সুনীল চন্দ, রায়গঞ্জ, ৫ মার্চ- কিডনি গ্রাম। একসময় এই গ্রাম গোটা দেশের মানুষকে স্তম্ভিত করে দিয়েছিল। উত্তর দিনাজপুর জেলার ওই গ্রামের নাম বিন্দোল হলেও ‘কিডনি গ্রাম’ নামেই পরিচিত হয়ে উঠেছিল। বিন্দোল, জালিপাড়া, বালিয়া এমন এমন গ্রাম, যেখানে দুটি কিডনি আছে এরকম পুরুষ পাওয়াই দুষ্কর ছিল। টাকার টোপের ফাঁদে পড়ে সব পুরুষই বিক্রি করে দিতেন কিডনি। এই কিডনির কারবার চালাতে তৈরি হয়েছিল বিশাল চক্র। গ্রামের দিনমজুর, খেটে খাওয়া মানুষকে কাজ দেওয়ার কথা বলে ভিন রাজ্যে নিয়ে যাওয়া হত, তারপর মগজ ধোলাই করে এককালীন কিছু টাকার বিনিময়ে কেটে নেওয়া হত কিডনি। ঘটনা প্রকাশ্যে আসতেই তোলপাড় শুরু হয়ে গিয়েছিল গোটা দেশে। পরে প্রশাসন তৎপর হয়ে কিডনি পাচার চক্রকে দমিয়ে রাখার চেষ্টা করে। ব্যবসা বন্ধ করতে পারেনি। সেই গ্রামে মানুষকে সচেতন করে কিডনি কারবার বন্ধ করতে ময়দানে নামেন ১৮ জন মহিলা। যাঁদের কাজ দেখে যুক্ত হন আরও অনেকে। সব মিলিয়ে এখন কাজ করছেন ৭০ জন মহিলা। সকলের অক্লান্ত পরিশ্রমে কিডনির কারবার প্রায় বন্ধ। অবশ্য কিছু কিছু চলে তবে সেটা চোরাগোপ্তা ভাবে। ৭০ জন মহিলার সংগঠন রায়গঞ্জের শ্রীপুর মহিলা ও খাদি উন্নয়ন সমিতির শপথ, চোরাগোপ্তা বিক্রিও বন্ধ করে দেবেন। সংগঠনের সম্পাদিকা জবা ভট্টাচার্য জানান, ‘এই গ্রামের মানুষ জনমজুর। কাজের খোঁজে বাইরে যেতে বাধ্য হন। তাঁদের প্রয়োজন বেঁচে থাকার জন্য আর্থিক সংস্থান। আমরা তাই সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পে গ্রামের মানুষের রোজগারের পথ তৈরি করি। এতেই অনেকটা সাফল্য পেয়েছি। আশা করছি বাকিটাও পারব।’ ইতিমধ্যে কাজ হয়েছে— নারীর অধিকার রক্ষা, শিশুর অধিকার রক্ষা এবং তাঁদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিয়ে গঠনমূলক কাজ করা। এসব করে সাড়া ফেলে দিয়েছে রায়গঞ্জের শ্রীপুর মহিলা ও খাদি উন্নয়ন সমিতি। শুধু বিন্দোল নয়, প্রায় ৩ দশক ধরে রায়গঞ্জ, কালিয়াগঞ্জ, ইটাহার এবং করণদিঘির প্রত্যন্ত গ্রামগুলিতে এই সংস্থা কাজ করে চলেছে। সেই কাজ দেখে ২০১৫ সালে সন্তোষ প্রকাশ করেন রাজ্যের তৎকালীন সমাজকল্যাণ মন্ত্রী ডাঃ শশী পাঁজা রায়গঞ্জের বাংলাদেশ সীমান্ত লাগোয়া বিন্দোলে একটি অনুষ্ঠানে এসে। এই বিন্দোল সীমান্ত এলাকার বাজবিন্দোল, জালিপাড়া, বালিয়াদিঘি, অন্তরা, বিসরাইল, কৈলাডাঙি–সহ ১০টি গ্রামসংসদ জুড়ে বহুমুখী কাজ করছেন তাঁরা। 
উত্তর দিনাজপুর জেলার অন্যতম মুখ্য সমস্যা নারীপাচার। নারীপাচার রুখতেও অগ্রণী ভূমিকা রয়েছে শ্রীপুর মহিলা সমিতির। এখনও পর্যন্ত ৫২ মহিলাকে পাচারের হাত থেকে রক্ষা করতে পেরেছেন তাঁরা। যা মোটেও ছেলেখেলা কথা নয়। পাশাপাশি কাজ করে চলেছেন শিশুর অধিকার রক্ষায়। বাল্যবিবাহ রোধ, স্কুলছুট রুখতে সমিতি বিন্দোলে চালু করেছে শিক্ষা সরবরাহ কেন্দ্র এবং চাইল্ড ক্লাব। রয়েছে জীবিকামুখী শিক্ষার ব্যবস্থাও। জানালেন শ্রীপুর মহিলা সমিতির সম্পাদিকা জবা ভট্টাচার্য এবং তাঁর সহযোগী তমা গোস্বামী। চাইল্ড ক্লাব গড়ে ছোটদের মধ্যেও চেতনা জাগ্রত করার কাজ চলছে। চাইল্ড ক্লাবের কিছুটা দূরে বিন্দোলে রয়েছে সহায়ক শিক্ষাকেন্দ্র। সেখানে চলে ফ্রি কোচিং ক্লাস ছাড়াও সমাজসচেতনতামূলক শিক্ষা। মহিলাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নে কীভাবে সরকারি প্রকল্পগুলির সঙ্গে যুক্ত করা যায় তা নিয়েও সচেতন করা হয় নারীদের। তাই এখানকার নারীরা এখন অনেকটাই অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর। এখানকার বাজবিন্দোল আদিবাসী গ্রামে আগে ঘরে ঘরে তৈরি হত চোলাই মদ। ছিল না শিক্ষার কোনও পরিবেশ। নারীপাচার এবং কিডনিপাচার চক্রের মতো অপরাধমূলক কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিল এখানকার আদিবাসী–সহ অন্য জনজাতির মানুষ। আজ শিশু এবং নারীর অধিকার নিয়ে সচেতনতার বার্তা দিতে বিন্দোলের মহিলারা ঘরের কাজ সামলে প্রতিদিন ছুটছেন এই সব শিক্ষাকেন্দ্রে। পিছিয়ে নেই পার্বতী মার্ডি, কাজলি সরেন, লক্ষ্মী মুর্মুরাও।   

চাইল্ড ক্লাবের শিশুদের নিয়ে শোভাযাত্রা। ছবি:‌ প্রতিবেদক

জনপ্রিয়

Back To Top