অম্লানজ্যোতি ঘোষ,আলিপুরদুয়ার: একটু দূর থেকে দেখলে ভয় পেতেই পারেন। মনে হতেই পারে, বাঘ নয়তো!‌ একটি বা দুটি নয়, একসঙ্গে দলবেঁধে দশ–‌বারোটি। না, বাঘ বা চিতাবাঘ নয়। গভীর জঙ্গলে মাঝে মাঝেই দেখা যাচ্ছে বুনো কুকুর। বছর পাঁচেক আগেও ছিল বড়জোর ১০–১৫টি। এখন নাকি সংখ্যাটা বেড়ে অন্তত ৭০–৮০তে পৌঁছে গেছে। বক্সা ব্যাঘ্রপ্রকল্প, জলদাপাড়া, চিলাপাতা অভয়ারণ্য। সব জঙ্গলেই তাদের দেখা যাচ্ছে। এবার বক্সার জঙ্গলে পর্যটকদের ক্যামেরাতেও ধরা পড়ল একসঙ্গে ১৫–২০টি বুনো কুকুর। গভীর জঙ্গলের জলাশয়ের ধারে এমন বিরল দৃশ্যের সাক্ষী থাকলেন কলকাতা থেকে জয়ন্তীতে বেড়াতে আসা টুবাই মান্না। চিতাবাঘ, হাতি, গন্ডার, বাইসন, হরিণ, সম্বর নয়। বরং, তাদের থেকেও অনেক বেশি এক্সক্লুসিভ। জংলি কুকুর। স্থানীয় ভাষায় ‘ঢোল’। গত তিন–‌চার বছরে বক্সায় সাফারিতে গিয়ে খুব কাছ থেকে বন্য কুকুরের দেখা পেয়েছেন কেউ কেউ। কিন্তু সেভাবে ক্যামেরাবন্দী করা যায়নি। বক্সার ফিল্ড ডিরেক্টর এন এস মুরুলি বেশ গুরুত্ব দিচ্ছেন বুনো কুকুরের এই সংখ্যা বেড়ে যাওয়াকে। তাঁর কথায়, বক্সাতে বিভিন্ন মাংসাশী প্রাণীর গণনা হয়েছে। তবে এখনও বন্য কুকুরের কোনও গণনা হয়নি। তাদেরকে নিয়ে বড় কোনও গবেষণাও হয়নি। এবার সেই উদ্যোগ নেওয়া হবে। বক্সাতে গত ৫ বছরে বন্য কুকুরের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে, এটা প্রমাণ করে বক্সার জৈববৈচিত্র‌্য যথেষ্ট ভাল রয়েছে। 
বক্সার বুনো কুকুর
আফ্রিকার বুনো কুকুরের সঙ্গে অনেকটাই মিল রয়েছে বক্সার এই কুকুরের। তবে, বক্সার বুনো কুকুর চেহারাতে অনেক সুন্দর। লোমশ শরীর। মুখের সঙ্গে মানানসই কান। লালচে সোনালির সঙ্গে সাদা চামড়ার মিশেল। আকৃতিতে কিছুটা বড়। গভীর জঙ্গলে মাটির সুড়ঙ্গে থাকতে পছন্দ করে তারা। মেয়ে কুকুর একসঙ্গে ৪–৫টি শাবকের জন্ম দেয়। বক্সার পরিবেশে প্রায় ১৪–১৭ বছর পর্যন্ত বাঁচতে পারে তারা। শাবক বড় না হওয়া পর্যন্ত পুরুষ কুকুরগুলি খাবার সংগ্রহ করে আনে। দলবেঁধেই শিকার ধরতে বেরোয়। হরিণ, সম্বর, শুয়োর এমন–কি আস্ত বাইসন পর্যন্ত রয়েছে তাদের শিকারের তালিকায়। মানুষের ওপর সচরাচর হামলা করে না। অন্তত ডুয়ার্সে এমন ঘটনা ঘটেনি। পর্যটকদের দেখলে কিন্তু নিমেষে গভীর জঙ্গলের ভেতর উধাও হয়ে যায়। পর্যটক টুবাই মান্নার কথায়, পর পর ৮ বছর বক্সাতে গেছি। হাতি–বাইসন প্রচুর দেখেছি। তবে ‘ঢোল’ দেখতে পাব তা কল্পনাতেও ছিল না। ট্যুর অপারেটিংয়ের সঙ্গে যুক্ত আলিপুরদুয়ারের স্থানীয় শিবুন ভৌমিক জানান, গত ২ মাসে প্রচুর মানুষ বেড়াতে এসে বন্য কুকুর দেখেছেন। কেউ ক্যামেরাবন্দী করেছেন। কেউ পারেননি। কুকুরের সংখ্যা বাড়ছে এটা ভাল লক্ষণ। অন্যদিকে অশনি সংকেতও দেখছেন কেউ কেউ।  ২০১৮ সালের মধ্যে বক্সাতে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার আনা হতে পারে। প্রকৃতিপ্রেমিকদের আশঙ্কা, যদি বন্য কুকুরের সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পায়, তা হলে কিছুটা সমস্যা হতে পারে। কারণ, যেখানে বুনো কুকুরের দল বাসা বাঁধে, সেই জায়গা সাধারণত এড়িয়ে যায় রয়্যাল বেঙ্গল। সেক্ষেত্রে বাঘ আনা হলেও সন্তানদের নিরাপত্তার কথা ভেবে তারা ভুটান বা অন্য কোথাও পালিয়ে যেতে পারে। 

 

জয়ন্তীর জঙ্গলে এভাবেই দাপিয়ে বেড়াচ্ছে বুনো কুকুরের দল।ধরা পড়ল পর্যটকের ক্যামেরায়।

জনপ্রিয়

Back To Top