অর্ঘ্য দে, শিলিগুড়ি, ‌৫ ফেব্রুয়ারি- কথায় বলে মাছে–ভাতে বাঙালি। অর্থাৎ, মাছের সঙ্গে মিলেমিশে আছে বাঙালিরা। সে দেশের কিংবা বিদেশের যে প্রান্তেই থাকুক না কেন। রুই, কাতলা, চিংড়ি, ইলিশ, কিংবা পমফ্রেট— মাছের যে বাহারই হোক না কেন, বাঙালিদের জিভে জল আসবেই। কিন্তু মাছ উৎপাদনেই বিগত কয়েক বছরে পিছিয়ে পড়েছে আমাদের রাজ্য। যতটা না চাহিদা, তার চেয়ে কম উৎপাদন হচ্ছে মাছ। রাজ্যে বর্তমানে ১৭ লাখ মেট্রিক টন মাছ উৎপাদন হলেও তাতে চাহিদা পূরণ হচ্ছে না। তার ওপরে ২ কেজি বা তার বেশি ওজনের মাছও অমিল। অগত্যা প্রতিবেশী রাজ্য বিহার এবং অন্ধ্রপ্রদেশের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে অনেকটাই। মাছের উৎপাদন বাড়াতে পরীক্ষামূলকভাবে দক্ষিণবঙ্গে কাজ করেছে মৎস্য দপ্তর। পশ্চিম মেদিনীপুরের ময়না ব্লকে সাফল্য পাওয়ার পরই মৎস্য দপ্তর থেকে একে একে মডেল প্রজেক্টের আকারে বেছে নেওয়া হয়েছে। দক্ষিণবঙ্গের অন্যান্য জেলার মতো উত্তরবঙ্গেও যাতে এই পদ্ধতি শুরু করা যায় তার প্রস্তুতিও শুরু হয়ে গেছে। শিলিগুড়ি মৎস্য দপ্তরের অফিস থেকেই জানা গেছে, ‘ময়না মডেল’কে কার্যকর করতে উত্তরবঙ্গের তিন জেলাকে বেছে নেওয়া হয়েছে। কোচবিহার, দক্ষিণ দিনাজপুর ও মালদা। তিন জেলার মৎস্য দপ্তরের আধিকারিকদের সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনাও হয়ে গেছে। সেখানকার মাছচাষিদের সঙ্গেও কথাবার্তা শেষ। চলতি মাস থেকেই এই প্রকল্পের কাজ শুরু করছে মৎস্য দপ্তর। টার্গেট ধরা হয়েছে ২০২০। এর মধ্যে মাছের উৎপাদন দ্বিগুণ করার চ্যালেঞ্জ নিয়ে মাঠে নেমেছেন মৎস্য আধিকারিকেরাও। 
কী হবে এই প্রকল্পে?
‘‌ময়না মডেল’‌ প্রকল্পের জন্য উত্তরের তিন জেলা কোচবিহার, দক্ষিণ দিনাজপুর এবং মালদা থেকে ৫ হেক্টর মাপের পুকুর খোঁজা শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যেই কোচবিহার এবং দক্ষিণ দিনাজপুরে ৩টি করে ৫ হেক্টর মাপের পুকুর খুঁজেও পাওয়া গেছে। মালদায় পাওয়া গেছে ১টি। চাষিদের সহায়তা করবে মৎস্য দপ্তর। তিন বছরের লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হচ্ছে। প্রথম বছর মাছের চারা বণ্টন করবে মৎস্য দপ্তর। মাছের খাবারও তারাই দেবে। প্রথমত রুই, কাতলা এবং মৃগেল মাছের চারা দেওয়া হবে। বর্তমান হিসেব অনুযায়ী প্রতি হেক্টরে ৫ লাখ মেট্রিক টন মাছ উৎপাদন হচ্ছে। কিন্তু এই মডেল প্রজেক্ট নেওয়ার টার্গেটই হল প্রতি হেক্টরে ৮ থেকে ১০ লাখ মেট্রিক টন মাছ উৎপাদন করা। এর জন্য চাষিদের ‘এরিবেটব মেশিন’ও দেওয়া হচ্ছে। এই মেশিন পুকুরের জলে অক্সিজেনের মাত্রা বাড়াবে। উত্তরবঙ্গ মৎস্য দপ্তরের অতিরিক্ত নির্দেশক আর ফোলি লেপচা জানিয়েছেন, প্রত্যেক ইউনিটের জন্য ৪৫ লক্ষ ৫৫ হাজার টাকা বরাদ্দ হয়েছে। তিন বছরের লক্ষ্যমাত্রা। প্রথম বছর সাহায্য করবে মৎস্য দপ্তর। পরের বছর থেকে চাষিদেরকেই উদ্যোগী হতে হবে। চলতি মাসেই মাছের চারা হবে। 
বড় মাছ চাষ
বিয়েবাড়িতে কিংবা বড় বড় হোটেল–‌রেস্তোরাঁয় বড় মাছের চাহিদা বেশি। ২ কেজি কিংবা তারও বেশি। এমন মাছের উৎপাদন কমে গেছে এ রাজ্যে। প্রতিবেশী রাজ্য বিহার সেই অভাব কিছুটা মেটাচ্ছে। দক্ষিণবঙ্গের বড় জলাশয়ে উৎপাদন বাড়ানো গেলেও তা উত্তরবঙ্গে আনতে অনেক সমস্যা। তাই উত্তরবঙ্গকে আরও স্বনির্ভর করার চেষ্টা। উত্তরবঙ্গের মালদা এবং কোচবিহারে ২০০ হেক্টরের পুকুর নির্ধারণ করা হয়েছে। এখানে বড় মাছ চাষ হবে। মাছের চারা থেকে তাদের খাদ্যসামগ্রী সবটাই দেবে মৎস্য দপ্তর। মাছচাষিদের সঙ্গে মৎস্য দপ্তরের চুক্তি, চাষ শুরু হওয়ার দু’বছরের মধ্যে ওই মাছ পুকুর থেকে তোলা যাবে না। দু’‌বছর ধরে মাছ চাষ হবে। সবরকম সহায়তা করবে মৎস্য দপ্তর। উত্তরবঙ্গ মৎস্য দপ্তরের অতিরিক্ত নির্দেশক আর ফোলি লেপচা জানিয়েছেন, প্রত্যেক ইউনিটের জন্য সব মিলিয়ে ৭ লাখ ৩৫ হাজার টাকা করে বরাদ্দ হয়েছে। কিন্তু মাছের উৎপাদন এ রাজ্যে কমে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, মূলত ভুল পদ্ধতিতে মাছ চাষ করা হচ্ছে। সে–কারণেই এখানে উৎপাদন কমছে। চাষ পদ্ধতি নিয়ে জেলায় জেলায় মাছচাষিদের প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়েছে।

পুকুর থেকে এই সাইজের মাছ আর ধরা যাবে না। ছবি:‌ আজকাল

জনপ্রিয়

Back To Top