রাজীব চক্রবর্তী,দিল্লি: কাল রাতে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা ছাড়ার সিদ্ধান্ত জানাতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ফোন করেছিলেন তেলুগু দেশমের শীর্ষনেতা চন্দ্রবাবু নাইডু। মোদি ফোনে আসেননি। আজ প্রধানমন্ত্রী ফোন করলেন অন্ধ্রের মুখ্যমন্ত্রীকে, তবে বিকেলে। তার আগে অন্ধ্রে চন্দ্রবাবুর সরকার থেকে বেরিয়ে এসেছেন বিজেপি মন্ত্রীরা। স্বভাবতই দুই নেতার দশ মিনিটের কথায় বরফ গলল না। যা হওয়ার ছিল, তাই হল। ‘‌চন্দ্রগ্রহণ’‌ লাগল মোদি সরকারে। চন্দ্রবাবুর নির্দেশে বৃহস্পতিবার সন্ধেয় লোক কল্যাণ মার্গে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে গিয়ে মোদির হাতেই পদত্যাগপত্র তুলে দিলেন তেলুগু দেশমের দুই মন্ত্রী অশোক গজপতি রাজু ও ওয়াই এস চৌধুরি। তাঁরা অসামরিক বিমান পরিবহণ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি দপ্তরের রাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন। এখন এনডিএ থেকে বেরিয়ে আসার ঘোষণাটুকুই বাকি রইল। তবে বিশেষ রাজ্যের মর্যাদা না–দেওয়ার প্রতিবাদে সরকার ছাড়ার পরেও তেলুগু দেশমের পদত্যাগী দুই মন্ত্রী জানিয়েছেন, ‘‌আমরা এখনই এনডিএ ছাড়ছি না।’‌‌
চন্দ্রবাবু কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা থেকে মন্ত্রীদের তুলে নিলেন রাজ্যের অমর্যাদা ও বঞ্চনার অভিযোগে। রাজ্যভাগের সময় অন্ধ্রকে বিশেষ রাজ্যের মর্যাদা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু চতুর্দশ অর্থ কমিশন কোনও রাজ্যের বিশেষ মর্যাদার বিষয়টি বিলোপ করে দেয়। তারপর চন্দ্রবাবুর চাপে কেন্দ্র রাজি হয় এ বাবদ অন্ধ্রের ক্ষতি পূরণের জন্য বিশেষ প্যাকেজ দিতে। কিন্তু তারপর থেকে চন্দ্রবাবু ক্রমাগত বলে আসছেন, পোল্লাভরম বাঁধের জন্য সহায়তা থেকে শুরু করে রাজস্ব ঘাটতি মেটানো বা অতিরিক্ত বরাদ্দের প্রতিশ্রুতি রাখছে না কেন্দ্র। অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলির এ বছরের বাজেট পেশের পর সঙ্ঘাত চরমে ওঠে। এর সঙ্গে যোগ হয় ইগোর লড়াই। চন্দ্রবাবু জানিয়েছেন, ২৯ বার সময় চাওয়ার পর তিনি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে পেরেছিলেন। আর এদিন সংসদ চত্বরে দেশম সাংসদরা ‘‌আজকাল’‌কে জানিয়েছেন, ‘‌গতকাল সাংবাদিক সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলির শরীরী ভাষায় গোটা অন্ধ্রপ্রদেশ অপমানিত হয়েছে। ন্যায্য দাবি দিতে অস্বীকার করে জেটলি যা বলেছেন তারপর এনডিএ–‌‌তে থাকা আর সম্ভব নয়।’‌ উল্লেখ্য, কাল জেটলি বলেছিলেন অন্ধ্রকে তার প্রাপ্য দেওয়া হচ্ছে। কেন্দ্রের হাতে যেহেতু দেশের নিরাপত্তার মতো বিষয়ের দায়িত্ব রয়েছে, তাই কেন্দ্রের পুরো টাকাটাই এই রাজ্যকে দিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। 
