অভিজিৎ চৌধুরি, মালদা, ১৭ ফেব্রুয়ারি- দ্বিতীয় ফরাক্কা সেতু তৈরিতে নকশায় কোনও গোলমাল ছিল কি?‌ দুর্ঘটনায় মৃত ইঞ্জিনিয়ার শচীনপ্রতাপের বাবা উদয়বীর সিংয়ের মন্তব্য উসকে দিয়েছে জল্পনা। উদয়বীর নিজেও দ্বিতীয় ফরাক্কা সেতু নির্মাণকাজের দায়িত্বে ছিলেন। সুতরাং তঁার মন্তব্য এক্ষেত্রে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এদিকে, তৃণমূল, বাম এবং কংগ্রেসও এই ঘটনায় প্রযুক্তিগত ত্রুটিকেই দায়ী করেছেন। যদিও দুর্ঘটনা নিয়ে রাজনীতি না করার আর্জি জানিয়েছে বিজেপি।
এদিন উদয়বীরবাবু কঁাদতে কঁাদতে বলেন, ‘‌যে লোহার গার্ডারটি পড়ে গিয়ে এতবড় দুর্ঘটনাটি ঘটে গেল, তার নকশা নিয়ে সন্দেহ ছিল। কর্তৃপক্ষের নজরেও বিষয়টি আনা হয়েছিল। যে কারণে তিন মাস কাজ বন্ধ ছিল। যে ডিজাইনার এই সেতুর নকশা তৈরি করেছিলেন, তিনি বলেছিলেন, নকশায় যদি সন্দেহ থাকে, তাহলে তোমরা ঠিক করে নাও। কিন্তু অনুমোদিত নকশা কোনও লিখিত নির্দেশ ছাড়াই আমরা কী করে পরিবর্তন করব?‌ তাই আমরা ডিজাইনারকে বলেছিলাম লিখিত দিতে। কিন্তু কোনও চিঠি আসেনি। ফলে কিছুদিন কাজ বন্ধ থাকার পর আবার শুরু হয়। ২০ বছর এই সংস্থায় কাজ করছি। কিছু তো অভিজ্ঞতা হয়েছে। সেই কারণেই কথাটা বলেছিলাম। কিন্তু যা ক্ষতি হওয়ার, তা হয়ে গেল।’‌ রবিবার মালদার বৈষ্ণবনগরে ফরাক্কা সেতুর গার্ডার ভেঙে দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছেন ইঞ্জিনিয়ার শচীনপ্রতাপ (৩০) ও প্রজেক্ট ইনচার্জ কে এস শ্রীনিবাসন রাও (৪৮)। শ্রীনিবাসনের বাড়ি অন্ধ্রপ্রদেশের রাজমনডুরি এলাকায়। দুর্ঘটনার সময় পাশেই ছিলেন উদয়বীর সিং।
উল্লেখ্য, রবিবার রাত ৮টা নাগাদ ফরাক্কায় গঙ্গার ওপর নির্মীয়মাণ দ্বিতীয় সেতুর গার্ডার ভেঙে দুর্ঘটনাটি ঘটে। এই ঘটনায় জখম হন ৩ শ্রমিক। আহত মুকেশ পান্ড (২৭)–এর মালদা মেডিক্যালে চিকিৎসা চলছে। তঁার বাড়ি উত্তরপ্রদেশের বারাণসীতে। বাকি আহত দু’‌জনকে রেফার করা হয়েছে কলকাতায়। তঁাদের নাম রঞ্জনকুমার মেহতা (২৬), বাড়ি উত্তরপ্রদেশে এবং অপরজনের নাম সুবেদার প্রজাপতি (৪০), বাড়ি উত্তরপ্রদেশের গাজিপুরে। আহত ৩ জনই টেকনিশিয়ান পদে কর্মরত। দুর্ঘটনার পর সোমবার থেকে দ্বিতীয় ফরাক্কা সেতু নির্মাণের কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
