সংবাদ সংস্থা, মুম্বই: সুশান্ত সিং রাজপুতের মৃত্যু–রহস্য ক্রমেই জটিল হচ্ছে। চড়ছে চাপান–‌উতোরের পারদ। সুশান্তের মৃত্যুর প্রায় দেড় মাস পর এই প্রথম মুখ খুললেন সুশান্তের বান্ধবী রিয়া চক্রবর্তী। বললেন, ‘‌সুশান্ত মৃত্যু–‌রহস্য বিচারাধীন। তাই এখনই কিছু বলতে পারব না। সত্য এক দিন সামনে আসবেই।’‌
রিয়ার দিকে ইতিমধ্যেই অভিযোগের আঙুল তুলেছে সুশান্তের পরিবার। রিয়াকে মুম্বই পুলিশের কেউ সাহায্য করছেন বলেও তোপ দেগেছেন সুশান্তের পরিবারের আইনজীবী বিকাশ সিং। এবার গল্পে নতুন মোড় আনলেন সুশান্তের বন্ধু, ক্রিয়েটিভ কনটেন্ট ম্যানেজার তথা সুশান্ত–‌মামলার অন্যতম সাক্ষী সিদ্ধার্থ পিঠানি। বান্দ্রা থানায় একটি ই–‌মেল পাঠিয়ে তিনি দাবি করেছেন, রিয়ার বিরুদ্ধে মিথ্যে বয়ান দেওয়ার জন্য তঁাকে জোর করছে সুশান্তের পরিবার। ২২ জুলাই হোয়াট্‌সঅ্যাপ কনফারেন্স কলে তঁার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন সুশান্তের জামাইবাবু সিনিয়র আইপিএস অফিসার ও পি সিং, সুশান্তের দিদি এবং অন্য এক ব্যক্তি। তঁারা জানতে চান, রিয়া যখন সুশান্তের সঙ্গে থাকতেন, তখন কী পরিমাণ টাকা খরচ করতেন। এর পর ২৭ জুলাই ফের সিদ্ধার্থকে ফোন করেন ও পি সিং। তখন তিনি রিয়ার বিরুদ্ধে বিহার পুলিশের কাছে মিথ্যে বয়ান দেওয়ার জন্য সিদ্ধার্থের ওপর চাপ সৃষ্টি করেন। এ ছাড়া একটি অচেনা নম্বর থেকেও তঁাকে হোয়াট্‌সঅ্যাপে ফোন করা হয়েছিল। পরে নম্বরটি খতিয়ে দেখে জানা যায়, সেটি  নীলোত্‍‌পল মৃণাল নামে এক ব্যক্তির, যিনি বিহার পুলিশের সঙ্গে একই গাড়িতে বসে এই মামলায় সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেছিলেন। ই–‌মেলে সিদ্ধার্থ লিখেছেন, ‘‌রিয়ার বিরুদ্ধে যা আমি জানিই না, তা নিয়ে বয়ান দেওয়ার জন্য আমায় চাপ দেওয়া হচ্ছে।’‌ 
এদিকে সুশান্তের বাবা কে কে সিং ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৪০, ৩৪২, ৩৮০, ৪০৬, ৪২০, ৩০৬ ধারায় পাটনার রাজীবনগর থানায় মামলা দায়ের করেছেন রিয়ার বিরুদ্ধে। সম্পর্কে থাকাকালীন সুশান্তের কাছ থেকে টাকা আদায় এবং সেই টাকায় ফুর্তি, জালিয়াতি, আত্মহত্যায় প্ররোচনা–সহ একাধিক অভিযোগ করা হয়েছে। কিন্তু এ–‌সব অভিযোগকে নস্যাৎ করে সুশান্তের বাবা–সহ গোটা পরিবারকে মিথ্যাবাদী বলে দাবি করলেন রিয়া। সুপ্রিম কোর্টে দায়ের–‌করা এক পিটিশনে রিয়ার আইনজীবী লিখেছেন, প্রয়াত সুশান্ত সিং রাজপুতের বাবার দায়ের–‌করা মামলায়  রিয়াকে মিথ্যা অভিযোগে ফঁাসানো হচ্ছে। সুশান্তের মৃত্যুতে রিয়া শোকাহত। তার ওপর সোশ্যাল মিডিয়ায় ক্রমাগত ধর্ষণ ও খুনের হুমকিতে তিনি আরও ভেঙে পড়েছেন। তঁাকে নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় অসভ্যতা চলছে।