কেন্দ্রীয় সরকারি সূত্রের বক্তব্য, এক্ষেত্রে সরকারের হাত–পা বাঁধা। কারণ একটি রাজ্যকে বিশেষ মর্যাদা দিলেই আরও অনেকেই সেই দাবি তুলবে। আগেই তেলেঙ্গানার মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রশেখর রাও একই দাবি তুলে আসছেন। আজ বিহারের মুখ্যমন্ত্রী তথা এনডিএ শরিক নীতীশ কুমার অন্ধ্রের দাবি সমর্থন করে বিহারকেও বিশেষ রাজ্যের মর্যাদা দেওয়ার দাবি তুলেছেন। তা না হলে বিহারের মতো রাজ্যে অনগ্রসর থেকে যাবে বলে তিনি মন্তব্য করেছেন। তাঁকে সমর্থন করে রামবিলাস পাসোয়ান বলেছেন, ‘‌বহুদিন ধরে নীতীশ কুমার এই দাবি জানিয়ে আসছেন।’‌ এই ধরনের চাপের পাশাপাশি অন্য এক শরিক শিবসেনা শানিয়েছে রাজনৈতিক আক্রমণ। তারা মনে করছে, এনডিএ এবার ভেঙে পড়বে। তেলুগু দেশম সরকার ছাড়ার সিদ্ধান্ত জানানোর পর আজ শিবসেনার মুখপাত্র সঞ্জয় রাউত বলেন, ‘‌আমরা আগেই আঁচ করেছিলাম। আরও বাড়বে বিজেপি–‌‌র অন্যায়। আরও অনেক পার্টি এনডিএ ছাড়বে।’‌ শিবসেনারই মনীষা কান্ডে বলছেন, ‘‌উদ্ধব ঠাকরে তো আগেই বলেছিলেন। এই বিজেপি নেতারা অহঙ্কারী। ২০১৯ সালে ভোটে জেতা কঠিন হবে।’‌ ‌তবে অনেকেই মনে করছেন, তেলুগু দেশম এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজনৈতিক উদ্দেশে। কারণ, অন্ধ্রের বঞ্চনার ইস্যু তুলে রাজ্যে নিজের জমি আরও শক্ত করছে ওয়াই এস আর কংগ্রেস। সেই দাবিটি ‘‌হাইজ্যাক’‌ করে নিতে চাইছেন চন্দ্রবাবু।  
তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হল, চন্দ্রবাবু কাল রাতে সরকার ছাড়ার ঘোষণা করার পর সম্পর্ক মেরামতির চেষ্টা না–করে পাল্টা আঘাত করে বিজেপি। এদিন সকালেই অন্ধ্রের মন্ত্রিসভা থেকে বেরিয়ে এসেছেন বিজেপি–‌‌র দুই মন্ত্রী কামেনেনি শ্রীনিবাস ও পি মণিকল্য রাও। তারপর তেলেঙ্গানার বিজেপি–‌র নেতা কৃষ্ণ সাগর রাও কটাক্ষ করে বলেছেন, ‘‌সুবিধাবাদী রাজনীতি করছেন চন্দ্রবাবু।‘‌ তাঁর বক্তব্য‌, ২০১৩ সালে এনডিএ–‌তে যোগ দেন চন্দ্রবাবু। ২০১৪–‌র সাধারণ নির্বাচনের সময়ই বিজেপি–‌র সমর্থনে বিধানসভায় জেতেন। আরেকটা নির্বাচনের আগে এবার নাইডু সুবিধামতো সরে যেতে চাইছেন।’‌ টিডিপি–‌‌র পর বিজেপি–কে চাপে রাখার প্রক্রিয়া শুরু করেছে ওয়াইএসআর কংগ্রেসও। অন্ধ্রকে বিশেষ রাজ্যের মর্যাদা দেওয়া হচ্ছে না বলে জগন্মোহন রেড্ডি হুমকি দিয়েছেন, মোদি সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনবেন। এই মুহূর্তে লোকসভায় ৮ জন সাংসদ রয়েছে রেড্ডির দলের। অনাস্থা প্রস্তাব আনতে ৫০ জনের সমর্থন দরকার। তাই কংগ্রেস বাদে অন্য দলগুলির কাছে সমর্থন চেয়েছে তারা। ইতিমধ্যে রাজনৈতিক কারণেই অন্ধ্রের দাবিকে সমর্থন জানিয়ে টিডিপি–‌‌র উদ্দেশে বার্তা দিয়ে রেখেছেন রাহুল গান্ধী৷ তিনি জানিয়েছেন, কেন্দ্রে ক্ষমতায় এলে চন্দ্রবাবুর দাবি মেনে নেওয়া হবে। চন্দ্রবাবুকে কাছে টানতে সোনিয়া গান্ধীও বিশেষভাবে উদ্যোগী হয়েছেন।‌

বিদায়। সংসদ ভবনে অশোক গজপতি রাজু। ছবি: পিটিআই

জনপ্রিয়

Back To Top