প্রিয়ম সেনগুপ্ত: কলকাতা ছেড়ে কোথাও যাননি। সশরীরে কলকাতাতেই রয়েছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। নিজের জন্মদিনে ভোর সাড়ে পাঁচটার মধ্যে পৌঁছে গিয়েছেন জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়িতে। প্রতিবারের মতো এবারও তাঁকে ঘিরে উপছে পড়েছে ভিড়। মেটাতে হয়েছে তাঁর সঙ্গে ছবি তোলার আবদার। না, খুব স্বাভাবিকভাবেই ইনি ১৯৪১ সালে প্রয়াত নোবেলজয়ী বিশ্বকবি নন। ইনি সোমনাথ ভদ্র। পেশায় বিএসএনলের কর্মী। স্ত্রী–কন্যা নিয়ে সংসার হেদুয়া পার্কের কাছে। সোমনাথ সোশ্যাল মিডিয়ায় বেশ পরিচিত মুখ। তাঁর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের চেহারার সাদৃশ্য এতটাই যে, চট করে দেখলেও আলাদা করা যায় না। মজার কথা হল, ব্যক্তিগত জীবনেও রবীন্দ্রনাথের প্রবল অনুরাগী ৫৭ বছর বয়সী এই প্রৌঢ়।
সোমনাথ বলছিলেন, ‘‌ছোটবেলা থেকেই আমি রবীন্দ্রঅন্তপ্রাণ। ওঁর গান আমাকে চুম্বকের মতো টানে। ছোট থেকেই যেখানে রবীন্দ্রসঙ্গীতের অনুষ্ঠান হতো, শুনতে ছুটে যেতাম। আর গায়ক–গায়িকাদের স্বাক্ষর সংগ্রহ করতাম আমার ডায়রিতে।

’‌ সুচিত্রা মিত্র, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, দেবব্রত বিশ্বাস, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়— কার সই নেই সেই ডায়রিতে। রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনতে শুনতেই রবীন্দ্রনাথের প্রেমে পড়া। আর এভাবেই জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির রবীন্দ্রভারতী সোসাইটির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন সোমনাথ। অফিসের চাপ সামলে আজও সোসাইটির যে কোনও কাজে নিবেদিতপ্রাণ সোমনাথ। সেখানে বসন্ত উৎসব, পঁচিশে বৈশাখ কিংবা বাইশে শ্রাবণ— সেখানে যে কোনও অনুষ্ঠানই হোক না কেন, মৃদুভাষী এই মানুষটির দেখা মিলবেই। তাছাড়া প্রতি বুধবার জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে দেখা মেলে তাঁর। দু’‌বছর পরে চাকরি থেকে অবসর নেবেন। সোমনাথ বলছিলেন, ‘‌তখন আরও ভালভাবে রবীন্দ্রনাথের কাজে অংশ নিতে পারব। এটাই মন দিয়ে করতে চাই। রবীন্দ্রনাথই আমার জীবনের ঈশ্বর।’‌
২৫ বৈশাখের সকালটা তুমুল ব্যস্ততার মধ্যে কেটেছে সোমনাথের। ভোরবেলা এসে জোড়াসাঁকোতে রবীন্দ্রভারতী সোসাইটির অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছেন। তারপরে অংশ নিয়েছেন পাড়ার প্রভাতফেরীতে।

অবশ্যই সেখানে রবীন্দ্রনাথের সাজেই দেখা গিয়েছে তাঁকে। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর চেহারা যে হুবহু মেলে সেটা ভাল করেই বুঝতে পারেন সোমনাথ। তিনি বলছিলেন, ‘‌একটা কথা বলতে চাই, আমি কিন্তু কখনওই রবীন্দ্রনাথকে নকল করার উদ্দেশ্য নিয়ে চলি না। আমাদের চেহারা, চুল, দাড়ি— সবই একেবারে রবীন্দ্রনাথের মতো। এখানে আমার কোনও হাত নেই। ছোটবেলাতেও আমাকে রবীন্দ্রনাথের মতো দেখতে। বেশ কয়েকবার রবীন্দ্রনাথের যৌবনের চরিত্রে অভিনয়ের ডাকও পেয়েছি। কিন্তু করিনি।’‌ তবে, সায়ন্তন সেনের পরিচালনায় ‘‌এ কোন রবি’‌ নামে একটি স্বল্প দৈর্ঘের ছবিতে অভিনয় করেছেন সোমনাথ। যা মুক্তি পাবে খুব শিগগিরই। চেহারার সাদৃশ্য কোনও বিরল ঘটনা বলেও মনে করেন না সোমনাথ। তাঁর দাবি, ‘‌আমার মামার দেহ সৎকারের জন্য যখন শ্মশানে নিয়ে গিয়েছিলাম, তখন আর একটি মৃতদেহ দেখে আমি চমকে যাই। কারণ, সেই দেহটির সঙ্গে আমার মামার চেহারার হুবহু মিল। এটা অনেকের সঙ্গেই হয়।

আমার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের চেহারার মিল বলে সেটা সকলের বেশি করে চোখে পড়ে।’‌ তবে এযুগের ‘‌রবীন্দ্রনাথ’‌ গান শুনতে ভালবাসলেও গাইতে পারেন না। পারেন না কবিতা লিখতেও। তাঁর আগ্রহ ছবি আঁকায়। কিন্তু কাজের চাপে রং–তুলি নিয়ে বসা হয় না দীর্ঘদিন।
সপ্তাহে অন্তত একবার জোড়াসাঁকোতে যান সোমনাথ। রবীন্দ্রনাথের ঘরের সামনে যখন দাঁড়ান, অজান্তেই শিহরিত হয়ে ওঠেন তিনি। সোমনাথের কথায়, ‘‌ওই অনুভূতিটা বলে বোঝানো যাবে না। মনে হয় মন্দিরের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। আমার চেহারার সাদৃশ্য নিয়ে রসিকতা করে অনেকে বলেন, এটা তো আপনারই বাড়ি। আমি মনে মনে হাসি আর ভাবি, এই জীবনে যদি ওঁর গান সবটা বোঝার ক্ষমতা পেতাম!‌’
রবীন্দ্রনাথের থেকে ‘‌রবীন্দ্রনাথ’‌ এর বেশি আর কিচ্ছু চান না।‌

 

 

 

 

 

 

ছবি—ফেসবুক ও 'এ কোন রবি'-র তরফে সায়ন্তন সেনের সৌজন্যে

জনপ্রিয়

Back To Top