‌‌সংবাদ সংস্থা, দিল্লি: করোনার কোপে সারা দেশ। বেড়েই চলেছে মৃত্যুমিছিল। মাত্রাতিরিক্ত সংক্রমণে অনেককেই ভেন্টিলেশনে রাখতে হচ্ছে। প্রায় অজানা এই মহামারী সামাল দিতে ভেন্টিলেটরের সংখ্যা অপ্রতুল। এই অবস্থায় ধরা পড়ল একটি শোচনীয় তথ্য। স্টিং অপারেশন করে ‘‌ইন্ডিয়া টুডে’‌ জেনেছে যে, লকডাউনে ত্রস্ত আমজনতা যেমন অতিরিক্ত মুদির মাল জড়ো করছেন, তেমনই গরিব ভারতের বিত্তশালীরা থরে থরে ভেন্টিলেটর কিনে রাখছেন। যদি প্রয়োজন হয়, তাই আগেভাগেই প্রস্তুতকারকদের থেকে চড়া দামে ভেন্টিলেটর মজুত করছেন পয়সাওয়ালারা!‌
ভেন্টিলেটর তৈরি করে দিল্লির ‘‌মেডিক্যাম ‌এন্টারপ্রাইজ’‌। সংস্থার বাণিজ্যিক প্রধান কমলেশ মৌর্যের কাছে খদ্দের সেজে গেছিলেন ‘‌ইন্ডিয়া টুডে’‌-‌র সাংবাদিক। মৌর্য বলেন, ‘‌দেশে করোনা ক্রমে থাবা বসাতেই ভেন্টিলেটরের চাহিদা বেড়েছে দশগুণ। এমনিতে আমাদের সংস্থার ভেন্টিলেটর পাওয়া যাচ্ছে না বলেই ধরে নিন। তবে আপনি যদি অন্য সংস্থার পুরনো ভেন্টিলেটর চান, দিয়ে দেব। সেক্ষেত্রে ভাল দাম দিতে হবে। এই ৬ লক্ষ টাকার মতো।’‌ যদিও ওই ভেন্টিলেটরের দাম তার অর্ধেকেরও কম বলে স্বীকার করেন মৌর্য। 
এর পর একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য দেন তিনি। বলেন, গত সপ্তাহ থেকে দাম বেড়েছে। কারণ, আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে ভেন্টিলেটর কিনছেন অতি বিত্তবান কিছু মানু্ষ। তা-‌ও একটা নয়, একাধিক। এমন নয় যে তাঁদের বাড়িতে কেউ আক্রান্ত। আগাম আশঙ্কা থেকেই তাঁরা ভেন্টিলেটর কিনছেন!‌ মৌর্যের কথায়, ‘‌স্টক ফুরিয়েছে। অনেকে পুরনো স্টকের যন্ত্রের জন্যও অনায়াসে ৬-‌৭ লক্ষ টাকা দিতে চাইছেন।’‌
দিল্লির আরেকটি ভেন্টিলেটর প্রস্তুতকারক সংস্থা ‘‌তীর্থঙ্কর মহাবীর ট্রেডার্স’‌-‌এর নমন জৈন জানিয়েছেন, বিত্তশালীরা বসবাস করেন, এমন আবাসনের তরফে প্রচুর পোর্টেবল ভেন্টিলেটর সরবরাহের বরাত পেয়েছেন। জানিয়েছেন দিল্লির এক অ্যাসিস্ট্যান্ট পুলিশ কমিশনার একসঙ্গে ৩টি ভেন্টিলেটর কিনেছেন। তাঁর বাড়িতে কেউ আক্রান্ত নন। যদি হন, তার সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে। জৈন বলেছেন, ‘‌আমাদের কাছে ৭৪০টি পোর্টেবল ট্রিলজি–‌সহ মোট ৬ হাজার ভেন্টিলেটর ছিল। আর মাত্র ১১-‌১২টি পড়ে আছে। ক’‌দিন আগেই নয়ডার একটি আবাসনের কর্তৃপক্ষ ১০টি ভেন্টিলেটর কিনেছেন।  
