অমিতাভ সিরাজ, সঞ্জয় বিশ্বাস,দার্জিলিং: পাইন গাছের আড়ালে ঘন কুয়াশা। সকাল থেকেই। কনকনে ঠান্ডাও। সঙ্গে হিমেল বাতাস!‌
দার্জিলিঙের ম্যাল থেকে কয়েক বিঘত দূরে বসেছিল ওরা। এত ভিড়, জায়গা পায়নি। মঞ্চের কাছেই নেপালি কবি আচার্য ভানুভক্তের মূর্তি। একটু আগেই কবিকে মালা দিয়ে সম্মান জানিয়ে মঞ্চে উঠে গেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। হিম ঠান্ডায় ওম্‌ নিচ্ছিল গরম চায়ে ওই যুবকেরা। বক্তৃতায় মমতা তখন বলছেন নেপালিতেই, ‘‌পাহাড়কো উন্নতি চাইনছঁ। বিকাশ, শান্তি চাইনছঁ.‌.‌.‌’‌ শুনেই উচ্ছ্বসিত, করতালি ওদের।
কোথায় বাড়ি?‌
‘‌সিংমারি, কারও বা পাতলেবাস।’‌ চটপট জবাব ওদের। সবাই নেপালি। মনে পড়ল, সিংমারিতে পার্টি অফিস ছিল বিমল গুরুংয়ের। আর পাতলেবাসে ডেরা। সেখান থেকেই এসেছে যুবকেরা। মাইকে ভেসে আসছে, মমতা বলছেন, ‘‌পাহাড় উন্নতি চাইছে, শান্তি চাইছে। কিন্তু বাইরে থেকে দার্জিলিংকে অশান্ত করতে চাইছে কেউ কেউ। ওরা চায়, সিকিম ভাল থাকুক। পর্যটক আসুক। ব্যবসার উন্নতি হোক। আর দার্জিলিঙে অশান্তি, বিশৃঙ্খলা বাধিয়ে পর্যটন মার খাক। এখানে গন্ডগোল করে সিকিম ফায়দা তুলতে চাইছে।’‌
স্পষ্ট ইঙ্গিত, অভিযোগ মুখ্যমন্ত্রীর সিকিমের দিকেই। গত ৮ মাস স্তব্ধ হয়েছিল পাহাড়। বিমল গুরুংদের হিংসাত্মক আন্দোলনে দোকানপাট, স্কুল–কলেজ, প্রশাসনিক কাজ— সবই বন্ধ হয়ে যায়। সিকিমের মুখ্যমন্ত্রী পবন চামলিংদের বিরুদ্ধে সরাসরি গুরুংদের মদত দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। সেই পরিস্থিতি পাহাড়ের মানুষের যে কতটা ক্ষতি করছে সে–কথা বোঝাতে গিয়েই ওই প্রসঙ্গ পাড়লেন মুখ্যমন্ত্রী। আর তাঁর কথা শুনে হাততালিতে ফেটে পড়ল জনতাও।
শান্তি চায় পাহাড়ের মানুষও। তার আভাস মিলল এদিন সকালেই। ১০টা নাগাদ রিচমন্ড হিল থেকে বেরিয়ে হেঁটে মমতা চলে যান সিংমারির দিকে। থানাতেও যান তিনি। উল্লেখ্য, আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিল সেবার গুরুংরা এই থানায়। অন্যদিকে, ঘন কুয়াশামাখা সকালে যাঁরা পথে বেরিয়েছিলেন, জনে জনে এসে শুভেচ্ছা জানিয়ে গেলেন মুখ্যমন্ত্রীকে। জনসংযোগে তাঁর এই আন্তরিকতায় দৃশ্যত খুশি দার্জিলিংও। যেতে যেতেই কথা বলেন কয়েকজন ছোট ব্যবসায়ীর সঙ্গেও। মমতা তাঁদের বলেন, ‘‌ভাল থাকুন, শান্তিতে থাকুন।’‌ দুপুরে দার্জিলিঙের ঐতিহ্যবাহী স্থল ম্যালে–‌র অনুষ্ঠানে গিয়ে সেই ‘‌ভাল থাকা’‌র পরামর্শকেই যেন আরও বিশদে ব্যাখ্যা করলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। এদিন তাঁর ভাষণে তাই প্রথম থেকেই দার্জিলিঙে শান্তি ফেরানোর ‌ওপর জোর দেন তিনি। পাহাড়বাসীর উদ্দেশে মমতা বলেন, ‘‌দার্জিলিং বন্ধ থাকলে হোটেল ব্যবসা, লেখাপড়া হবে কী করে?‌ অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে। বন্‌ধ করে কোনও উন্নতি হয় না। আপনারা যে কোনও দাবি করতে পারেন আমার কাছে। আমি মাসে ২–‌৩ বার আসি পাহাড়ে। ভোট চাইতে আসি না। দেখতে আসি আপনারা কেমন আছেন।’‌ জিটিএ–‌র প্রসঙ্গ তুলে মমতা এদিন আরও বলেছেন, ‘‌জিটিএ আমরা চালাই না। রাজ্য সরকার কোনও হস্তক্ষেপ করে না। বরং সাহায্য করে।’