অভিজিৎ চৌধুরি, সৈয়দপুর (মালদা), ৪ জানুয়ারি- আফরাজুল–কাণ্ড কেড়ে নিয়েছে রুজিরুটি৷ এক হাজারের ওপর মানুষ রাজস্থান থেকে ফিরে এসেছেন নিজের ভিটে সৈয়দপুর গ্রামে৷ অনেকের টাকা পড়ে আছে সেখানে৷ অনেকে অর্ধেক কাজ ফেলে চলে এসেছেন৷ বৃহস্পতিবার ওই গ্রামে পা রাখতেই দেখা গেল, প্রত্যেকের চোখে–মুখে চিন্তার ছাপ৷ প্রশ্ন একটাই, কবে স্বাভাবিক হবে সব কিছু৷ বাড়িতে বসে তো আর পেট ভরবে না৷ সংসার আছে৷ একমাস হতে চলল৷ কী হবে বুঝতে পারছি না৷ বলছিলেন ৫২ বছর বয়সি জব্বার শেখ৷ ঘটনার তিনদিনের মধ্যেই গ্রামের বাড়িতে ফিরে এসেছেন তিনি৷ সেখানে তাঁর মালিকের কাছে ৭০ হাজার টাকা পাওনা রয়েছে৷ ‘‌টাকা চাইতে গিয়েছিলাম৷ বলল, জাদা বোলনা মাত৷ নেহিতো রুপিয়া নেহি দেগা৷ ধারদেনা করেই বাড়িতে ফিরে এসেছি৷ রাজস্থানে কয়েকটি জায়গায় ফোনও করেছিলাম৷ সেখানকার মানুষ বলছে চলে আসতে৷ কিন্তু ভরসা পাচ্ছি না৷ সৈয়দপুর গ্রামের রবিউল শেখের কথায়, ২০ বছর ধরে আমি রাজস্থানের কাঁকরোলিতেই কাজ করতাম৷ পারিশ্রমিক যা পেতাম, সেই টাকায় সংসার চলত৷ বাড়িতে ৩ মেয়ে, ২ ছেলে৷ এখানে কোনও কাজ নেই৷ এক মাস ধরে বসে আছি৷ কী করে পেট চলবে৷ আফরাজুল মরে গিয়ে আমাদের রুজিরুটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার জোগাড়৷ ঘটনার সময় আফরাজুলের দাদা তাফাজুল হোসেন বেঙ্গালুরুতে ছিলেন৷ তিনিও চলে এসেছেন৷ বিকম পাস তাফাজুল হোসেনের ৩ মেয়ে৷ সকলেই কলেজে পড়াশোনা করছে৷ গ্রামে কাজ না পেয়ে ২৫ বছর আগে তাকে চলে যেতে হয়েছিল ভিন রাজ্যে৷ বললেন, আগে টিউশনি করতাম বাড়িতে৷ কিন্তু সেই টাকাও ঠিকমতো পেতাম না৷ বাধ্য হয়ে ঘর ছেড়ে যেতে হয়েছে৷ এরকম গ্রামের শয়ে শয়ে মানুষের এখন একটাই দুশ্চিন্তা, কবে তাঁরা নিজেদের রুজি–রোজগার করতে ফিরে যাবেন৷ এদিকে, আফরাজুলের মৃত্যুর পর এখনও শোক কাটিয়ে উঠতে পারেননি তাঁর পরিবারের লোকেরা৷ মাঝেমধ্যেই বাবার ছবি ভেসে আসছে৷ বলছিলেন তাঁর ছোট মেয়ে হাবিবা খাতুন৷ ডুকরে ডুকরে এখনও কেঁদে চলেছেন তাঁর স্ত্রী গুলবাহার বিবি৷ তবে একটাই ভরসা, সরকার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে৷ বলছিলেন গুলবাহার, রাজস্থান সরকারের দেওয়া ৫ লক্ষ এবং রাজ্য সরকারের দেওয়া ৪ লক্ষ টাকা হাতে পেয়ে গেছেন তাঁরা৷ গ্রামেই রয়েছে এলাহাবাদ ব্যাঙ্ক৷ সেই ব্যাঙ্কের অ্যাকাউন্টে জমা পড়েছে সেই টাকা৷ এছাড়াও আরও অনেক সংস্থা আর্থিক সাহায্য দিয়েছে৷ সেই টাকাও আছে৷ সৈয়দপুর গ্রামে ২ কাঠার ওপর বাড়ি আফরাজুলের৷ আফরাজুলরা ৩ ভাই৷ ওই ২ কাঠা জমির ওপরই ৩ ভাই ভাগাভাগি করে বসবাস করছেন৷ বললেন, সরকার থেকে পেনশনের কাগজপত্র পেয়ে গেছেন৷ কত টাকা পাবেন, সেটা এখনও তাঁদের জানা নেই৷ একজনকে চাকরির প্রতিশ্রুতি সরকার দিয়েছিল৷ পরিবারে মাধ্যমিক পাস বলতে মেজো মেয়ে৷ তারই নাম সুপারিশ করেছেন চাকরির জন্য৷ বিয়ে হয়ে গেলেও মেজো মেয়েকেই তাঁরা চাকরি দিতে চান৷ কারণ, সে মাধ্যমিক পাস৷ ইচ্ছে ছিল ছোট মেয়েকে চাকরি দেওয়ার৷ কারণ তার বিয়ে হয়নি৷ কিন্তু সে নবম শ্রেণিতে পড়ে, বয়সের কারণে চাকরি দেওয়া সম্ভব হবে না। সব কিছুর মধ্যেও যেন মৃত্যুশোক ভুলতে পারছে না সৈয়দপুর গ্রাম৷ আর রুজিরুটির খোঁজে এখন সেই গ্রামের পুরুষরা৷

রাজস্থান থেকে ফিরে আসা শ্রমিকদের সঙ্গে গুলবাহার বিবি। সৈয়দপুর গ্ৰামে, বৃহস্পতিবার।ছবি:‌ অভিজিৎ চৌধুরি

জনপ্রিয়

Back To Top