অভিজিৎ চৌধুরি, মালদা, ৯ সেপ্টেম্বর- বাংলা–ঝাড়খণ্ডের মাঝ বরাবর অবস্থিত গদাই চর। আর সেই চরে অসহায় দরিদ্র গ্রামবাসীরা ফসল বিক্রি করে দুর্গাপুজোর আনন্দে সামিল হন। গ্রামের একমাত্র দুর্গাপুজো যাতে কোনওভাবে বন্ধ না হয় তার জন্য বছরের শুরু থেকেই বাড়ি–বাড়ি ফসল জমানো শুরু করেন কৃষকেরা। যাঁদের জমি নেই, তাঁরা দিনমজুরি করে টাকা জমান পুজোর খরচের জন্য। আর যাঁরা গবাদিপশু পালন করে রুজি রোজগার করেন, তাঁরাও এক প্রকার টাকা জমিয়ে এই পুজোর আনন্দে শামিল হন। 
মানিকচক ব্লকের ভুতনি থানার অন্তর্গত হীরানন্দপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের গঙ্গা নদীর মাঝ বরাবর রয়েছে গদাই চরটি। এক প্রান্তে পশ্চিমবঙ্গ অপরপ্রান্তে ঝাড়খন্ড রাজ্য। রোজগারের জন্য ভিন রাজ্যে যেতে হয় ওই চরের বাসিন্দাদের। গদাই চরে ভোটার সংখ্যা প্রায় দুই হাজার। কিন্তু জনসংখ্যা প্রায় চার হাজার। কৃষিকাজ, মাছ ধরা, গবাদিপশু পালন এবং ভিন রাজ্যে শ্রমিকের কাজ করাই হচ্ছে এই চরের বাসিন্দাদের প্রধান জীবিকা। স্বাধীনতার ৭৩ বছর পরেও শিক্ষা–স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ, পাকা রাস্তা গড়ে ওঠেনি। এ নিয়ে ওই গ্রামের মানুষদের ক্ষোভ–অসন্তোষ থাকলেও পুজোর মরশুমে তা সবই ম্লান হয়ে যায়। যেভাবেই হোক প্যান্ডেল করে চারদিন ধুমধাম দুর্গাপুজোয় শামিল হন গদাই চরের বাসিন্দারা।
স্থানীয় গ্রামবাসী ছত্রপতি মাহাতো, বাবলু মাহাতো, মহাবীর মাহাতো–দের বক্তব্য, পুজোর জন্য কারও কাছে হাত পাততে যান না। গ্রামবাসীরা যে যতটা পারেন সামান্য কিছু দিয়ে সাহায্য করেন। যদিও বছরের শুরু থেকেই অল্প অল্প করে রোজগারের থেকে টাকা সরিয়ে রাখা হয়। আর সেই অর্থ দিয়েই গ্রামে ধুমধাম করে চলে পুজোর আয়োজন। মানিকচক শহর থেকে ভাড়া করে নিয়ে আসা হয় জেনারেটর। চার দিন গ্রামে আলো জ্বলে। আর তাতেই আনন্দের তিল ধারণের জায়গা থাকে না। বাকি দিন ডুবে থাকতে হয় ঘন অন্ধকারে। দেবী দুর্গাকে ঘিরে গ্রামবাসীদের মধ্যে পংক্তি ভোজনেরও আয়োজন করা হয়। কিন্তু চার দিন শেষ হলে আবার সেই দুঃখ–দুর্দশা আর রুজি–রোজগারের লড়াই শুরু হয় সকলের মধ্যে।
গদাই চরের বাসিন্দাদের বক্তব্য, ‘‌দেবী দুর্গা আসেন, তখন গ্রাম আলোকিত হয়। মা চলে যেতেই আবার অন্ধকারে ডুবে যায়। জানি না এই চরের ভবিষ্যৎ কী।’‌ গদাই চরের বাসিন্দা নিরানন্দ মাহাতো, সাবিত্রী মাহাতো‌দের বক্তব্য, ‘‌গ্রামে এখনও নির্মল বাংলা প্রকল্পে পাকা শৌচাগার পাইনি‌। সামান্য অসুখের জন্য রোগ নির্ণয় করতে গুণী ওঝাই ভরসা। এত কষ্ট, তাও দেবীদুর্গা আমাদের গ্রামে আসেন। দেবীকে পূজা করতে পেরে আমরা ধন্য হয়ে যাই। জানি না এরকমভাবে এই গ্রামের পুজো কতদিন টিকে থাকবে।’‌
হীরানন্দপুর গ্রাম পঞ্চায়েত সদস্য সঞ্জয় চৌধুরি জানিয়েছেন, গ্রামবাসীদের জন্য যতটা পারব পঞ্চায়েত থেকে সহযোগিতা করা হবে। তবে সোলার সিস্টেমের বিদ্যুৎ চালু করার পরিকল্পনা নিয়েছে প্রশাসন। পাশাপাশি উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র, শিক্ষা কেন্দ্র চালু করা নিয়ে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।‌

সমস্যার কথা জানাচ্ছেন গদাই চরের বাসিন্দারা। ছবি:‌ প্রতিবেদক

জনপ্রিয়

Back To Top