‌অভীক সরকার:‌ মুম্বাই ভারি ভাল শহর। আজ থেকে বছর আড়াই আগে যখন নিতান্তই দৈবদুর্বিপাকে এই মহাদ্রুমের পক্ষপুটে আশ্রয় নিতে বাধ্য হই, তখন যা মনের অবস্থা ছিল সে কহতব্য নয়। সে শকুন্তলার পতিগৃহে যাত্রা, রানী পদ্মিনীর জৌহরব্রত আর নেতাজি সুভাষের মহাভিনিষ্ক্রমণ একসঙ্গে মিলিয়ে তার সামান্য আইডিয়াখানিক হলেও হতে পারে। যাবার সময় এয়ারপোর্টে বসে ঠিক ক’‌মাস অন্তর অন্তর কলকেতা শহরে একবার ঢুঁ মারলে কলজেটা ঠান্ডা হবে সেই হিসেব কষছি। বসের মুখটা মনে পড়লেই মনে ‘‌ধনুৰ্দ্ধর আছ যত, সাজ শীঘ্ৰ করি চতুরঙ্গে, রণরঙ্গে ভুলিব এ জ্বালা, এ বিষম জ্বালা যদি পারি রে ভুলিতে’‌ টাইপের কুচিন্তা মনে উদয় হচ্ছে। আরসালান, দুর্গাপুজো আর ইস্টবেঙ্গল ছেড়ে মুম্বাই যায় কোন আহাম্মক?
কিন্তু কবি বলে গেছেন দৈব, দৈবই সর্বত্র প্রবল। নইলে যে লোকটা বস হিসেবে দিব্যি তিন বছর শরিফ মেজাজে আমার দেখভাল করেছে, প্রোমোশন দেওয়ার নামে এমন লেঙ্গিটা সে আমাকে মারবে কেন? 
তবে মুম্বাই যে আগে আগে আসিনি তা নয়। তবে কি না সে ছিল নেহাতই দীঘির পাড়ে জল তুলতে এসে নির্দোষ আঁখমেচোলি খেলা, প্রাজ্ঞজনেরা ম্লেচ্ছ ভাষায় যাকে বলেন ফ্লার্টিং। সকাল সকাল আর্লি মর্নিং এসে, মিটিং সেরে রাতের ফ্লাইট ধরা। 
এই প্রথম মুম্বাইয়ের সঙ্গে আমার দেঁড়েমুষে সংসার করতে আসা! 
তা এসে পেরথমে কোম্পানির গেস্ট হাউসে উঠলুম। এমনিতে গেস্ট হাউসে টানা এক সপ্তাহের বেশি থাকার নিয়ম নেই। কিন্তু হেড অফিসে অ্যাডমিন দেখতেন এক উজ্জ্বল শ্যামবর্ণা কাজলনয়না সুতনুকা। আর আমি যে কিরকম হ্যান্ডসাম, হেঁ হেঁ, বলতে লজ্জাই লাগছে আর কি, সে তো আপনারা জানেনই ! ফলে সাড়ে তিনমাস দিব্য কাটিয়ে দিয়েছিলুম সেখানে। শেষে অবশ্য একদিন বলপ্রয়োগের আভাস পেয়ে ঠাঁইনাড়া হতে বাধ্য হই, কিন্তু সে আরেক গল্প।
তা যেখানে এলাকায় শেষ পর্যন্ত ডেরাডাণ্ডা বাঁধি তার নাম পাওয়াই, সেন্ট্রাল লাইনে।
মুম্বাইতে এই সেন্ট্রাল লাইন, ওয়েস্টার্ন লাইন, ইস্টার্ন এক্সপ্রেসওয়ে, ইত্যাদি হচ্ছে বর্গিজীবনের অর্গি টাইপ, চলাচলের পক্ষে এগুলি ছাড়া নান্য পন্থা বিদ্যতেহনায়ঃ। শাস্ত্রে বলে মহাজন যেন গতঃ স পন্থা, মহাজন ( না, ক্রেডিট কার্ড কোম্পানি নয়, মহৎ জন) যে রাস্তায় গেছেন সেটাই রাস্তা। মুশকিল হচ্চে মুম্বাইতে মহাজন, হীনজন, বজ্রজন সব্বার গতি ওই এক,  তিনটি রেল লাইন, আর দুটি এক্সপ্রেসওয়ে। এদের নিয়ে না হয় আরেকদিন গপ্প করা যাবে। আজকের টপিক অন্য।
