‌রাজীব চক্রবর্তী:‌ মূল জলস্রোত উত্তর থেকে দক্ষিণে প্রবাহিত। তার সাথে উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে এসে মিশেছে আরও দু’টি জলধারা। মাঝখানের অথৈ জলরাশি আসলে তিনটি নদীর মিলনস্থল, যেখানে সমুদ্রের দিকে বয়ে চলা মা ভাগীরথীর বুকে ঝাঁপিয়ে পড়েছে দুই দুরন্ত ছেলে— দামোদর ও রূপনারায়ণ। বন্দরশহর হলদিয়ার কাছে এই ত্রিবেণী সঙ্গম। ত্রিধারার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা জলরাশির পশ্চিমপাড়ের গঞ্জের নাম গেঁওখালি।নদীর পাড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ভাঙা পরিত্যক্ত জাহাজ আর ডিঙি নৌকাদের দীর্ঘশ্বাস পিছনে ফেলে শহরের মধ্যে গেলেই কেন্দ্রস্থলে মহিষাদল রাজবাড়ি। রাজবাড়ির ইতিহাস জন্ম নিয়েছিল ফেলে আসা নদীর তীরেই। সেই ইতিহাসের খোঁজ করতে গেলে অথৈ জলরাশির সঙ্গে উত্তরমুখী ভাসতে ভাসতে চলে যেতে হবে বর্তমান উত্তরপ্রদেশে। প্রায় সাড়ে পাঁচশো বছর আগের কথা। দিল্লির মসনদে তখন আকবর বাদশাহ। তার বিশাল সেনাবাহিনীমুঘল সাম্রাজ্যের বিস্তার ঘটিয়েছে উত্তর থেকে দক্ষিণে প্রায় সমগ্র ভারতে। সেই বাহিনীর একজন কর্মচারী ব্রাহ্মণ সন্তান জনার্দন উপাধ্যায়। যুদ্ধ-বিগ্রহ তাঁর আর ভাল লাগে না। মন চায় ঘুরে বেড়াতে। দেশ থেকে দেশান্তরে। তবে শুধু ঘুরে বেড়ালেই তো হবে না। অর্থও চাই। অনেক ভেবেচিন্তে কয়েকজন সাথী নিয়ে একদিন বেরিয়ে পড়লেন তিনি। সেনাবাহিনীর চাকরী করে যা সঞ্চয় করেছিলেন সব নিয়ে গঙ্গাবক্ষে নৌকা ভাসালেন। উদ্দেশ্য সাগর পেরিয়ে ভিন দেশে গিয়ে বাণিজ্য করা।
গঙ্গার বুকে বয়ে চলেছে নৌকা। ছইয়ের উপর দাঁড়িয়ে জনার্দন উপভোগ করছেন নদীর দুই তীরের শোভা। ভাবছেন কবে তাঁর বানিজ্যতরী সাগরে পড়বে। মাঝিকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘ভাই,সাগর আর কত দূর?’ দাঁড় টানতে টানতে অভিজ্ঞ মাঝি জবাব দেয়, ‘কালই আমরা সাগরে পড়ব’। নদীর দুই ধারের গাছপালা, ছোট ছোট গ্রাম, ঘাটে বাঁধা নৌকা  দেখতে বেশ লাগে। ডানদিকের তীরে হঠাৎ চোখ আটকে যায়। দূর থেকে একটা গঞ্জ বলে মনে হচ্ছে। ঘাটে নৌকা থেকে মাল নামছে, জেলেরা মাছ ধরছে। ব্যস্ততায় ভরা এক নদী কূল। জনার্দন ভাবেন সাগর যখন আর বেশি দূর নয়, এখানে একটু বিশ্রাম নিলে ক্ষতি নেই। একটানা জল দেখে দেখে তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। মাঝিদের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘নৌকা থামাও’। উপাধ্যায়ের বাণিজ্য তরী ভিড়ল জীবনখালির ঘাটে।
জীবনখালি এক ছোট গ্রাম। নদীর তীরে জেলেদের বাস। কিছুটা দূরে জমিদারের বাকি প্রজাদের বসতি। নদীর কূলে বেশ কিছুক্ষণ ঘুরে বেড়ালেন জনার্দন। নদীর পশ্চিম পাড়ে রক্তিম আভা। ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নামল। ঘাটের নৌকাগুলিতে আলো জ্বলে উঠল। মাঝিরা রাতের খাবার বানাচ্ছে। জনার্দনের সাথীরাও ব্যস্ত হয়ে পড়ল নৈশভোজনের আয়োজনে।  