সুনীল চন্দ, রায়গঞ্জ, ৫ ফেব্রুয়ারি- ট্রেন চলছে সৌরশক্তিতে। পাশাপাশি প্রহরীবিহীন লেভেল ক্রসিংয়ে ট্রেন আসার আগেই আপনা–‌আপনি বন্ধ হয়ে যাবে রেলগেট। আবার ট্রেন চলে যাওয়ার পর আপনা–‌আপনিই খুলে যাবে লেভেল ক্রসিংয়ের বন্ধ রেলগেট। রেলগেট নিয়ন্ত্রিত হবে ইকো–‌ফ্রেন্ডলি কন্ট্রোলারের মাধ্যমে। এমনই আলোড়ন সৃষ্টিকারী আবিষ্কার কোনও বিজ্ঞানী বা রেল ‌ইঞ্জিনিয়ারের নয়, আবিষ্কারটি দশম শ্রেণির দু্ই মেধাবী ছাত্র সৌরভ সরকার ও আকাশ দাসের। সৌরভ ও আকাশ রায়গঞ্জের প্রত্যন্ত গ্রাম হাতিয়া হাই স্কুলের পড়ুয়া। স্কুলটি উচ্চমাধ্যমিক হলেও, এখনও যে স্কুলে চালুই হয়নি বিজ্ঞান বিভাগ। দশম শ্রেণির দুই ছাত্রের এই মডেল আবিষ্কার নিয়ে শোরগোল পড়ে যাওয়ায় ওই দুই ছাত্রের তৈরি মডেলটি দেখতে যান পূর্বতন রায়গঞ্জ ইউনিভার্সিটি কলেজের অধ্যক্ষ ড.‌ দিলীপ দে সরকার, ডাঃ ডি এন মজুমদার–‌সহ স্থানীয় বিজ্ঞান মঞ্চের সদস্যরা। সবাই মডেলটি দেখে বিস্মিত। এঁরা একের পর এক প্রশ্ন করেন দুই পড়ুয়াকে। সব ক’‌টি প্রশ্নের যথাযথ উত্তর দেওয়ায় খুশি প্রশ্নকর্তারা। দুই খুদে বিজ্ঞানী জানায়, তাদের তৈরি চক্রাকার রেললাইনের পাশে রয়েছে সোলার সিস্টেম। দুই প্রান্তে রয়েছে দুটি রেলগেট। মাঝখান দিয়ে চলে গেছে রাস্তা। রেললাইনে বসানো হয়েছে লাইটনিং ডিটেকশন সেন্সর। ট্রেনটি রেলগেটের কাছাকাছি আসার আগে জ্বলে উঠবে লাল আলো। সেন্সরের মাধ্যমে রেলগেট বন্ধ হয়ে যাবে নিজে–‌নিজেই। এতে রেলগেটে প্রয়োজন হবে না কোনও কর্মীর। ফলে খরচ কমবে রেলের। ট্রেন সোলার লাইট অর্থাৎ সৌরশক্তিতে চলায় প্রয়োজন হবে না  ডিজেলের বা বিদ্যুতের। এতে রেলের যেমন খরচ কমবে, তেমনি যাত্রীরা উপকৃত হবেন রেলভাড়া কমে যাওয়ার সম্ভাবনায়। মডেলটি দেখে খুশি রায়গঞ্জের বিডিও অনুরাধা লামা জানিয়েছেন, এ নিয়ে তিনি রিপোর্ট পাঠাবেন জেলাশাসকের কাছে। যাতে ছাত্রদের এই আবিষ্কার স্বীকৃতি পায়। তবে খবর জেনে জেলাশাসক আয়েষা রানি জানিয়েছেন, মঙ্গলবারই একটি বিশেষজ্ঞ দল তিনি পাঠাবেন হাতিয়া হাই স্কুলে। প্রয়োজনে মডেলটি পাঠোনো হবে রাজ্য স্তরে এবং কেন্দ্রীয় প্রযুক্তি মন্ত্রকে। স্কুলের প্রধান শিক্ষক অনিরুদ্ধ সিনহা জানিয়েছেন, এই দুই মেধাবী ছাত্রের এটি প্রথম আবিষ্কার নয়, এর আগেও হাইড্রোলিক ক্রেন বানিয়ে হইচই ফেলেছিল এই দুই পড়ুয়া। বিজ্ঞান মঞ্চের তরফে প্রথম পুরস্কার দেওয়া হয় এদের। রায়গঞ্জ কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ ড.‌ দিলীপ দে সরকার বলেন, ছাত্র দু’‌জন মেধাবী নিঃসন্দেহে। দশম শ্রেণির পড়ুয়ারা ‘‌পাসকেল ল’‌ এবং হাইড্রোলিক সিস্টেম প্রেসারের প্রয়োগ ঘটিয়েছে রেলগেট স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ এবং খোলা নিয়ে। তবে এর বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব তা বলবেন মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারেরা। জেলার সহকারী বিদ্যালয় পরিদর্শক বিবেকানন্দ মণ্ডল বলেন, যে স্কুলে উচ্চমাধ্যমিক স্তরে বিজ্ঞান শাখাই নেই, সেই স্কুলই কিনা খুদে বিজ্ঞানীর আঁতুড়ঘর। জানা গেছে, এই দুই খুদে বিজ্ঞানীর দু’‌বেলা পেট পুরে খাবার পর্যন্ত জোটে না। বাস করে টালির চালার বেড়ার ঘরে। বাবা–‌মায়েরা কেউ কৃষক, কেউ শ্রমিক। তবে আকাশ ও সৌরভের আপাতত ইচ্ছে উচ্চমাধ্যমিকে বিজ্ঞান নিয়ে পড়ার। ভবিষ্যৎ স্বপ্ন রেলের ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার। বিজ্ঞানের শিক্ষক সন্তোষ বর্মন, নিরঞ্জন মণ্ডল, প্রসেনজিৎ সিংহরায় ও মিঠু মল্লিকের আশা, ভবিষ্যৎ জীবনে সফল হোক এই দুই কৃতী ছাত্র।
স্কুলে মডেল–‌সহ দুই খুদে বিজ্ঞানী। ছবি:‌ সুনীল চন্দ
 

জনপ্রিয়

Back To Top