আজকালের প্রতিবেদন: ত্রিপুরায় লেনিনের মূর্তি উপড়ে ফেলার ঘটনায় ত্রিপুরার রাজ্যপাল তথাগত রায়ের টুইটে কেন্দ্রীয় সরকার তো বটেই, বিপাকে পড়েছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। বিড়ম্বনায় বিজেপি–র সর্বভারতীয় সভাপতি অমিত শাহও। ত্রিপুরার মতোই তাঁরা কড়া অবস্থান নিয়েছেন তামিলনাড়ুতে ‘‌পেরিয়ার’–‌‌এর মূর্তি ভাঙার ঘটনাতেও। কিন্তু ত্রিপুরায় তাঁদেরই নিযুক্ত রাজ্যপালের প্রকাশ্য বক্তব্য তাঁদের ‘‌সদিচ্ছা’ নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।‌   
ত্রিপুরার ঘটনা মঙ্গলবার বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পরেই দেশবিদেশে নিন্দার ঝড় ওঠে। তাতে যথেষ্ট বিপাকে পড়েন বিজেপি–র কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। বুধবার সকালে প্রধানমন্ত্রী মোদি এবং অমিত শাহ কথা বলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের সঙ্গে। তারপরেই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক কড়া নির্দেশিকা জারি করে। তাতে স্পষ্ট বলা হয়, যে বা যারা ওই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত, তাদের কঠোরতম শাস্তি দেওয়া হবে। তারপরেও বিকেল নাগাদ আরও একবার সতর্কবার্তা জারি করে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক। যাতে বলা হয়, দেশের কোনও রাজ্যের কোনও জেলায় এমন ঘটনা ঘটলে সংশ্লিষ্ট জেলার জেলাশাসক এবং পুলিসসুপার দায়ী থাকবেন।  
কিন্তু ঘটনাচক্রে, কেন্দ্রীয় সরকার এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের সতর্কবার্তার তোয়াক্কা না–করে একের পর এক টুইট করতে থাকেন ত্রিপুরার রাজ্যপাল তথাগত রায়। প্রসঙ্গত, তাঁর রাজ্যপাল পদে নিয়োগকর্তা কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকারই। অন্য কোনও রাজ্যের রাজ্যপাল এমন কোনও অবস্থান নেননি। কিন্তু তথাগতবাবু প্রথম থেকেই ত্রিপুরার ঘটনাকে ‘‌বৈধতা’‌ দেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছেন।   
বিজেপি–র শীর্ষ সূত্রের খবর, ঘটনা পরম্পরায় ত্রিপুরার রাজ্যপালের ওপর ‘‌বিরক্ত’‌ তারা। এদিন দুপুরে বিজেপি–র এক শীর্ষনেতা স্পষ্টই বলেন, ‘উনি একটু বাড়াবাড়ি করছেন। প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট বলে দেওয়ার পরেও কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিনিধি এবং রাজ্যের সাংবিধানিক প্রধান হিসেবে উনি যা করছেন, তাতে আমরাই বেকায়দায় পড়ে যাচ্ছি। কেন উনি এভাবে ঘটনাটাকে ন্যায্য বলে প্রমাণ করতে উঠেপড়ে লেগেছেন, সেটা উনিই বলতে পারবেন। কিন্তু ওঁর কার্যকলাপ নজরে রাখা হচ্ছে।’‌ ওই নেতা আরও জানান, বিজেপি সভাপতি অমিত শাহও বিষয়টি নিয়ে কড়া অবস্থান নিয়েছেন। তাতেও ত্রিপুরার রাজ্যপালের টনক নড়েনি।  ‌