দুর্ঘটনার খবর পেয়ে এলাকায় পৌঁছয় প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা দপ্তরের কর্মীরা। এরপর ঘটনাস্থলে যান ফরাক্কা ব্যারেজ কর্তৃপক্ষ, ন্যাশনাল হাইওয়ে অথরিটি অফ ইন্ডিয়া (এনএইচআইএ) এবং মালদা ও মুর্শিদাবাদ জেলা প্রশাসনের কর্তারা। দ্বিতীয় ফরাক্কা সেতুটি নির্মাণের দায়িত্বে রয়েছে আরকেইসি নামে একটি দক্ষিণ ভারতের নির্মাণ সংস্থা। সদ্য ওই সংস্থাটি গুজরাটের নিউক্লিয়ার প্লান্ট তৈরির কাজ শেষ করে দ্বিতীয় ফরাক্কা সেতুর কাজ ধরেছিল। যে গার্ডারের একটি অংশ ভেঙে পড়ে, সেটি ছিল ৬০ মিটার লম্বা এবং ৮৯৬ টন ওজনের। গোটা সেতুটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৩ কিলোমিটার। সেতু তৈরি করতে ৮৮টি পিলারের মধ্যে অধিকাংশই তৈরি হয়ে গেছে। কলকাতা থেকে মালদার দিকে আসার সীমানার ১ নম্বর ও ২ ‌নম্বর পিলারের মধ্যে প্রথম গার্ডার বসানো হচ্ছিল। 
মালদা জেলা তৃণমূল নেতা তথা প্রাক্তন মন্ত্রী কৃষ্ণেন্দু চৌধুরি বলেন, ‘‌ন্যাশনাল হাইওয়ে অথরিটি অফ ইন্ডিয়া একটি সংস্থার মাধ্যমে এই কাজ করাচ্ছিল। কেন রাতের অন্ধকারে কাজ করা হচ্ছিল, তার কৈফিয়ত চাইছে সাধারণ মানুষ।’‌ কংগ্রেসের মালদা জেলার সাধারণ সম্পাদক কালীসাধন রায় বলেন, ‘‌কারিগরি ত্রুটির কারণেই দ্বিতীয় ফরাক্কা সেতুর একটি অংশ ভেঙে পড়েছে। লোকসভার কংগ্রেসের দলনেতা অধীর চৌধুরি পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।’‌ প্রযুক্তিগত ত্রুটির দিকে ইঙ্গিত করেছে সিপিএম–ও। সিপিএমের মালদা জেলা সম্পাদক অম্বর মিত্র বলেন, ‘‌ফরাক্কায় প্রথম সেতু ‌‌গড়ার সময় প্রযুক্তি এত উন্নত ছিল না। কিন্তু এ রকম দুর্ঘটনা ঘটেনি। এবার কর্তৃপক্ষের গাফিলতিতেই এই দুর্ঘটনাটি ঘটেছে।’‌ বিজেপি–র মালদা জেলা সহ–সভাপতি অজয় গাঙ্গুলি বলেন, ‘বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। দীর্ঘ সাড়ে ৪ দশক পর নতুন আরও একটি সেতু তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। কাজেই এ নিয়ে রাজনীতি করা ঠিক নয়।’‌
যদিও এই ঘটনা প্রসঙ্গে জাতীয় সড়ক কর্তৃপক্ষের মালদার প্রজেক্ট ডিরেক্টর দীনেশকুমার হানসারিয়া বলেছেন, ‘‌তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।’‌ পুলিশ সুপার আলোক রাজোরিয়া বলেছেন, ‘‌সেতু নির্মাণকারী সংস্থার কর্মী, অফিসারদের সঙ্গে কথা বলেই ঘটনার তদন্ত শুরু হয়েছে।’‌‌‌

 

 

বৈষ্ণবনগরের দ্বিতীয় ফরাক্কা সেতুর গার্ডার ভেঙে পড়ার পর। ছবি: প্রতিবেদক

জনপ্রিয়

Back To Top