কোনও কাজ, অভিযোগ ফেলে রাখা যাবে না, নির্দেশ ‌‌মুখ্যমন্ত্রীর

সব্যসাচী ভট্টাচার্য, শিলিগুড়ি: ‌‘‌কোনও কাজ, অভিযোগ ফেলে রাখা যাবে না। বকেয়া কাজ শেষ করতে হবে দ্রুত। মনে রাখবেন সময় খুব গুরুত্বপূর্ণ।’‌
সাড়ে ছ’‌মাস পর জেলা সফরে বেরিয়ে আলিপুরদুয়ার ও জলপাইগুড়িকে নিয়ে প্রশাসনিক সভায় এটাই ছিল মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের মূল সুর। সভা হল শিলিগুড়ির উত্তরকন্যায়। উদ্বাস্তুদের আইনগত স্বীকৃতি দেওয়া থেকে কাস্ট সার্টিফিকেট বা অভিযোগ নিষ্পত্তি, সব ক্ষেত্রেই দ্রুত কাজ শেষ করার বার্তা দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। কাজ ফেলে রাখলে যে প্রশাসনিক আধিকারিকদের জবাবদিহি করতে হবে তা–‌ও স্পষ্ট করে দিয়েছেন তিনি। কার্যত এদিনও তিনি কিছু কিছু ক্ষেত্রে অসন্তুষ্ট হয়ে জবাব চেয়েছেন।
এদিন উত্তরকন্যায় কোভিড প্রোটোকল মেনে প্রশাসনিক বৈঠক সারেন মুখ্যমন্ত্রী। বৈঠকের শুরুতেই করোনা মোকাবিলায় দুই জেলার অগ্রগতি খতিয়ে দেখেন। মুখ্যসচিব রাজীব সিনহা জানিয়ে দেন আলিপুরদুয়ার ও জলপাইগুড়ি জেলায় করোনা মোকাবিলার কাজ সন্তোষজনক। কিছু ক্ষেত্রে কোভিড সংক্রান্ত তথ্য আপলোড করতে দেরি হচ্ছে। এই কাজ প্রতিদিন করার নির্দেশ দেন মুখ্যমন্ত্রী। জেলাশাসকদের বিশেষ উদ্যোগ নিতে বলেন। মুখ্যমন্ত্রী জানান, সবাই করোনা মোকাবিলায় ভাল কাজ করছেন।
বৈঠকে উদ্বাস্তুদের স্বীকৃতির ক্ষেত্রেও বিশেষ উদ্যোগের কথা জানিয়ে দেন মুখ্যমন্ত্রী। রাজ্য সরকারের জমিতে রাজ্য সরকার এঁদের পাট্টা দিয়েছে, তার সঙ্গে ব্যক্তিগত ও কেন্দ্রীয় সরকারের জমিতে থাকা উদ্বাস্তু কলোনিগুলোকেও স্বীকৃতি দেওয়ার কথা সরাসরি জানিয়ে দেন। মৃদুল গোস্বামী, গৌতম দেবরা বিধায়ক বা পুরসভার শংসাপত্রের কথা জানালে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, এক্ষেত্রে সেল্ফ ডিক্লেয়ারেশনই যথেষ্ট। কারও শংসাপত্র লাগবে না। এদিন দপ্তর ধরে ধরে যে সব কাজ না হওয়ার অভিযোগ পড়ে আছে সেগুলো দ্রুত শেষ করার কথা বলেন।
পাট্টা, কাস্ট সার্টিফিকেট–সহ সরকারের কাজ এখন অধিকাংশই অনলাইনে হচ্ছে। মুখমন্ত্রীর নির্দেশে মুখ্যসচিব জানিয়ে দেন, রাজ্য জুড়ে ২৮০০ বাংলা সহায়তা কেন্দ্র খোলা হচ্ছে। মূলত লাইব্রেরি, স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মতো জায়গায় যেখানে মানুষ যান তেমন জায়গাতেই এই কেন্দ্র খোলা হবে। এই কেন্দ্রগুলো থেকে বিনামূল্যে সরাকরি পরিষেবার কাজ সারতে পারবেন সাধারণ মানুষ। জেলা