অম্লানজ্যোতি ঘোষ, জয়গাঁ: প্রায় মোর্চাশূন্য হওয়ার পথে ডুয়ার্সে। ভারত–ভুটান সীমান্তের জয়গাঁ শহর দেখল এক ঐতিহাসিক জনসভা। কেন্দ্রীয় কমিটির ৮ জন সদস্য–সহ গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার প্রায় ৬৫ জন নেতা একসঙ্গে তৃণমূলের মঞ্চে উঠে এলেন। নতুন দলের নতুন পতাকা তুলে নিলেন মন্ত্রী তথা আলিপুরদুয়ার–জলপাইগুড়ি–কোচবিহারের পর্যবেক্ষক অরূপ বিশ্বাসের কাছ থেকে। জেলা সভাপতি মোহন শর্মা, যিনি কিনা প্রায় ১ বছর আজকের দিনটির জন্য অপেক্ষা করছিলেন, সভামঞ্চে দাঁড়িয়ে এদিনের দলবদলের জনসভাকে একটা মিলন উৎসব বলে চিহ্নিত করেন। সংখ্যার বিচারে এদিন মোর্চা ভেঙে যদি ৬৫ জন নেতা–কর্মী এসে থাকেন, তবে খুব কম করে হলেও ডুয়ার্সের অন্তত ১৫ হাজার মোর্চা কর্মী–সমর্থক এদিন সরাসরি তৃণমূল কংগ্রেসের শিবিরে আশ্রয় নিলেন। পঞ্চায়েত নির্বাচনের আগে গোটা ডুয়ার্সের রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে গেল। কালচিনি ব্লকে উল্লেখ করার মতো মোর্চার যতগুলি নাম ছিল, তেমন প্রায় ৪৫ জন প্রথম সারির নেতা এদিন জয়গাঁতে তৃণমূল কংগ্রেসের পতাকা তুলে নেন। কার্যত কালচিনি ব্লক বিরোধীশূন্য হয়ে ওঠার মুখে। 
কারা কারা যোগ দিলেন?‌ 
মোর্চার কেন্দ্রীয় কমিটির সহ–সভাপতি অশোক লামা, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য অর্পণ চামলিং, সন্দীপ ছেত্রি, রাজু থাপা— এদিনের দুপুরের পর থেকে নামের তালিকা শুধু দীর্ঘ হয়েছে। নজিরবিহীন এমন দলবদলের ঘটনার সাক্ষী ছিলেন জয়গাঁ শহরের অন্তত ৪০ হাজার মানুষ। প্রায় ২ কিমি লম্বা নেতাজি সুভাষ রোডে ছিল কাতারে কাতারে মানুষের ভিড়। গোটা জয়গাঁ শহর বিশেষ করে ১ নম্বর ভুটান গেটের দিকে যাওয়ার রাস্তা দুপুর ২টো থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয় পুলিস। 
কেন তাৎপর্যপূর্ণ?‌
দার্জিলিং পাহাড় বাদ দিলে মোর্চার সবচেয়ে বড় ঘাঁটি এদিন পর্যন্ত ছিল আলিপুরদুয়ার। যেহেতু মোর্চা বেড়েছে, খুব স্বাভাবিকভাবেই পেছন পেছন ডুয়ার্সে বিশেষ করে আলিপুরদুয়ারে শক্তি বৃদ্ধি করেছিলি বিজেপি–ও। লোকসভা নির্বাচনেও তৃণমূলের সঙ্গে সমান পাল্লা দিয়ে লড়েছিল বিজেপি। বিধানসভা ভোটে মাদারিহাট থেকে বিজেপি জিতেও যায়। মূলত মোর্চার বলেই বলীয়ান ছিল বিজেপি। এদিন ডুয়ার্সের চা–বলয়ের অন্তত ৭০টি চা–বাগান থেকে একইসঙ্গে মোর্চা–বিজেপি দুই মুছে যাওয়ার পথে। এছাড়াও পাহাড় বাদ দিলে ২০০৮ সাল থেকে বরাবরই বাংলা ভাগের দাবিটি উঠেছিল চা–বলয় থেকেই। আলিপুরদুয়ার এটাই চেয়েছিল বাংলা ভাগের দাবিটি অন্তত জেলা থেকে যেন উঠে না আসে। মোহন শর্মা ও সৌরভ চক্রবর্তীদের নেতৃত্বে এদিন সেই রাস্তাটিও পরিষ্কার হল।
কী বলছেন মোর্চা নেতারা
অশোক, অর্পণ, সন্দীপ, রাজুদের কথায়, আমরা ডুয়ার্সে অভিভাবকশূন্য হয়ে পড়েছিলাম। ২০০৮ সাল থেকে আমরা দেখেছি পাহাড়ে অশান্তি, পরে কেবল সেখানেই উন্নয়ন হচ্ছে। পাহাড়ের নেতৃত্ব ডুয়ার্সের দিকে তাকায়নি। সম্প্রতি ডুয়ার্সেও যে অশান্তি হয়েছিল তারপরও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। আমাদের অনেক নেতা টানা ২–৩ মাস জেলবন্দী ছিল। তখন আমরা কতটা অভিভাবকশূন্য তা আরও একবার টের পেয়েছিলাম। উন্নয়নের জন্য আমাদের আর দার্জিলিঙের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে না। আমরা সরাসরি কলকাতাতেই যাব। ১৩টি দাবি আমরা রেখেছি। মমতা ব্যানার্জি যেভাবে রাজ্যের উন্নয়ন করছেন, তাতে আমাদের দাবি পূরণ হবেই। নদীর স্রোতের উল্টো দিকে থেকে নয়, মূল রাজনীতির রাস্তাতেই থেকেই আমরা সমগ্র ডুয়ার্সের উন্নয়ন করব। তাই ডুয়ার্স ডেভেলপমেন্ট বোর্ডের আবেদন রেখেছি। এদিকে অরূপ বিশ্বাস জানান, ডুয়ার্স উন্নয়ন বোর্ডের বিষয়টি আমি কলকাতাতে পৌঁছে মুখ্যমন্ত্রীকে জানাব। নতুন মোর্চার নেতারা যাঁরা দলে এলেন, তাঁদের উদ্দেশে তিনি জানান, মুখ্যমন্ত্রী মায়ের মতো। ছেলেরা মায়ের কাছে অনেক আবদার রাখেন। তোমরাও রাখ। তবে জনজাতির বৈচিত্র‌্যপূর্ণ ডুয়ার্সে সব জনজাতি মিলেমিশে উন্নয়নের ধারায় থাকুক। দার্জিলিঙের পর শ্রেষ্ঠ সুন্দর হয়ে উঠবে। 

 

অরূপ বিশ্বসের হাত থেকে পতাকা তুলে নিচ্ছেন মোর্চা থেকে আসা নেতারা। ছবি:‌ বিজয় দাস

জনপ্রিয়

Back To Top