মুম্বাই শহর কখনও থামে না, এ কথা শুনে শুনে আপনারা হেজে গেছেন। তবুও আরেকবার শুনুন, কথাটা অক্ষরে অক্ষরে সত্যি। আমরা যারা ‘‌পেনসনার্স সিটি’‌ কলকাতা থেকে আসি,  তারা প্রথমে এই অবিশ্রান্ত কর্মপ্রবাহ দেখে ঘাবড়ে যাই। এখানে বাজে কথা, বাজে সময় নষ্ট, এসব নিষেধ। এর সুফল কুফল দুইই আছে, বারান্তরে প্রকাশ্য।
যে কোনও শহরে নেমে সেই শহর সম্পর্কে প্রথম ধারণা হয়ে সেই শহরের ট্যাক্সি আর অটোওয়ালাদের আচরণ দেখে। ‘‌চেন্নাই কেমন লাগছে’‌ জিজ্ঞেস করুন চেন্নাইতে প্রথমবার পা রাখা যে কোনও লোককে,  প্রথমেই চেন্নাইয়ের অটোওয়ালাদের  উর্ধ্বতন চোদ্দপুরুষের গুষ্টির তুষ্টি করে দেবে, বক্তার অপভাষা প্রয়োগে কিঞ্চিৎ প্রারব্ধ সঞ্চিত ব্যুৎপত্তি থাকলে সেই অটোওয়ালাদের উর্ধতন চৌদ্দ নারীর উদ্দাম লিবিডোর কাহিনীও শুনে ফেলতে পারেন। এককালে কলকাতার এয়ারপোর্টের আর হাওড়া রেলস্টেশনের ট্যাক্সিওয়ালাদের এই দুর্নাম ছিল। গত বছর পাঁচেক ধরে অবিশ্যি দেখছি ব্যবস্থাটা অনেক শুধরেছে।  
এ বিষয়ে মুম্বাইয়ের অটো বা ট্যাক্সিওয়ালারা একশোতে একশো দশ পাবে। এমন ভদ্র, বিনয়ী, সৎ জনসেবক চট করে দেখা যায় না। বাকি দেশ তো ছেড়েই দিলাম, বিদেশেও এর জুড়ি মেলা ভার। না না, ব্যাজস্তুতি করছি না, ঘডনা পুরাই হইত্য! 
পুরো মুম্বই শহরেই একটি ব্যবহারিক সততা কাজ করে। এ জিনিস কলকাতা বা দিল্লিতে হয় না। ছ্যাঁচড়াপনা জিনিসটা খুব সম্ভবত পূর্ব ও উত্তরভারতের একচেটে। তিন বছর হয়ে গেলো মুম্বাইতে, সর্বত্র দেখেছি একটি স্বাভাবিক ন্যায়ের সার্বিক ধারণা সর্বদা ক্রিয়াশীল। । দু’‌চার টাকা অবৈধ উপার্জনের জন্যে জালিয়াতি বা চোখরাঙানি এখানে ভাবাই যায় না, না আছে লোকের প্রবৃত্তি, না  সময়! অটো চড়লেও আপনি এ জিনিস দেখতে পাবেন। মোটামুটি ভাল থেকে বেশ ভালো সিট, ব্যবহার অতি ভদ্র, মিটারও একদম ঠিক, আজ অবধি মুম্বই অটোর কোনও বেচাল পাইনি। যেখানে বলবেন সেখানে নিয়ে যাবে, ‘‌আজ আমার পেট খারাপ/ ওদিকে জুজু আছে, যাবো না/ আজ মাসির ননদের সেজোমাসির ভাশুরপোর বিয়ে, আমি নিতবর সেজেছি’‌— টাইপের যুক্তি দেবে না। পঞ্চাশ টাকার ভাড়া উঠলে পাঁচশো টাকা দিন, তৎক্ষণাৎ খুচরো পাবেন,  কলকাতার অটোমহাত্মনদের মতন প্রাকৃত ভাষায় অতি উচ্চাঙ্গের খেদোক্তি শুনতে হবে না। এই কাস্টমার সেন্ট্রিসিটি