্তেদারের সঙ্গে মোলাকাত করতে। তারপর যথারীতি বেরিয়েছেন মুম্বই দর্শনে। ভিকরোলি থেকে ট্রেন ধরেছেন, কুরলা নামবেন। তা ইনি মুম্বই লোকালের বীভৎস ভীড় নিয়ে নানা সত্যিমিথ্যে মনগড়া গল্প শুনে তো যথেষ্ট নার্ভাস। সব্বাইকে বারবার বলছেন কুরলা এলেই যেন ওঁঁকে বলে দেওয়া হয়। তা দেহাতি ভাষায় নানাবিধ কাতর অনুরোধ শুনে দয়ার্দ্র হয়ে লোকজন ওঁকে ঠেলেঠুলে দরজার কোণে এনে সেট করে তো দিলো। এরপর নানাবিধ উপদেশ, যেই ট্রেন স্টেশনে ঢুকে একটু আস্তে হবে,  তক্ষুণি যেন ইনি আলতো করে প্ল্যাটফর্মে নেমেই যেদিকে ট্রেন যাচ্ছে সেদিকে ছুটতে থাকেন, নইলে মুখ থুবড়ে পড়বেন, ইত্যাদি প্রভৃতি।  
এবার ট্রেন যেই কুরলা স্টেশনে ঢুকে একটু স্লো হয়েছে, ভদ্রলোক নেমেই দৌড়তে লাগলেন, একদম ট্রেনের সঙ্গে, প্যারালাল করে। খানিকটা দৌড়ে থেমে গেলেই হতো, কিন্তু ভদ্রলোক খুব সম্ভবত নানা উদ্বেগ আর উপদেশে সামান্য ইয়ে হয়ে গেছিলেন,  তিনি সমান তেজে দৌড়তেই থাকলেন। এদিকে ট্রেন ক্রমশ আরও স্লো হয়ে আসছে। ভদ্রলোক যেই দৌড়তে দৌড়তে পরের কামরার কাছে পৌঁছেছেন, সেখানকার লোকজনের দয়ার শরীর, ভেবেছে লোকটা ট্রেন ধরতে দৌড়চ্ছে, সক্কলে মিলে হাত বাড়িয়ে টুক করে ফের কামরায় তুলে নিয়েছে!  
তারপর সে কী ধুন্ধুমার কাণ্ড! ভদ্রলোক শেষে হাঁউমাউ করে, টিকিট দেখিয়ে প্রমাণ করেন যে তিনি ছাড়ার জন্যেই দৌড়চ্ছিলেন, ধরার জন্যে না। শেষে কামরাভর্তি হো হো হাসি, ক্যাটকল ও হুইসলধ্বনির মধ্যে তাঁকে পরের স্টেশনে নামিয়ে দেওয়া হয়। ট্রেন সম্পূর্ণ থামলে! 
পরেরটা আমার এক বন্ধুর চোখে দেখা। তার জবানিতেই বলি।
‘‌থানে থেকে বিদ্যাবিহার যাবো, ট্রেনে চেপেছি। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে হাওয়া খাচ্ছি, এমন সময় মুলুন্দ থেকে এক ব্রাউন সাহেব উঠলেন। ধোপদোরস্ত জামাকাপড়, স্যুটটাই পরিহিত, চোখে দামি গগলস, চকচকে জুতো। তিনি উঠেই আমার উল্টোদিকে দাঁড়ালেন। কানে একটা ব্লু–টুথ লাগালেন তারপর পকেট থেকে মোবাইল বার করে কাকে কল করে মোবাইলটা পকেটে রেখে হ্যালো, হ্যালো করতে লাগলেন।  মুলুন্দ থেকে ভাণ্ডুপের মাঝে সব অপারেটরেরই সিগন্যাল খুব উইক থাকে। তা ইনি বোধহয় সেটা জানতেন না।  তিনি হ্যালো হ্যালো করে চেঁচিয়েই যাচ্ছেন, ওদিক থেকে নো উত্তর অ্যান্ড অল।
এমন সময় উলটোদিক থেকে এলো সিএসটি থানে ফাস্ট লোকাল। এখন কেসটা হচ্ছে যে সেন্ট্রাল লাইনের ট্র‍্যাকগুলো পুরোনো বলেই একটু কাছেকাছে। ফলে দুটো ট্রেন বিপুল বেগে পাশাপাশি চললেই প্রবল হাওয়ার উৎপত্তি হয়, উলটোদিকে চললে তো কথাই নেই! এক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হলো না। তাতে যে কথাও উড়ে যায় তিনি বোধহয় খেয়াল করেননি, যথারীতি হ্যালো হ্যালো, ক্যান ইউ হিয়ার মি, করে চলেছেন। গলার পর্দা ক্রমশ ওপরে চড়ছে। শেষে সেই হ্যালোনাদ যখন সমস্ত কামরা প্রকম্পিত করতে লাগলো, তখন তেনার পার্শস্থ এক প্রৌঢ় আধোঘুম ভেঙে তাঁর কাঁধে টোকা দিলেন, এবং কানের দিকে ইঙ্গিত করে ঋষিতুল্য নৈর্ব্যক্তিক সুরে জানালেন, 
বস, উড় গ্যায়া! 

জনপ্রিয়

Back To Top