সব্যসাচী সরকার, ওয়ানাড:‌ কেরলের কোঝিকোড় থেকে ৭১ কিলোমিটার দূরে ওয়ানাড় লোকসভা আসন। যে আসনটি নিয়ে এখন জাতীয় রাজনীতির অলিন্দে চর্চা তুঙ্গে। কারণ আমেথির পাশাপাশি এই লোকসভা কেন্দ্রেও প্রার্থী হয়েছেন কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, কেন ওয়ানাড লোকসভা কেন্দ্রকে বেছে নেওয়া হল?‌ এই লোকসভা কেন্দ্র থেকে কেন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন রাহুল গান্ধী?‌ রাজনৈতিক এবং ভৌগোলিক প্রেক্ষাপট কী এই লোকসভা কেন্দ্রের?‌ 
ওয়ানাড একটি জেলা। আর জেলা শহরের নাম কলপেট্টা। মাইসুরু থেকে সাড়ে তিন ঘন্টা সময় লাগে বাসে এখানে পৌঁছতে। ইতিহাস বলছে, এই ওয়ানাড় ছিল তৎকালিন রাজা টিপু সুলতানের সেনা ছাউনি এবং গোলাবারুদ রাখার জায়গা। তখন অবশ্য জায়গাটির নাম ছিল সুলতান বাথেরি। যা এখন পরিবর্তিত হয়ে লোকমুখে সুলতান ব্যাটারি বলেই উচ্চারিত। সমুদ্র থেকে ১ হাজার মিটার ওপরে পাহাড়ি শহর ওয়ানাড প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর। এখানে ৮টি আদিবাসী গোষ্ঠী রয়েছে। যাদের জীবন–জীবিকা কৃষি নির্ভর। এখানে কোনও শিল্প নেই। 
এবার আসা যাক রাহুল গান্ধীকে কেন এখানে দাঁড় করানো হল?‌ কংগ্রেস সূত্রে খবর, এই প্রথম কেরল থেকে গান্ধী পরিবারের কেউ কংগ্রেসের টিকিটে এখানে নির্বাচনে দাঁড়াল। তাছাড়া তিনটি রাজ্যের সীমানায় এই ওয়ানাড। কর্নাটক, অন্ধ্রপ্রদেশ এবং তামিলনাড়ু। আর কেরল তো রইলই। এই তিনটি রাজ্যের সীমানা এখান থেকে বেশিদূরে নয়। ফলে ওয়ানাড থেকে এই তিন রাজ্যে যোগাযোগ, প্রচার করা যাবে। আবার এই তিন রাজ্যের কংগ্রেস কর্মীরাও রাহুলকে পেয়ে উজ্জীবিত হবেন। 
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের দিকে তাকালে দেখা যায়, ওয়ানাড চিরকালের বাম ঘাঁটি। আর এখান থেকে কংগ্রেস সভাপতি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করায় ক্ষুব্ধ তাঁরা। এমনকী বেশ খানিকটা চিন্তায় পড়ে গিয়েছে কেরলের এলডিএফ নেতৃত্ব। তাই সীতারাম ইয়েচুরি, বৃন্দা কারাতের মতো শীর্ষ বাম নেতৃত্বের কপালেও ভাঁজ পড়েছে। এই এলাকার বরাবর নেতৃত্ব দিয়ে এসেছেন রমেশ চেন্নিথালা। ওয়ানাড একটিমাত্র লোকসভা নির্বাচন। যেখানে কালিকট ১টি বিধানসভা কেন্দ্র, কোঝিকোড়ের ৩টি বিধানসভা কেন্দ্র এবং ওয়ানাড়ের ৩টি বিধানসভা কেন্দ্র নিয়ে ওয়ানাড লোকসভা কেন্দ্রটি গঠিত। 
এখানে রাহুল গান্ধী প্রচারে এসে বলেছিলেন, ‘‌ওয়ানাড ইজ মিনি ইন্ডিয়া। সম্প্রীতি দেখতে চাইলে ওয়ানাডে আসুন।’‌ কেন তিনি এই কথা বলেছিলেন?‌ কারণ হিন্দু ভোটারের পাশাপাশি এখানে ৪৫ শতাংশ মুসলিম এবং খ্রিষ্টান ভোটারও রয়েছেন। বছরের পর বছর তাদের একসঙ্গে বসবাস। তাদের মধ্যে কোনও সমস্যা নেই। তাই সম্প্রীতির ভারত দেখাতেই এই কথা বলেছেন তিনি। তাছাড়া বিজেপি যেখানে বিভেদের রাজনীতি করছে তা কমব্যাট করতেই ওয়ানাডকে মিনি ইন্ডিয়া বলেছেন রাহুল বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। 
এখানে এসে দেখা গেল, কংগ্রেস কর্মীরা পোস্টার ছাপিয়েছেন। যেখানে লেখা রয়েছে ‘‌এনার্জি ফর কেরল’‌। আর এই এনার্জির ‘‌আর’‌ ও ‘‌জি’‌ অক্ষরকে বড় হাতের করে লেখা রয়েছে। যার অর্থ রাহুল গান্ধী। এখানের এলডিএফ–এর আহ্বায়ক বিজয় রাঘবন বলেন, ‘‌এটা বরাবর বামেদের জায়গা। মানুষের যে বিকাশ এখানে হয়েছে তাতে বামেদের শ্রম রয়েছে। রাহুল গান্ধী এখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে এসেছেন। কিন্তু উনি তো জায়গাটাই চেনেন না। সংবাদমাধ্যমে প্রচার শুনতে ভালই লাগে। কিন্তু ভোটে এর প্রভাব পড়বে না। আর কংগ্রেস–সিপিএম লড়াই এবার অবশ্যই হবে।’‌ ফলে কংগ্রেস সভাপতি এখানে একটা ফ্যাক্টর তা কার্যত তিনি বুঝিয়ে দিলেন। 
অন্যদিকে কংগ্রেস নেতৃত্বকে রাহুল গান্ধী নির্দেশ দিয়েছেন এই জায়গাটির উন্নতির কথা ভাবতে। এখানে এসে তিনি প্রচারও করেছেন। তাতে উজ্জীবিত হয়ে কংগ্রেস কর্মীরা বলছেন কেরলের ২০টি আসনের ২০টিই পাবে কংগ্রেস। আর গ্রামের ভেতরে পোস্টার পড়েছে ‘‌ওয়েলকাম টু ওয়ানাড়’‌। 

জনপ্রিয়

Back To Top