বা উপভোক্তামুখিনতায় মুম্বাই শহর কলকাতা সহ দেশের বাকি সমস্ত মেট্রোকে বলে বলে দশ গোল দেবে। এ জিনিস আপনি আপনার আদ্যন্ত কলকাতা প্রেমরসে ভিজিয়ে তার সঙ্গে মার্ক্সের ক্লাস স্ট্রাগল আর গৌতম বাবুর সাব অল্টার্ন থিওরি পাঞ্চ করেও এক্সপ্লেইন করতে পারবেন না, কারণ কলকাতার অটো/ট্যাক্সিওয়ালা  আর মুম্বাইয়ের অটোওয়ালাদের আর্থিক অবস্থা, সমাজ সচেতনতা, ক্লাস আইডেন্টিটি কিন্তু একই। তফাৎ এই যে আইনের শাসন ভাঙলে আপনি কারও পেছনে পার্টিশাসনের বরাভয় হস্ত উদ্যত করেছেন, আর কারও পেছনে ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্টের ডাণ্ডা। ফলাফল দেখতেই পাচ্ছেন। 
মুম্বাইতে এক্স্যাক্ট কত অটো চলে বলা মুশকিল। মোটামুটি দেড় লাখ মতন অটো তো চলেই। কল্যাণ অ্যান্ড নভি মুম্বাই ধরে নিলে সংখ্যাটা ২ লাখের কিছু বেশি দাঁড়ায়। আর এখানে শেয়ার অটো বলে কিছু নেই, সবই মিটারে চলে। প্রথম আট কিলোমিটার আঠেরো টাকা, পরে প্রতি চার কিলোমিটারে দু টাকা। একটাকাও হতে পারে, ঠিক মনে নেই। তবে আশ্চর্যজনক ভাবে দেখেছি যে মুম্বাইয়ের অটোওয়ালারা একটাকা দু’‌টাকা কিছু মান্য করেন না। প্রথম প্রথম কলকাতা থেকে গিয়ে এটা খুব অদ্ভুত লাগতো। কলকাতায় অটো/ট্যাক্সিওয়ালারা যেমন যাত্রীরা একটাকা দুটাকা না দিতে পারলে বা বড় নোট দিলে যে ভাষায় যাত্রীর মা ও বোনের সঙ্গে খুবই ঘনিষ্ঠভাবে আলাপ করার বাসনা প্রকাশ করতে থাকেন , সেসব এখানে ভাবাই যায় না। মুম্বাইতে এসব তুচ্ছ বিষয়ে কেউ ঝগড়া করে না, ব্যস্ত শহর, সবারই সময়ের দাম আছে। বাহান্ন টাকা বিল হয়েছে, পঞ্চাশ টাকার নোট দিয়ে বললেন দুটাকা খুচরো নেই, অটোওয়ালা কিচ্ছুটি মাইন্ড করেন না, ‘‌কোই নেহি’‌ বা ‘‌ঠিক হ্যায়’‌ বলে কেটে পড়েন। একজন দুজন নয়, তিনবছরে দেখা প্রতিটি অটোওয়ালাই তাই। এটা আমরা যাত্রীরাও করি, আটচল্লিশ টাকা বিল হয়েছে, পঞ্চাশ দিয়েছি, অটোওয়ালা কাঁঁচুমাঁচু মুখে জানালো ‘‌দো রুপেয়া নেহি হ্যায় সাব’‌,  আমরাও ‘‌ঠিক হ্যায়, কোই নেহি’‌ একটা উদার ভঙ্গিমা করে কেটে পড়ি, আজ অবধি কাউকে হল্লা জুড়তে দেখিনি। 