পাশাপাশি বাইপ্যাপ মেশিন কেনারও হিড়িক পড়েছে। সাধারণত একটি নতুন বাইপ্যাপ মেশিনের দাম ২ লক্ষ ২৫ হাজার টাকা। এখন পুরনো বাইপ্যাপ মেশিনই বিক্রি হচ্ছে দেড় লক্ষ টাকায়। যা সচরাচর ৬০ হাজার থেকে ৮৫ হাজার টাকায় বিক্রি হয়।
দিল্লির কোটলা এলাকার ‘‌ইম্পিরিয়াল গ্যাসেস অ্যান্ড সার্জিক্যাল’‌ সংস্থার গুরশরণ সিং জানিয়েছেন, রোজ প্রচুর ফোন আসছে। তবে এখনই ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য ভেন্টিলেটর বিক্রি করছেন না। আগে যারা বরাত দিয়েছিল, সেখানে দিচ্ছেন। তবে স্টক শেষ হওয়ার মুখে চড়া দামে বিক্রি করার জন্য কিছু ভেন্টিলেটর সরিয়ে রেখেছেন। সেগুলো নগদ টাকাতেই বিক্রি করবেন। 
এভাবে ব্যক্তিগত ব্যবহারে ভেন্টিলেটর বিক্রি নিষিদ্ধ, তা মেনে নিয়েও দিল্লি সংলগ্ন গাজিয়াবাদের ‘‌ওয়াইএমজি হেলথকেয়ার’‌-‌এর কর্ণধার গজেন্দ্র সিং জানিয়েছেন, ‘‌আমাদের ২০টি ভেন্টিলেটর ছিল। পুরনো ক্রেতাদের কথা আগে মাথায় রেখেছি। তবে দিনের শেষে সবটাই চাহিদা আর সরবরাহের ব্যাপার। বেশি চাহিদা আর কম সরবরাহ থাকলে, দাম তো বাড়বেই!‌’‌ 
তাঁর কাছে ৫টি পুরনো মিনি ভেন্টিলেটর আছে। একেকটির দাম ৮৬ হাজার টাকা করে ধরেছেন। করোনোর প্রকোপ বাড়লে এগুলোই ২ লক্ষ টাকা করে বিক্রি করবেন। তবে সরকার খবর পেলে, এগুলো কোনও ব্যক্তি বিশেষকে বিক্রি করতে পারবেন না। তা-‌ও জানিয়েছেন গজেন্দ্র।
এই মুহূর্তে দেশে ৪০ হাজার ভেন্টিলেটর আছে বলে নানা সূত্রের খবর। করোনার প্রাদুর্ভাবে এ মাসেই ভেন্টিলেটর, আইসিইউ–‌র যাবতীয় চিকিৎসাযন্ত্র, হ্যান্ড স্যানিটাইজারের রপ্তানি বন্ধ করেছে সরকার। তবে খোদ দিল্লিতে চোরাপথে ভেন্টিলেটরের বিকিকিনি চলছেই। ডিস্ট্রিবিউটররা তাতে উৎসাহ দিচ্ছে। দিল্লির নজফগড়ের ‘‌ইউএম হেলথকেয়ার’‌-‌এর ডিরেক্টর মণীশ ধনকড়ের কথায়, ‘‌মানুষ পরিস্থিতির সদ্ব্যবহার করবেই। সরকার সহযোগিতা চাইছে। কিন্তু কাল বিপদে পড়লে সরকার কী সহযোগিতা করবে?‌’‌ তাই বলে এভাবে আগাম বিপদের আশঙ্কায় সঙ্কটজনক রোগীদের প্রাপ্য ভেন্টিলেটর মজুত করা যায়?‌ ‌ধনকড়ের জবাব, ‘‌কেন নয়?‌ আগে তো নিজেকে বাঁচাতে হবে। সরকার কী বাঁচাবে?‌’‌ এই যুক্তিতে ৫০ শতাংশ অগ্রিম নিয়ে ৫টি মিনি পোর্টেবল ভেন্টিলেটর ৩ লক্ষ ৯২ হাজার টাকায় বিক্রি করছে তাঁর সংস্থা।

জনপ্রিয়

Back To Top