ধরে ধরে সরকারি প্রকল্পের খোঁজ নেন মুখ্যমন্ত্রী। সংখ্যালঘু স্কলারশিপ, আদিবাসী স্কলারশিপ, শিক্ষাশ্রীর কাজ কোথায় কেন পিছিয়ে আছে খতিয়ে দেখে দ্রুত শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়। জলপাইগুড়ি ও আলিপুরদুয়ার জেলায় পরিযায়ী শ্রমিকদের কতজনকে কাজ দেওয়া হয়েছে জেলাশাসকদের কাছে জানতে চান মুখ্যমন্ত্রী। 

জলপাইগুড়ি জেলায় ২৬ হাজার শ্রমিকের মধ্যে ২০ হাজার কাজ পেয়েছেন ও আলিপুরদুয়ার জেলায় ১৪৫১৮ জনের মধ্যে সবাইকেই কাজে লাগানো গেছে বলে মুখ্যমন্ত্রীকে জেলাশাসকরা জানান। আলিপুরদুয়ার ও জলপাইগুড়ি জেলা পরিষদের সভাধিপতিদের কাছেও কাজের খতিয়ান নেন মুখ্যমন্ত্রী। তঁাদের উদ্দেশে ‌মুখ্যমন্ত্রীর বার্তা, ‘‌সময় নষ্ট করবেন না, সময় খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’‌
আলিপুরদুয়ার জেলা পরিষদের সভাধিপতি শীলা দাস সরকার পঞ্চদশ অর্থ কমিশনের কাজের জন্য পাসওয়ার্ড না মেলার অনুযোগ করেন। মুখ্যমন্ত্রী দ্রুত তা দেখে নেওয়ার নির্দেশ দেন আধিকারিকদের। ধূপগুড়িতে কর্মতীর্থের কাজে দেরি হওয়ার প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘প্রয়োজনে নিজেদের মাথায় ইট নিয়ে গিয়ে কাজ করতে হবে।’‌ রাজ্যে গ্রামীণ রাস্তার কাজ কেন্দ্রীয়ভাবে হবে বলে জানিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‌আগামীকাল ১২ হাজার রাস্তার উদ্বোধন করব।’‌ চা–বাগান প্রসঙ্গে শ্রমমন্ত্রী মলয় ঘটক জানান, লকডাউনে ন’‌টি বন্ধ চা–‌বাগান খোলা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী কেন্দ্রকে বিঁধে বলেন, কেন্দ্র সাতটি চা–‌বাগান খোলার প্রতিশ্রুতি দিলেও তা খোলেনি। কৃষি বিল নিয়েও কেন্দ্রের সমালোচনা করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‌রাজ্যের কৃষি দপ্তরকে ভাবতে হবে আমাদের কী করণীয়।’‌
এদিন বৈঠকের শেষে জলপাইগুড়ি ও আলিপুরদুয়ারের পুলিশকে আরও সক্রিয় হওয়ার নির্দেশ দেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘‌সোশ্যাল নেটওয়ার্ক নজরে রাখুন, পুলিশ থেকেও ব্লকে দু’‌জন করে রাখা হচ্ছে, যারা গুজব ধরবে।’
এদিনের প্রশাসনিক বৈঠকে ছিলেন মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস, মলয় ঘটক, গৌতম দেব, ইন্দ্রনীল সেন–সহ আরও জনপ্রতিনিধিরা। ছিলেন স্বরাষ্ট্রসচিব আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায়। বুধবার মুখ্যমন্ত্রী প্রশাসনিক বৈঠক করবেন কোচবিহার, দার্জিলিং ও কালিম্পং জেলাকে নিয়ে।