মুম্বাইয়ের অটোওয়ালাদের একটি বৃহৎ অংশ বিহার ও ইউপির অধিবাসী। অতি দরিদ্র, অরাজক ও জনবহুল এই দু’‌টি প্রদেশ থেকে অনেক কর্মহীন মানুষই ভাগ্যান্বেষণে অন্যান্য শহরে খেটে খান, এখানেও তাই। কিন্তু কলকাতার আপামর বাঙালিদের মতই সাধারণ মারাঠিরাও এঁদের খুবই সন্দেহের চোখে দেখেন। আমরা যেমন এঁদের খোট্টা বলে গাল দিই, মারাঠিরা বলে ‘‌ভাইয়া’‌। ভাইয়া শব্দটি মারাঠি জনজীবনে অসম্মানসূচক শব্দ। মারাঠিরা মনে করেন তাদের সমস্ত জীবিকার্জনের উপায়ে অবৈধ ভাগ বসাচ্ছে এই ‘‌ভাইয়া’‌–রা, তাদের সস্তা শ্রম দিয়ে। আর মারাঠিরা অতি পরিশ্রমী,প্র‍্যাকটিক্যাল এবং  নো ননসেন্স জাত। নিজের ভাতের হাঁড়িতে লাথি মেরে আন্তর্জাতিকতাবাদ, শ্রমের উদ্বৃত্ত মূল্য ইত্যাদি নিয়ে গল্পদাদুর আসর বসায় না, আগে নিজের পেটের ভাতের জোগানটা ভালো করে সমঝে নেয়। ফলে এখানে প্রো মারাঠি রাজনৈতিক শক্তি খুবই সিংহবিক্রমসহ বিদ্যমান। আর তাছাড়া জাতি হিসেবে মারাঠিদের একটু অহংও আছে। তারাই যে একমাত্র জাতি যারা প্রবলপ্রতাপ মোঘল সাম্রাজ্যকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল, এবং বারংবার পর্যুদস্ত করে তৃতীয় পাণিপথের যুদ্ধের আগে অবধি অখণ্ড হিন্দু পাদপাদশাহী স্থাপন করেছিল, সে ব্যাপারটা সমস্ত আচরেকর থেকে যাবতীয় যোশি ইয়াদ রেখেছেন। ফলে মারাঠি অহং এ সামান্য আঁচড় পড়লে ফোঁস করতে দ্বিধাবোধ করেন না। রাস্তায় বিহারি অটোওয়ালার সঙ্গে মারাঠি যাত্রীর বিবাদ হলে যাত্রীটি  সেই শিকড়ছেঁড়া অটোচালকটিকে, ‘‌তু ঝা শহরাত পুনহা পরত কা নেহি যাত ?’‌ বলে সজোরে ডেঁটে দেন, অস্যার্থ, তুই নিজের শহরেই ফিরে যা না ড্যাকরা মিন্সে! একেনে জ্বালাতে এইচিস ক্যানে?
তবে সে যাই হোক, মুম্বাইয়ের অটোচালকদের কাস্টমার সার্ভিস....মাই ঘড! জাস্ট দুটো ব্যক্তিগত ঘটনার উল্লেখ করে দাঁঁড়ি টানবো। 
ঘটনা এক, সদ্য মুম্বই এসেছি। অগাস্ট মাস। মুম্বইয়ের বৃষ্টি সম্পর্কে কোনও ধারণাই নেই। এ যে কি প্রলয়ঙ্করী জিনিস কি বলবো! যাই হোক। এমনই সময়ে আমি এক কলেজী বন্ধুর সঙ্গে কলেজি ফ্রাই (  মেটে ফ্রাই) দিয়ে বিয়ার পানের আসর বসিয়েছে দাদরে। শনিবারের রাত, তখন এগারোটা বাজে, বেশ টইটুম্বুর হয়ে বাইরে বেরিয়ে উরিস্লা..... এ কি বৃষ্টি রে? এক হাত দূরে কাউকে দেখা যাচ্ছে না। মনে হচ্ছে আকাশ পুরো ভেঙে পড়েছে, ঘনঘোর বরিষণ কি একেই বলে? তা বেশি বিহ্বল হওয়ার আগেই আমার সেই বন্ধুটি দৌড়ঝাঁপ করে একটি অটো ধরে দিলো। আমিও গুন্নাইট বলেটলে অটোতে উঠে পড়লুম।
নির্জন ইস্টার্ন এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে আসতে আসতে হঠাৎ করেকেটেঘ্যাচাং! অটো চলে না, চলে না,  চলে না রে...
