অম্লানজ্যোতি ঘোষ, আলিপুরদুয়ার: ডুয়ার্সের পর্যটন মানে ইকো ট্যুরিজম। আর ইকো ট্যুরিজম মানে সবার আগে যে বিষয়টি সামনে আসে তা হল ‘হোম স্টে’। আর এই ‘হোম স্টে’র ভাবনাটিকে কার্যত ভিন্ন মাত্রা দিয়ে ফেলল আলিপুরদুয়ার জেলা প্রশাসন। হোম স্টে নিয়ে নতুন কনসেপ্ট। নাম ‘ব্লু হোম স্টে’। উল্লেখ্য, গত বছরই প্রথম দফায় ১২টি ‘ব্লু হোম স্টে’ তৈরি হয়েছিল। বেছে নেওয়া হয়েছিল মূলত অচেনা কেন্দ্রগুলিকে। দারুণ সাড়া পাওয়া গেছে। আগামী ৮ মাসে আরও ৫১টি নতুন হোম স্টে তৈরি হচ্ছে আলিপুরদুয়ার জেলার বিভিন্ন প্রান্তে। মোট খরচ হচ্ছে প্রায় ৮০ লক্ষ টাকা। এনবিডিডি, বিএডিপি, সংখ্যালঘু উন্নয়ন দপ্তর থেকে আর্থিক সহযোগিতা পাওয়া গেছে। জেলা প্রকল্প আধিকারিক অভিরূপ বসু জানান, ৫১টি ‘ব্লু হোম স্টে’র জন্য আসবাব, শৌচাগার, রান্নাঘরের কাজ, রঙের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। ১ ডিসেম্বর থেকে চালু হয়ে যাওয়ার কথা সব ক’‌টি। শীতের মরশুমে ডুয়ার্সে যে পর্যটকেরা বেড়াতে আসেন, তাঁরা এবার জেলায় এলে একসঙ্গে ৬৩টি ‘হোম স্টে’ পাবেন।
কেন তাৎপর্যপুর্ণ?‌
উল্লেখ্য, বেসরকারি হোম স্টে নিয়ে ইতিমধ্যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে ডুয়ার্সে। কোনটা প্রকৃত ‘হোম স্টে’ কোনটা নয়, পর্যটকেরা ঠিকঠাক বুঝতে পারেন না। তবে এক্কেবারে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় নীল–সাদা রঙের ৬৩টি ‘‌হোম স্টে’‌ কিন্তু কার্যত বিতর্কের ঊর্ধ্বে। সেই সব এলাকার আদিবাসী পরিবারকেই কাজে লাগানো হয়েছে। তাঁদের নিজস্ব বাড়িগুলিকে ‘‌ব্লু হোম স্টে’‌‌র রূপ দেওয়া হয়েছে। ৬৩টি ‘‌ব্লু হোম স্টে’‌র প্রায় সব ক’‌টিতে থাকছে ২টি করে শোয়ার ঘর। অর্থাৎ, প্রতিদিন অন্তত ৩০০ জন পর্যটকের বাড়তি ব্যবস্থা। সমতলে থাকা যে–‌কোনও ‘‌ব্লু হোম স্টে’র ভাড়া একই। থাকা–‌খাওয়া নিয়ে একটি পর্যটক পরিবারের খরচ হবে ১৫০০–১৬০০ টাকা।
কোথায় হচ্ছে ‘‌ব্লু হোম স্টে’‌?‌
সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় বক্সা পাহাড়ের মাথায় চুনাভাটি, লেপচাখা গ্রামেও হচ্ছে ‘‌হোম স্টে’‌। বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্পের ভুটানঘাট লাগোয়া পানবাড়ি এলাকা, যা অনেক পর্যটকের কাছেই অজানা, সেখানেও হচ্ছে ৩টি ‘‌হোম স্টে’‌। উল্লেখ্য, এদিন পর্যন্ত পানবাড়িতে পর্যটকদের থাকার কোনও ব্যবস্থাই ছিল না। শুধু তাই নয়, টোটোপাড়া গেলে অনেক পর্যটক এশিয়ার ক্ষুদ্রতম জনজাতি টোটোদের (‌সংখ্যায় মাত্র ১৬০০ জন)‌ গ্রামে না থেকে ফিরে আসতেন। তবে ডিসেম্বর মাস থেকে টোটোপাড়াতেও থাকছে ৪টি পৃথক ‘‌ব্লু হোম স্টে’‌। যাঁদের ‘‌হোম স্টে’‌, তাঁরা প্রত্যেকেই কিন্তু এশিয়ার আদিমতম টোটো। স্থানীয় সেই টোটোদের বাড়িতে থেকে তাঁদের রান্নাঘর পর্যন্ত এবার চাইলেই পৌঁছে যেতে পারবেন অতিথি পর্যটকেরা। এ ছাড়াও জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যান, বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্প, চিলাপাতা অভয়ারণ্য লাগোয়া কোদালবস্তি, চিলাপাতা, মেন্দাবাড়ি, বড় শালকুমার, ছোট শালকুমার, রায়মাটাং, পুখুরি, তুরতুরি, কুমারগ্রামের এমকেএস–‌এর ছোট্ট চা–‌বলয়— প্রতিটি জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্রে থাকছে ‘‌ব্লু হোম স্টে’‌।
‘‌ব্লু হোম স্টে’‌র মজা
এককথায় নিরাপদ। নিশ্চিন্তে ঘুরে বেড়াতে পারবেন পর্যটকেরা। দুর্গম প্রত্যন্ত এলাকায় স্থানীয় খাবারের স্বাদ,  সরাসরি আদিবাসী সংস্কৃতি, তাঁদের লোকাচার, দৈনিক জীবন সম্পর্কে জেনে–‌বুঝে নিতে পারবেন সকলে। ‘‌ব্লু হোম স্টে’‌ থেকেই বেড়িয়ে আসা যাবে ডুয়ার্সের যে–‌কোনও গভীর অরণ্যে। পাহাড়, নদী, জঙ্গল, চা–‌বাগান। জানা গেছে, জেলা প্রশাসনের তরফে ১ ডিসেম্বর থেকেই নতুন ৫১টি ‘‌হোম স্টে’র কর্ণধারদের প্রশিক্ষণ শুরু হচ্ছে। মূলত হসপিটালিটি, রান্না, ঘর সাজানোর বিষয়গুলিতে জোর দেওয়া হচ্ছে। রাজ্যের যে–‌কোনও স্থান থেকে অনলাইনে ‘‌ব্লু হোম স্টে’‌ বা আলিপুরদুয়ার ট্যুরিজম কম্পিউটারে টাইপ করে সহজে ৬৩টি ‘‌হোম স্টে’‌র যে–‌কোনওটি বুকিং করা সম্ভব। প্রশাসনিক সূত্রে খবর, জেলার ‘‌ব্লু হোম স্টে’‌র ভাবনা সফল হওয়ায় উত্তরবঙ্গেরর অন্যান্য জেলাও ইতিমধ্যে বিষয়টি নিয়ে খোঁজখবর শুরু করেছে।

 

ছবি: প্রতিবেদক

জনপ্রিয়

Back To Top