সব্যসাচী ভট্টাচার্য, কার্শিয়াং: ব্যয় সংযত রেখে পাহাড়ে উন্নয়ন যজ্ঞ মুখ্যমন্ত্রীর। বুধবার কার্শিয়াং কমিউনিটি হলে দার্জিলিং ও কালিম্পং জেলার প্রশাসনিক সভা থেকে এমন বার্তাই দিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। শুরুতেই পরিষ্কার করে দেন, বিপুল খরচ দেখিয়ে ডিপিআর করা নয়, বরং ধাপে ধাপে কাজ এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। এর জন্য পূর্ত দপ্তরকে বিভিন্ন প্রকল্পের ডিপিআরের মডেল তৈরির নির্দেশ দেন। এদিন পাহাড়ের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজের অগ্রগতি খতিয়ে দেখতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী তোলেন দার্জিলিং হিল ইউনিভার্সিটির কথা। জেলাশাসক তঁাকে জানান, ৩৩৩ কোটি টাকা ব্যয়ে প্ল্যান এস্টিমেট তৈরি হয়েছে। এতেই থমকে যান মুখ্যমন্ত্রী। সরাসরি জানতে চান, এত খরচ কেন?‌ এই বিপুল খরচ কমিয়ে ৫০ কোটি টাকায় প্ল্যান এস্টিমেট তৈরির নির্দেশ দেন তিনি। একই ভাবে সদ্য গঠিত জেলা কালিম্পঙে প্রশাসনিক ভবন তৈরির জন্য ১০ কোটি টাকার খরচ কমিয়ে ২ কোটি টাকা করার কথাও বলেন তিনি। এই প্রসঙ্গেই মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‌আমি নির্দেশ দিচ্ছি, বিভিন্ন দপ্তরের কথা না শুনে পূর্ত দপ্তর ডিপিআর তৈরির ক্ষেত্রে মডেল তৈরি করে দেবে। স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল, প্রশাসনিক ভবন, সুপার স্পেশ্যালিটি হাসপাতালের মডেল এখন থেকে করে রাখবে।’‌ এদিন মুখ্যমন্ত্রীর বিশেষ নজরে ছিল পাহাড়ের উন্নয়ন বোর্ডগুলোর কাজকর্মও।
উন্নয়ন বোর্ডগুলোকে কাজের জন্য প্রচুর অর্থ দিয়েছে রাজ্য সরকার। এদিন মুখ্যমন্ত্রী জানান, বরাদ্দ টাকায় বোর্ডগুলো কত বাড়ি তৈরি করতে পেরেছে, কত বাড়ি অসম্পূর্ণ রয়েছে, অডিট ও রিভিউ করে সরকারকে জানাতে হবে। যে বাড়িগুলো অসম্পূর্ণ রয়েছে, সেগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। সরকারের তরফেও অডিট হবে। তারপর আবার কাজ হবে। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‌আমি কয়েক হাজার বাড়ি তৈরির জন্য টাকা দিয়েছি, যাঁরা পেয়েছেন ভাল, অনেক কমিউনিটি সেন্টারও হয়েছে। যেটা হয়নি সেটা আমাকে দেখতে হবে।’‌ বৈঠকে পাহাড়ের বেকারির সমস্যার কথা তুলে ধরেন জিটিএ কেয়ারটেকার বোর্ডের চেয়ারম্যান অনীত থাপা। জিটিএ–‌তে কর্মরত গ্রুপ–ডি কর্মচারীদের দাবির কথা জানান রোহিত শর্মা। দু’‌জনকেই মুখ্যমন্ত্রী পাহাড়ের পরিস্থিতি স্থিতিশীল ও শান্ত রাখার পরামর্শ দেন। সিআইআইয়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলার সময়ও মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, দার্জিলিঙে সব কিছু হতে পারে, কিন্তু বছর দু’‌য়েক পর পর আগুন জ্বালালে কিছু হবে না। নির্বাচনের সময় এলেই গড়বড় করা হয়। এবছর পাহাড়ে পর্যটন সংক্রান্ত বিপণনের কাজ ঠিকমতো হয়নি বলেও আক্ষেপ করেন মুখ্যমন্ত্রী।
