অম্লানজ্যোতি ঘোষ, আলিপুরদুয়ার, ২৫ নভেম্বর- শেষমেশ বক্সা পাহাড় থেকে সমতল ডুয়ার্সের বাজারে নেমে এল বিখ্যাত কমলালেবু। ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী বিগত ৭ দিনে পাঞ্জাব, নাগপুরের লেবুকে টেক্কা দিয়ে সেসবের চেয়ে অধিক দামে বিক্রি হচ্ছে বক্সা পাহাড়ের লেবু। পাঞ্জাব বা নাগপুরের সুন্দর ‌চকচকে ৪টি লেবুর দাম যেখানে ৪৫–৫০ টাকা। সেখানে বক্সার লেবু ততটা দর্শনধারী না হলেও বিক্রি হচ্ছে ৬০–৬৫ টাকায়।
শীতের মরশুম মানেই আম আদমির কাছে যথেষ্ট জনপ্রিয় কমলালেবু। প্রতিবছর ভিন রাজ্যের লেবু আলিপুরদুয়ারের বাজার কাঁপিয়ে চলে যায়। তা সে মিষ্টি কম হলেও অনেকেই আছেন লেবু কিনে খেতে বাধ্য হতেন। তবে এবার পরিস্থিতি সামান্য আলাদা। জেলা সদরের ছোট বড় ৫–৬টি বাজারের সবক’‌টিতেই কিন্তু পাওয়া যাচ্ছে বক্সার লেবু। আলিপুরদুয়ার বড় বাজারে হাতে গোনা ৩–৪ জন ফল বিক্রেতা গত ৭–৮ দিন ধরে বিশেষ লেবুর পসরা সাজিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম গৌতম ঘোষ বলেন, ‘‌সপ্তাহে একদিন পাহাড় থেকে লেবু নেমে আসে। অনেক বেশি মিষ্টি। চাহিদার তুলনায় জোগান কম। স্বাভাবিকভাবে দাম একটু বেশি। তবে যাঁরা চেনেন তাঁরা কিনে নিয়ে যাচ্ছেন।’‌ 
আলিপুরদুয়ারে বক্সা পাহাড়ের কমলালেবুর জনপ্রিয়তা একটা সময় বাংলাদেশ, অসমে ছড়িয়ে পড়ে। বক্সা পাহাড়ে থাকা কয়েক লক্ষ কমলালেবুর গাছের ফলন ডুয়ার্সের চাহিদা মিটিয়ে পৌঁছে যেত প্রতিবেশী দেশেও। তবে ১৯৮৬ সালের পর বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্প ঘোষণা হয়। নিষিদ্ধ হয় টাইগার রিজার্ভের ভেতর চাষবাস। এরপর ১৯৯৩–এর বন্যার আগে পরে নষ্ট হয়ে যায় প্রচুর গাছ। তবে জেলা কৃষি দপ্তর, রাজাভাতখাওয়া গ্রাম পঞ্চায়েতের উদ্যোগে ২০১৬–র পরই উদ্যোগ নেওয়া শুরু হয়। ৩ বছরেই ফল হাতেনাতে। 
বক্সা পাহাড়ে থাকা ১৪–১৫টি গ্রামের প্রায় সবক’‌টিতেই কিছু কিছু লেবু চাষ হয়। কমবেশি ৩০০ চাষি রয়েছেন। ২০১৬ সালে ১০০ দিনের প্রকল্পে অভিনব একটি পরিকল্পনা নেওয়া হয়। প্রায় ২০ হাজার গাছের চারা বিলি করা হয়। শর্ত ছিল, গাছ পরিচর্যা করে বড় করে তুলতে হবে। ঠিক ৬ মাস পর বেনিফিসিয়ারি প্রকল্পের জন্য মাথা প্রতি বরাদ্দ অর্থ পেয়ে যাবেন। অনেক চাষি উৎসাহিত হয়।  বক্সার কমলালেবু চাষি সাঙ্গে ডুকপা বলেন, ‘‌জলসেচের একটা সমস্যা আছে। কীট–পোকার আক্রমণ আছে। তবুও ফলন হয়েছে। আমরা আলিপুরদুয়ারে বাজারে বিক্রি করতে পারছি। আগামী বছর আরও বেশি ফলন হবে আশা করছি।’‌ প্রকৃতিপ্রেমিকদের অনেকে বলেন, সঠিক পরিকল্পনা থাকলে বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্পের জীব বৈচিত্রকে রক্ষা করেই এখনও ভাল মাত্রায় কমলালেবুর চাষ সম্ভব পাহাড়ে। 
জেলা উদ্যান পালন দপ্তর থেকে চমকপ্রদ তথ্য উঠে এসেছে এদিন। জানা গেছে, আলিপুরদুয়ার ১ নম্বর ব্লকে জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যান লাগোয়া শালকুমারহাট গ্রামে ৫ জন কমলালেবু চাষি মিষ্টি কমলা ফলিয়ে ইতিমধ্যে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন। কীভাবে শালকুমারে মিষ্টি লেবু ফলানো সম্ভব হল তা দ্রুত খতিয়ে দেখবেন কৃষি কর্তারা। জেলা উদ্যান পালন দপ্তরের অন্যতম আধিকারিক সন্দীপ মহন্ত বলেন, ‘‌৩টি ধাপে আমরা বক্সাতে চারা বিলি করেছি। মাদারিহাট–বীরপাড়া ব্লকে টোটোপাড়া, রাঙালিবাজনা গ্রামে চারা দেওয়া হয়েছে।’‌ জানা গেছে, আবহাওয়া ও মৃত্তিকা দুটিই বক্সাতে অনুকূল। টোটোপাড়ার লেবু জনপ্রিয়। এবারও ফলন হয়েছে। তবে তাক লাগিয়েছে বক্সার লেবু। 

বক্সা পাহাড়ের কমলালেবু। ছবি:‌ প্রতিবেদক ‌

জনপ্রিয়

Back To Top