অলক সরকার, কোচবিহার, ১৮ নভেম্বর- ‘‌মানুষের নাগরিকত্বের অধিকার দেবে না, কিন্তু ভোটে জেতার জন্য টাকা সাপ্লাই করবে বাংলায়। কুৎসা রটাবে। অপপ্রচার করবে। টিকবে না এই ফন্দি, জনগণের রায়ে হয়ে যাবে বন্দি।’‌ বিজেপি–‌কে আক্রমণ করে এভাবেই সরব হলেন তৃণমূল নেত্রী মমতা ব্যানার্জি। কোচবিহার নেতাজি ইনডোর স্টেডিয়ামে তৃণমূলের কর্মিসভায় এদিন এনআরসি–‌‌র তীব্র প্রতিবাদ করে বাংলার মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। সিটিজেনশিপ অ্যামেন্ডমেন্ট বিলকে ‘‌খুড়োর কল’ বলে মন্তব্য করে বাংলার মানুষকে সতর্ক হওয়ার বার্তাও দেন।
তৃণমূল নেত্রী লোকসভা নির্বাচনের পর প্রথম কোচবিহার আসেন। উত্তরবঙ্গে বিপুল উন্নয়নের খতিয়ান তুলে ধরেন। কোচবিহারে বিজেপি–‌র ভোটে জেতার প্রসঙ্গে তিনি জানান, ‘‌এরা অপপ্রচার করে পেশিবলে অর্থবলে মানুষকে বিভ্রান্ত করেছে। কুৎসা রটিয়েছে। রাতের অন্ধকারে টাকা বিলিয়ে অপারেশন করেছে। বর্ডারে কেন্দ্রীয় বাহিনীকে দিয়েও করিয়েছে। মানুষে মানু্ষে ভেদাভেদ লাগিয়ে দিয়েছে।’‌ হায়দরাবাদের একটি দল এই রাজ্যে বিজেপি–‌র হয়ে টাকা তোলে বলেও অভিযোগ করেন। এরপরেই তিনি বিজেপি–‌র বিরুদ্ধে আরও সরব হয়ে জানান, ‘আমি উত্তরবঙ্গে বারে বারে আসি। কিন্তু বিজেপি শুধুই নির্বাচনের সময় আসে। তখন কুৎসা ও ভোটে জেতার জন্যই আসে।’‌ 
এরপর এনআরসি নিয়ে বিজেপি–‌কে আরও কঠিন ভাষায় আক্রমণ করেন মুখ্যমন্ত্রী। ‌তারপর মানুষের উদ্দেশে বলেন, বিজেপি ধর্মে ধর্মে বিভেদ করছে। কিন্তু বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্যই হল আমাদের সবচেয়ে বড় ধর্ম। তিনি সব ধর্মের মানুষকে নিয়েই চলার কথা বলেন। এবং অভয় দেন, বাংলায় এনআরসি হবে না। 
উল্লেখ্য, কোচবিহার রাসমেলার ইতিহাসে প্রথমবার কোনও মুখ্যমন্ত্রী রাসচক্র ঘোরালেন। এদিন কর্মিসভার পর রাসমেলা মঞ্চে দাঁড়িয়ে জেলার মানুষের জন্য উন্নয়ন প্রকল্প ঘোষণা করলেন। আবার মদনমোহন মন্দিরে গিয়ে পুজোও দিলেন ডালা সাজিয়ে। সেখানেও রাখলেন অভিনবত্ব এবং সম্প্রীতির উজ্জ্বল নিদর্শন। পাশাপাশি ধর্মীয় সঙ্কীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে মানবধর্মের চিরায়ত বার্তা দিলেন। পরে রাসমেলার মঞ্চে গিয়ে সাবেক ছিটমহলের ১০৪ জনের হাতে তুলে দিলেন ফ্ল্যাটের চাবি। 
কোচবিহার রাসমেলার এবার ২০৭তম বর্ষ। এই মেলায় আসার জন্য বারবার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল মুখ্যমন্ত্রীকে। ১৩ নভেম্বর আসার কথা থাকলেও আচমকা প্রাকৃতিক দুর্যোগ ‘‌বুলবুল’–এর জন্য আসতে পারেননি মুখ্যমন্ত্রী। মুখ্যমন্ত্রী মেলা বা ভিড় এলাকা পছন্দ না করলেও এদিন মানুষের ডাকে শেষমেশ রাসমেলায় আসেন। কর্মিসভা থেকে সরাসরি মদনমোহন মন্দিরে যান। মুখ্যমন্ত্রী জানান, ‘‌আমি কোচবিহারে এলে মন্দিরে আসি। কিন্তু এবার এসে বেশি ভাল লেগেছে পুজোর জন্য। রাজপুরোহিত শাণ্ডিল্য গোত্রে আমাকে দিয়ে পুজো দেওয়ান। তখন আমি আরও একটি গোত্র যোগ করার কথা বলি। সেটি হল মা মাটি মানুষ গোত্র। যাতে সব মানুষের ভাল করা যায়।’‌ 
এরপরেই মুখ্যমন্ত্রী রাসচক্র ঘোরান। তারপর মেলা দেখতে দেখতে মেলা মঞ্চে ওঠেন। সেখানে ১০৪ ছিটমহলবাসীকে ফ্ল্যাটের চাবি তুলে দেন। পাশাপাশি ভিন রাজ্য থেকে কাজ ছেড়ে আসা দু’‌জনকে ৫০ হাজার টাকা করে সাহায্য করেন। এরপর বাকি জেলাতেও এই অর্থসাহায্য করা হবে বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী। এদিন তিনি জানান, মঙ্গলবার গঙ্গারামপুরে প্রশাসনিক বৈঠক করে পরে মালদা যাবেন। বুধবার মুর্শিদাবাদে বৈঠক করে কলকাতায় ফিরবেন। এদিন কোচবিহার দেবোত্তর ট্রাস্টের তরফে সভাপতি তথা জেলাশাসক পবন কাডিয়ান রাসচক্রের স্মারক মুখ্যমন্ত্রীর হাতে তুলে দেন। যদিও মুখ্যমন্ত্রী সেই স্মারক কোচবিহারেই রাখার জন্য দিয়ে যান। তিনি জানান, আমার সবটাই ঘর।‌‌
এদিনের কর্মিসভায় দলের রাজ্য সভাপতি সুব্রত বক্সি, কোচবিহার জেলা তৃণমূল সভাপতি বিনয়কৃষ্ণ বর্মন, বিধায়ক উদয়ন গুহ, মিহির গোস্বামী, হিতেন বর্মন, ফজলে করিম মিয়া, অর্ঘ্য রায় প্রধান, পুরপ্রধান ভূষণ সিংহ, পার্থপ্রতিম রায় প্রমুখ ছিলেন।

 

কোচবিহারের মদনমোহন মন্দিরে মুখ্যমন্ত্রী। সোমবার। ছবি: আজকাল 

জনপ্রিয়

Back To Top