এদিন পাহাড়ের উন্নয়নে ফের কার্শিয়াঙে আইটি পার্ক করার কথা জানান মুখ্যমন্ত্রী। এনিয়ে শিল্পমহলকে উদ্যোগী হতে বলেন। সিআইআইয়ের তরফে লক্ষ্মী লিম্বু কৌশল, নরেশ আগরওয়ালরা মুখ্যমন্ত্রীকে আশ্বস্ত করেন, ২০১৮ সালে দার্জিলিঙে অনুষ্ঠিত সিনার্জি–র সিদ্ধান্ত মতো পাহাড়ে মধু উৎপাদন কেন্দ্র, বড় এলাচের বিপণন, তুলসী রস তৈরির মতো উদ্যোগের কাজ দ্রুত গতিতে এগোচ্ছে। ফুলঝাড়ু তৈরির কাজে এমএসএমই দপ্তরের সহযোগিতা চান শিল্পপতিরা। এক্ষেত্রে শিলিগুড়িতে কৃষক বাজারটি প্রয়োজনমতো ব্যবহারের নির্দেশ দেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রী পাহাড়ের উন্নয়নে অর্কিড রপ্তানি, রাইস মিল, কোল্ড স্টোরেজ করার পরামর্শ দেন শিল্পপতিদের। জানিয়ে দেন, পাহাড়ে কিছু এলাকায় বিপণন কেন্দ্র গড়ে তোলা হোক। এতে কর্মসংস্থান হবে। এজন্য পিপিপি মডেলে কাজ করা যেতে পারে। তার জন্য জেলাশাসককে নিয়ে কমিটি গড়ার নির্দেশও দেন তিনি। 
বরাবরের মতো পাহাড়কে এগিয়ে নিয়ে যেতে পর্যটনও পাখির চোখ ছিল মুখ্যমন্ত্রীর। টি ট্যুরিজম, মিরিকে পাইন বন এলাকায় কটেজ তৈরির পরামর্শ দেন। এছাড়া মিরিকে সুইস কটেজ নির্মাণ, লেক সংস্কারের কাজের অগ্রগতি খতিয়ে দেখে তিন মাসের মধ্যে কাজ শেষের নির্দেশ দেন। লাভা–লোলেগঁাওয়ের উন্নয়নে বিশেষ নজর দেওয়ার কথা বলেন। এদিন মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে কিছুটা ক্ষোভের সুর শোনা যায় দার্জিলিঙের উন্নয়ন নিয়ে। দার্জিলিঙের পরিচ্ছন্নতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন মুখ্যমন্ত্রী। শৈল শহরের রাস্তার হাল, আলো নিয়ে আরও সক্রিয় হওয়ার পরামর্শ দেন প্রশাসন ও জিটিএ–‌কে। ম্যাল, লালকুঠি, টাইগার হিল, নিবেদিতার বাড়ির মতো এলাকাগুলোর উন্নয়নে নজর রাখার কথা বলেন। দিনে তিনবার করে দার্জিলিঙের রাস্তা পরিষ্কার করার কথা বলেন। এক্ষেত্রে ১০০ দিনের কাজের মাধ্যমে কর্মী নিয়োগের নির্দেশও দেন। উন্নয়নমূলক কাজের তদারকির দায়িত্ব উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন পর্ষদের চেয়ারম্যান অমর সিং রাই, কার্শিয়াঙের বিধায়ক রোহিত শর্মা, কালিম্পঙের বিধায়ক সরিতা রাইয়ের ওপর ন্যস্ত করেন। তিন মাস পর ফের পাহাড়ে এসে অগ্রগতি খতিয়ে দেখার কথা বলেন তিনি। এদিন আবাসন, আইনশৃঙ্খলা ও জমি সংক্রান্ত নিজস্ব সূত্রে পাওয়া কিছু অভিযোগ ডিজি, মুখ্যসচিব–‌সহ আধিকারিকদের হাতে তুলে দেন মুখ্যমন্ত্রী। দার্জিলিং চা–বাগানে শ্রমিকদের বোনাসের র দ্বিতীয় কিস্তির টাকা যাতে দীপাবলির আগেই মিটিয়ে দেওয়া যায়, সেই বিষয়টিও দেখে নেওয়ার নির্দেশ দেন। মুখ্যমন্ত্রী ছাড়াও এদিনের বৈঠকে ছিলেন রাজ্যের মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস, মলয় ঘটক, গৌতম দেব, ইন্দ্রনীল সেন। বৈঠকের শুরুতে কিছু প্রকল্পের উদ্বোধনও করেন মুখ্যমন্ত্রী। বৈঠকের পর তিনি ডাওহিলে প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ খতিয়ে দেখতে যান। সেখানে ডাওহিল স্কুল কর্তৃপক্ষ ও পড়ুয়াদের সঙ্গে কথাও বলেন। বৃহস্পতিবার শিলিগুড়িতে এসে শুক্রবার কলকাতা ফিরে যাওয়ার কথা রয়েছে তঁার।

জনপ্রিয়

Back To Top