এখন গান গাইছি বটে, তবে স্পষ্ট মনে আছে সেইসময় কিরকম আতান্তরে পড়েছিলুম। চারিদিকে যা বৃষ্টি, লাস্ট বোধহয় হয়েছিল নোয়া–র সময়ে। অটোর বাইরের দৃশ্যমানতা কিলোমিটারের বদলে মিলিমিটারে নেমে এসেছে। মাঝেমধ্যে একটা একটা গাড়ি দ্রুতবেগে সাঁৎ করে বেরিয়ে যাচ্ছে, আর দুনিয়ার নোংরা জল ছইছাঁপাছই করে ছিটকে অটোর মধ্যে! এছাড়া এই নিভৃত নির্জন চারিধারে জনমনিষ্যির চিহ্ন, আলোর আভাস, কিছুতেই কিছু নেই।
হঠাৎ মনে কুচিন্তা এলো, এখন এইখানে যদি লোকটা আমাকে মেরেই ফেলে? হয়তো এখানেই অটো থামে পরিকল্পনামাফিক। হয়তো ওর দলবল এক্ষুণি বাইক ফাইক চড়ে আসছে, অন দ্য ওয়ে আর কি! যদিও পকেটে কয়েকটা খুচরো নোট ছাড়া আর কিছু নেই। তবে কার কিসে কি পছন্দ বলা যায় না। দামী ঘড়িটা আছে, আর.... ভাবতেই ভাবতেই দেখলাম লোকটাকে নিজেই জিজ্ঞেস করছি, ‘‌ইয়ে, বোল রাহাথা যে কেয়া হুয়া? পার্টসগুলা সব ক্ষয় হো গ্যায়া নাকি ইঞ্জিনমে ময়লা জম গ্যায়া?’‌ 
সে বাবু ঋষিতুল্য নিঃস্পৃহ নিরাসক্ত গলায় বললো ‘‌ইঞ্জিনমে পানি ঘুস গ্যায়া।’‌
‘‌তাহলে এখন উপায় কি হোগা?’‌
‘‌থোড়া বৈঠ যাইয়ে, ঠিক হো যায়েগা’‌ 
সেই প্রলয়ঙ্কর বৃষ্টির মধ্যে, নিশ্ছিদ্র, বিরামহীন ধারাপাতের মধ্যে,  অটোর মধ্যে কাটানো নীরব আতঙ্কের মুহূর্তগুলি অনেকদিন মনে থাকবে।
তা সব দুর্ভোগেরই শেষ থাকে, নইলে মানুষ পরের দুর্ভোগে পড়ে কী করে? ফলে মিনিট পাঁচেক পর বরুণদেব সামান্য ক্ষান্তি দিলে রাস্তার ওপর জলের লেভেল কিছু কমলো। স্টার্টের হ্যান্ডেল টানাটানি করে অনেক পরিশ্রমে অটো স্টার্ট নিলে কণ্ঠাগতপ্রাণ খানিকটা স্বস্তি পেলো। আরও পঁঁচিশ তিরিশটি উদ্বিগ্ন মিনিটের পর অটো আমার বাসস্থানে ঢুকলে টের পেলুম হাতে পায়ে সাড় ফিরে এসেছে। 
তখন বৃষ্টিও গেছে থেমে আর  ভাড়া উঠেছে দেখলাম একশো সাতাশ টাকা।
এইবার মনে মনে প্যাঁচ কষতে লাগলুম ব্যাটাচ্ছেলের সঙ্গে কতটা দরাদরি চলবে। বৃষ্টির মধ্যে দাদর থেকে পাওয়াই এসেছে, অনেকখানি রাস্তা। আড়াইশো তিনশো তো চাইবেই, পাক্কা। কলকাতার ট্যাক্সি হলে তো এরকমই চাইতো। আমি দেড়শো থেকেই শুরু করি, না কি? পকেটে দেখি দৈবাৎ একটা একশো টাকা আরেকটা পঞ্চাশের নোট রয়ে গেছে। মানে আমাকে পাঁচশো বা দুশোর নোট দিতে হচ্ছে না,  অর্থাৎ নেগোশিয়েশনের রাশ আমার হাতেই রইলো, কেমন?
এতটা ভাবতেই, বুঝলেন, বুকে দুনো বল এলো। নিজের এলাকা, সিকিওরিটি আছে, আলোকোজ্জ্বল পাওয়াইয়ের রাস্তায় আমি কি নেপোলিয়নের চেয়ে কম কিছু, অ্যাঁ? আমি কি ডরাই সখী ভিখারি রাঘবে? 
খুব স্টাইলে তার দিকে দেড়শো টাকা এগিয়ে দিয়ে বীরদর্পে ওয়েট করতে লাগলাম। দেখি, লোকটা কোথা থেকে শুরু করে।
তা লোকটা শুরু করলো বটে। টাকাটা নিজের ওয়ালেটে ঢোকালো। তারপর একটা কুড়িটাকার নোট বাড়িয়ে দিয়ে বললো, ‘‌তিন রুপেয়া দে রাঁহা হুঁ.‌.‌.‌’‌  
ঘোর কাটতে আমার বেশ কিছু সময় লেগেছিল!
না, যতটা পাষণ্ড আমাকে দেখায় ততটা আমি নই। সেই তেইশ টাকা তাকে দিয়ে এসেছিলাম, টিপস হিসেবে। নিজে যা লজ্জা পেয়েছিলুম সে কথা না হয় থাক!