প্রসঙ্গত, এদিনই সকাল সাড়ে ১০ নাগাদ পরপর চারটি টুইট করেন অমিত শাহ। যেখানে তিনি স্পষ্টই বলেন, বিষয়টি ‘‌অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক’‌। দল হিসেবে তাঁরা কারও মূর্তি ভাঙা বা উপড়ে নেওয়া সমর্থন করেন না। অমিত শাহ আরও লেখেন, তাঁদের মূল লক্ষ্য মানুষের জীবনযাত্রার মানে গুণগত পরিবর্তন আনা। টুইটে লেখা হয়, ‘‌আমি তামিলনাড়ু এবং ত্রিপুরায় দলীয় নেতৃত্বের সঙ্গে কথা বলেছি। দলের কেউ এমন কোনও ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকলে দলের তরফে কঠোরতম ব্যবস্থা নেওয়া হবে’‌।  অমিত শাহ লেখেন, খোলা মন এবং ইতিবাচক রাজনীতি নিয়ে বিজেপি এক ‘‌নতুন ভারত’‌ গড়তে চায়। 
তার ঘন্টাতিনেক পর তথাগতবাবু টুইট করে বলেন, ‘‌মৌলিক প্রশ্ন’‌ এসে যাচ্ছে। সেটি কী?‌ তাঁর টুইট বলছে, ‘‌আমরা নয়াদিল্লির ইন্ডিয়া গেট থেকে পঞ্চম জর্জের মূর্তি সরিয়েছি। কলকাতার ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের সামনে থেকে তাঁর মূর্তি সরিয়েছি। ঔরঙ্গজেব রোডের নাম পাল্টেছি। সমস্তই করেছে বিভিন্ন সরকার। তাহলে কেন একটি সরকার লেনিনের মূর্তি সরাতে পারবে না?‌ বা লেনিন সরণির নাম বদলাতে পারবে না?‌ কোনও জবাব আছে?‌’‌
এর আগে এদিন সকালে একটি টুইটে তথাগতবাবু লিখেছিলেন, তিনি যে সব ফোন পাচ্ছেন, তা থেকে মনে হচ্ছে, ত্রিপুরায় তাণ্ডব চলছে। ননসেন্স!‌ এমনকী, লেনিনের মূর্তি উপড়ানোর ঘটনাতেও কোনও শান্তিভঙ্গ হয়নি। 
তারও আগে, মঙ্গলবার ত্রিপুরার রাজ্যপাল টুইট করেছিলেন, ‘‌আমায় বলা হয়েছে, আইনি কর্তৃপক্ষ ছাড়া কেউ যদি মূর্তি উপড়ে (‌সে লেনিনেরই হোক বা অন্য কারও) ফেলে, তাহলে তার ভারতীয় দণ্ডবিধিতে দুষ্টুমি (‌মিসচিফ)‌ বলে পরিগণিত হয়। সেগুলি জামিনযোগ্য এবং অগ্রহণযোগ্য (‌নন–কগনিজেব্‌ল)‌ অপরাধ। সেগুলি ফুলিয়ে–ফাঁপিয়ে দাঙ্গা বা খুনের মতো অপরাধ বলে দেখানোর চেষ্টা অবাঞ্ছিত’‌। 
তবে শেষোক্ত টুইটগুলি অমিত শাহের টুইটের আগে করা। কিন্তু ‘‌মৌলিক প্রশ্ন’‌ সংবলিত টুইটটি বিজেপি সভাপতিকেই কটাক্ষ করে করা হয়েছে বলে মনে করছেন দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। তথাগতবাবুর এই কর্মকাণ্ডে দল এবং সরকার বিড়ম্বনায় পড়েছে বলেই তাঁরা প্রাথমিকভাবে মনে করছেন। বিজেপি সূত্রের ইঙ্গিত, প্রয়োজনে ত্রিপুরার রাজ্যপালের সঙ্গে কথা বলে তাঁকে ‘‌সংযত’‌ হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হতে পারে। তবুও তিনি অনড় থাকলে সরাসরি কড়া পদক্ষেপের দিকে যাওয়া হতে পারে। ‌

জনপ্রিয়

Back To Top