উপাধ্যায় নৌকার উপর বসে একদৃষ্টে তাকিয়ে নদীর দিকে। বিস্তৃত নদীর অনেক দূরে পূব পারে কয়েকটা আলো বিন্দুর মতো জ্বলছে। শোনা যাচ্ছে জলের ছলাৎ ছলাৎ শব্দ। চাঁদের মৃদু আলোয় জলের উপরটা চকচক করছে। সামান্য দূরের নৌকাগুলি থেকে ভেসে আসছে মাঝিদের গান। ভাষা না বুঝলেও সেই গানের সুর আর ছন্দ জনার্দনের মনে এক অদ্ভুত মাদকতা সৃষ্টি করল। গভীর রাত পর্যন্ত তনি বসে রইলেন নৌকার উপর। তাঁর মনে হল এই মায়াবী রাত যেন শেষ না হয়। ভোর হলেই মাঝিরা নৌকা ভাসিয়ে দেবে সাগরের উদ্দেশে। আর ভেসে যেতে তাঁর মন চাইছে না। জীবনখালির মাটিতেই তিনি ফেলতে চান তার জীবনের নোঙর। মনস্থির করে ফেললেন জনার্দন। কালই দেখা করবেন জমিদারবাবুর সঙ্গে।
সকাল হতেই বেরিয়ে পড়লেন জনার্দন। জেলেদের জিজ্ঞেস করে জেনে নিলেন জমিদার বাড়ির পথ। এখনই গিয়ে অনুমতি চাইবেন এই গ্রামে থাকার। প্রার্থনা করবে জমির জন্য। তাম্রলিপ্ত রাজপরিবারের সন্তান কল্যাণ রায়চৌধুরী তখন জীবনখালির জমিদার। অতীত গরিমা তাঁর আর নেই। জমিদারির ভার আর তিনি সইতে পারছে না। বাকি পড়েছে রাজস্ব। আর কিছুদিন পরেই হয়ত সম্রাটের দরবারে তাকে হাজির হতে হবে জবাব দিতে। যে জমিদারের এমন করুণ অবস্থা সে কি করে অন্যকে আশ্রয় দেবে! নিজের অক্ষমতা কল্যাণ রায়চৌধুরী জানিয়ে দিলেন উপাধ্যায়কে। হিসেবী ব্যবসায়ীর মতো পরিস্থিতি বুঝে নিলেন জনার্দন। সাত লক্ষ টাকার জমিদারী সোনার ডিম দেওয়া হাঁস। তাঁর কাছে যা অর্থ আছে তা দিয়ে অনায়াসে তিনি কিনে নিতে পারবেন কল্যাণ রায়চৌধুরীর জমিদারী। তারপর বাকি জীবন অন্যের শ্রমে আরামে কাটিয়ে দিতে পারবেন। রায়চৌধুরীকে বিনীত স্বরে বললেন, ‘জমিদারবাবু, একটা আর্জি ছিল’।
কল্যাণ বললেন, ‘‌আপনার কোনও আর্জি মেটানোর সামর্থ্য আমার নেই জনার্দনবাবু।  তবু আপনি বলুন। আমি সাধ্যমতো চেষ্টা করব।’‌
—‘‌আমি একটা প্রস্তাব দিচ্ছি। আপনার জমিদারী আমায় দিন। আমি সর্বস্ব দিয়ে কিনে নেব। এ আপনার সাধ্যাতীত নয়। আপনি না বলবেন না।’‌
কল্যাণ রায়চৌধুরী এক মুহূর্ত ভাবলেন। উপাধ্যায় বলে কী!‌ জমিদারী কিনবে? ক্ষণিকের জন্য জমিদারের আত্মাভিমান জেগে ওঠে। ক্রদ্ধ স্বরে না বলতে গিয়েও থেমে যান। পরক্ষণেই ভাবলেন মন্দ কী? জমিদারী কিনে নিলে তাঁরই লাভ। বকেয়া রাজস্বের দায় থেকে মুক্তি পাবে। এছাড়া বেশ কিছু অর্থও আসবে।  
জমিদারী হস্তান্তর হয়ে গেল। বাণিজ্য করতে আসা ব্রাহ্মণ হলেন জমিদার। লাভ করলেন আকবর বাদশাহর স্বীকৃতি। জমিদারী হাতে পেয়ে নদীর ধারে একটা বড় বাড়ি বানালেন জনার্দন। সে বাড়ি আজ আর নেই। সময়ের সাথে নদী তার পথ পরিবর্তন করে গিলে নিয়েছে। এখনকার রাজবাড়ি থেকে কিছুটা দূরে যে বড় লাল বাড়িটা সরীসৃপদের আস্তানা হয়ে পড়ে আছে, তা তৈরি হয়েছিল উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে। আর ‘ফুলবাগ প্যালেস’ নামের সাদা রাজবাড়িটার বয়স এখনও একশো হয়নি। ফুলবাগ প্যালেসের মিউজিয়ামে রাজপরিবারের অনেক স্মারক সযত্নে সাজিয়ে রাখা আছে। রাজাদের অস্ত্রশস্ত্র, শিকার করা পশুর দেহ, গানবাজনার সরঞ্জাম, আরও কত কী! রয়েছে পারিবারিক পালঙ্ক, রানির ব্যবহৃত শাড়ি। রাজাদের প্রশস্তিপত্র, সরকারি দস্তাবেজ প্রভৃতির সঙ্গে রয়েছে রাজা–রাণিদের নানান ছবি। রাজপরিবারের সদস্যদের ছবি দেখতে দেখতে চোখে ভেসে ওঠে এক দীর্ঘদেহি যুবক নদীর ঘাটে নামলেন। ধীরে ধীরে মিশে গেলেন সভ্যতার এক আদিপীঠ তাম্রলিপ্তের মাটিতে।

জনপ্রিয়

Back To Top