ঘটনা দুই, এটি আমার এক বন্ধুর কাছে শোনা। ইনি একটু অতিরিক্ত কল্পনাপ্রবণ বলে কুলোকে এঁকে চালবাজ, ঢপমাস্টার, বখতিয়ার খিলজি ইত্যাদি নানাবিধ অন্যায্য আখ্যায় ভূষিত করে থাকেন। গল্পটা তাঁর জবানিতেই বলি। বাই দ্য ওয়ে এতে কিন্তু মুম্বাই অটোর গুণগান নেই, নেহাতই গল্প।
‘‌থাট্টি ফাস্টের নাইট বুঝলি। বিকেল নাগাদ আমার গাড়িটা নিয়ে তিন বন্ধু বেরিয়েছি। প্রথমে গেলাম মেরিন ড্রাইভ, সেখানে চৌপাট্টিতে বসে একটা ফুল বিপি নামালাম। তারপর সেখান থেকে কোলাবা, প্যরামাউন্ট বার। সেখানে তিনজনে তিন তিরিক্কে ন’‌টা ট্যাকিলা শট মেরে খানিকক্ষণ উদমা নাচলাম। তারপর আবার ড্রাইভ করে আন্ধেরি, সেখানে আহলুওয়ালিয়ার বাড়ির পার্টিতে। সে ব্যাটা আমার জন্যেই নাকি ভালো স্কচ আনিয়ে রেখেছিল, আর তুই তো জানিস স্কচ আমার একমাত্র দুর্বলতা। তবে বেশি না,  পাঁচ পেগের থেকে এক ফোঁটা বেশি খাইনি, একথা আমি হলফ রেখে বলতে পারি। যাই হোক, তারপর ঘাটকোপারে নাইট ক্যুইন ডিস্ক। সেখানে কার সঙ্গে গেসলুম আর কি কি খেয়েছি, সত্যি কথা বলতে কি ভাই একদম মনে নেই। ইন ফ্যাক্ট কি কি করেছি তাও যে মনে আছে বিশেষ তাও নয়। শুধু খেয়াল হলো যে রাত প্রায় বারোটা বাজে, আর ঠিক এইসময় মুম্বাই পুলিশ সবকটা মোড় নাকাবন্দি করে আর মাতাল ড্রাইভার ধরে। একবার ধরতে পারলেই চিত্তির। ব্রেদ অ্যানালাইজার নিয়েই দাঁড়ায়, আর সুমুন্দির পো’‌দের কোনও মায়াদয়া নেই। কোনও পলিটিকাল দাদাকে ধরে কিছু করা যায় না, স্রেফ শ্রীঘর। আর আমার যা অবস্থা, ব্রেদ অ্যানালাইজারের দরকার নেই, দেখলেই বুঝতে পারবে যে আমি এখন উড়ছি। পা দুটো যে এখনও মাটিতে লেগে আছে সেটা কিঞ্চিৎ স্বকৃত পাপের ফল বৈ আর কিছু নয়। এসব ক্ষেত্রে রিস্ক নেয় আহাম্মকরা। অনেক ভেবে দেখলাম যে আমি অনেক কিছু হতে পারি, কিন্তু আহাম্মক নই। ফলে একটা অটো নিয়ে বাড়ির উদ্দেশে রওনা দিলাম।  
রাস্তায় যেতে যেতেই বুঝলাম আমার অনুমান কত নির্ভুল। প্রতিটা মোড়ে মোড়ে মামু দাঁড়িয়ে, প্রাইভেট কার দেখলেই ‘‌থাম্বা রে থাম্বা’‌ করে এগিয়ে এসে  খপাৎ করে জাল ফেলছে আর ড্রাঙ্ক ড্রাইভার তুলছে। অটো, বা ট্যাক্সি  বা হায়ার্ড ক্যাবগুলোকে অবশ্য কিছু বলছে না, জানে যে সওয়ারি মাতাল বলেই গাড়ি বা অটো ভাড়া করেছে।
আমি তো ভাই দেখেশুনে বুঝলাম কি বাঁচান বেঁচে গেছি। এই অটো না থাকলে আজ আমি এতক্ষণে থানায় বসে হাপুস নয়নে কাঁদছি।
মুশকিল হল সকালে,  বুঝলি। খোঁয়াড়ি কাটার পর বাড়ির বাইরে বেরিয়ে এসে অটোটাকে দেখে কিছুতেই বুঝে উঠতে পারলাম না যে অত রাতে অটো চালিয়ে আমি এতটা রাস্তা এলাম কি করে? 
আর তার থেকেও বড় কথা, অটোটা কার!‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top