‌ মুখ্যমন্ত্রী মনে করিয়ে দেন, পাহাড়ের প্রয়োজনীয় সামগ্রী— পানীয় জলের ব্যবস্থা, পরিবহণ, খাবার সবই আসে সমতল থেকে। দার্জিলিং অবিচ্ছেদ্য অংশ বাংলার। তাই একসঙ্গে থেকেই দার্জিলিঙের উন্নতি করতে হবে। এজন্য চাই শান্তির পরিবেশ। মমতার গুরুতর অভিযোগ, শুধু সিকিম নয়, পাহাড়ে শান্তি ফিরুক তা চাইছে না বিদেশি শক্তিও। বিজেপি–কে আক্রমণ করে মমতা বলেন, ‘টাকা দিয়ে দার্জিলিংকে কেনা যাবে না। ‌এখানে বন্‌ধ হলে বাংলার লোকসান হবে না। কিন্তু আমরা চাই উন্নয়ন হোক। পাহাড়ের মানু্ষ ভাল থাকুক। গুলি নয়, ভাত চায় দার্জিলিং। শিল্পপতিরা আসতে ভয় পান। কখন কী ঘটে যাবে। তাই আপনারা শান্তির পরিবেশ তৈরি করুন। তাতে সবারই ভাল হবে।’‌ মুখ্যমন্ত্রী এদিন জানিয়েছেন, আগামী মার্চ–‌এপ্রিল মাসে শিল্পপতিদের নিয়ে বাণিজ্য সম্মেলন হবে দার্জিলিঙে। সেইসঙ্গে হবে শিল্পতালুক ও বিশ্ববিদ্যালয়ও। তথ্য–প্রযুক্তি শিল্প ‌প্রকল্পও গড়া হবে পাহাড়ে। বিজেপি–‌সহ আন্দোলনকারীদের মদতদাতাদের উদ্দেশে মমতার হুঁশিয়ারি, ‘‌বিভেদ রাজনীতি করে ভোটে জেতা যায়, কিন্তু মানু্ষের মন জয় করা যায় না। দার্জিলিঙের সৌন্দর্য, খ্যাতি সারা বিশ্বে। সিকিমের চেয়েও সবুজ, সুইৎজারল্যান্ডের থেকেও সুন্দর। দার্জিলিংকে হৃদয় দিয়ে ভালবাসি আমরা। তাই ‌উন্নয়ন ও শান্তি এত জরুরি পাহাড়ে।’‌ এর আগে মোর্চার আন্দোলনে কতটা ‌‘‌খারাপ’‌ হয়েছিল ৮ মাস আগের পরিস্থিতি, তা বলতে গিয়ে বিনয় তামাং বলেন, ‘‌গত বছর ৮ জুন ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটেছিল। পাহাড় অশান্ত হয়ে ওঠে। এতদিন পর মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি দার্জিলিং আসায় তাঁকে যেভাবে পাহাড়ের মানু্ষ স্বাগত জানালেন তাতে আমরা খুশি। অভিনন্দন জানাচ্ছি।’
এদিন ‘‌হিমল তারাই ডুয়ার্স ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ২০১৭–‌১৮’‌ অনু্ষ্ঠানে কৃতী খেলোয়াড়দের হাতে পুরস্কারও তুলে দেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলা থেকে জয়ী— তীরন্দাজ, ক্যারাটে, ছেলে ও মেয়েদের ফুটবল খেলায় সেরাদের ট্রফি, ১ লক্ষ টাকার চেক, টু হুইলার ইত্যাদি পুরস্কার দেওয়া হয় দার্জিলিং, কালিম্পং, শিলিগুড়ি, জলপাইগুড়ি ও আলিপুরদুয়ার জেলা পুলিসের পক্ষ থেকে। এছাড়াও খেলাধুলায় কৃতিত্বের জন্য মুখ্যমন্ত্রী ২০ জন সিভিক ভলান্টিয়ারের হাতে নিয়োগপত্রও তুলে দেন। পাহাড়ের আন্দোলনে মৃতদের পরিবারের হাতেও ২ লক্ষ টাকা করে আর্থিক সাহায্য করেন মুখ্যমন্ত্রী রাজ্য সরকারের পক্ষে। উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের দুই মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস, ইন্দ্রনীল সেন, মুখ্য সচিব মলয় দে, রাজ্য পুলিসের ডিজি সুরজিৎ কর পুরকায়স্থ, জিটিএ চেয়ারম্যান বিনয় তামাং–‌সহ অনীত থাপা, অমরসিং রাই, জিএনএলএফ নেতা মন ঘিসিং, পাহাড় উন্নয়ন পর্ষদের সদস্য অজয় এডওয়ার্ড, দার্জিলিং পুরসভার চেয়ারপার্সন প্রতিভা রাই প্রমুখ। এছাড়াও পাহাড়ের তিন বিধায়ক, জিটিএ সদস্যরাও। অনুষ্ঠানের শুরুতেই নেপালি জনজীবনের সঙ্গে জড়িয়ে–‌থাকা লোকসংস্কৃতির নাচ–‌গানও পরিবেশন করে বেশ কয়েকটি দল। এদিকে, এদিন বিকেলে বিনয় তামাং ও অনীত থাপার নেতৃত্বে ১১ মোর্চা প্রতিনিধি রিচমন্ডে সরকারি অতিথিশালায় গিয়ে মমতার সঙ্গে বৈঠক করেন। পাহাড়ের বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়।

জনপ্রিয়

Back To Top