অন্য দিকে, সুশান্তের দিদি মিতু সিং বিহার পুলিশকে জানিয়েছেন, সুশান্তের বাড়ির কাজের লোক, যিনি প্রথম সুশান্তের ঝুলন্ত দেহ দেখতে পেয়েছিলেন, তিনি জানিয়েছেন, বেশ কয়েক মাস ধরে রিয়া আর সুশান্ত এক সঙ্গে ছিলেন এবং ওই সময়ে রিয়া সুশান্তের ওপর ‘‌ব্ল্যাক ম্যাজিক’‌ চালাতেন। খুব শিগগিরই মিতু সিংয়ের বক্তব্য রেকর্ড করবে বিহার পুলিশ। সুশান্ত–‌মৃত্যু মামলায় বিহার পুলিশের কাছ থেকে সুশান্তের বাবার করা এফআইআরের কপি চেয়ে পাঠিয়েছে ইডি। সুশান্তের অ্যাকাউন্ট থেকে ১৫ কোটি টাকা লোপাটের যে–‌অভিযোগ অভিযোগ এনেছে অভিনেতার পরিবার, তা নিয়েই তদন্ত করছে ইডি। কারণ সুশান্তের দুটি সংস্থায় ডিরেক্টর ছিলেন রিয়া আর তঁার ভাই। সংস্থার কাজে সুশান্ত টাকা দিলেও কাজের কাজ হয়নি। পরিবেশবান্ধব প্রকল্পেও টাকা ঢালেন সুশান্ত৷ সে–‌টাকারও কোনও হিসেব পাওয়া যাচ্ছে না। আর্থিক তছরুপ প্রতিরোধ আইনে একটি মামলাও দায়ের করেছে ইডি। আগামী সপ্তাহেই রিয়া চক্রবর্তী–সহ অন্য যঁাদের বিরুদ্ধে আর্থিক তছরুপের অভিযোগ রয়েছে, তঁাদের ডেকে পাঠানো হতে পারে।
শুক্রবার বিহার পুলিশের একটি দল মুম্বই পৌঁছেই বান্দ্রার একটি ব্যাঙ্কে হানা দেয়, যে–‌ব্যাঙ্কে সুশান্তের বেশির ভাগ অর্থ গচ্ছিত ছিল। ব্যাঙ্ক এক স্টেটমেন্টে জানিয়েছে, সুশান্তের অ্যাকাউন্ট থেকে একাধিক বার রিয়ার হোটেলের ভাড়া, পার্লারের বিল মেটানো হয়েছে। রিয়ার পাশাপাশি তঁার ভাই সৌভিক চক্রবর্তীর বিমান ভাড়ার জন্যও ব্যবহার করা হয়েছে সুশান্তের অর্থ। ব্যাঙ্ক এও জানিয়েছে যে, সুশান্তের গচ্ছিত অধিকাংশ অর্থের নমিনি করা আছে তঁার দিদি প্রিয়াঙ্কা সিংকে। 
অন্য দিকে, সুশান্ত সিং রাজপুতের মৃত্যুর দেড় মাস পরে প্রথম মুখ খুলেছেন অভিনেতার প্রাক্তন প্রেমিকা অভিনেত্রী অঙ্কিতা লোখান্ডে। কোনও রাখঢাক না করে এক বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ‘‌সুশান্ত কোনও ভাবেই আত্মহত্যা করতে পারে না। আর অবসাদগ্রস্ত হওয়ার ছেলেও ও নয়। আমি নিশ্চিত, ওর সঙ্গে ভয়ঙ্কর কিছু হয়েছে। আমি সেই ভয়ঙ্কর ব্যাপারটাই জানতে চাই। এত পজিটিভ এনার্জির ছেলে হুট করে আত্মহত্যা করবে কেন? প্রায়ই বলত, আমার ফিল্ম চলবে না? তথ্যচিত্র বানাব। সেটা না চললে অরগ্যানিক ফার্ম করব। অর্থাৎ কোনও–‌না–‌কোনও পথ ও ঠিক বের করত। খারাপ লাগছে, মানসিক ভাবে উন্নত এই রকম একজন মানুষের চলে যাওয়াকে অবসাদ আর আত্মহত্যা বলে অসম্মানিত করা হচ্ছে! কোথাও কোনও গন্ডগোল আছে। শেষ এক বছর সবচেয়ে প্রিয় দিদির থেকেও দূরে চলে গিয়েছিল ও। কেন? আসল তথ্য এবার বেরিয়ে আসুক।’‌
এদিকে সুশান্ত–মৃত্যু রহস্যের খেঁাজ চালাতে গিয়ে একটি টেলিভিশন চ্যানেলের স্টিং অপারেশনে বেরিয়ে এল চাঞ্চল্যকর তথ্য। কথা বলা হয়েছিল সুশান্তের ফিটনেস ট্রেনার, বহু দিনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু সমীর আহমেদের সঙ্গে। তঁার বিস্ফোরক দাবি, সুশান্ত কী ওষুধ খাবেন তা নিয়ন্ত্রণ করতেন রিয়া। দাবি, সুশান্ত তঁাকে শেষ টেলিফোন করেছিলেন ১ জুন। তখন সুশান্ত একেবারেই স্বাভাবিক ছিলেন। যে–‌কোনও প্রয়োজনে সমীর আসতে পারেন তঁার কাছে, এমন আশ্বাসও নাকি দিয়েছিলেন। সমীর আহমেদের দাবি, সুশান্তের জীবনে রিয়া আসার পরই তিনি পাল্টে যান।
সুশান্ত মৃত্যুর আগের দিন রাতে যে–‌দু’‌জনকে শেষ বারের জন্য ফোন করেছিলেন, তঁারা হলেন মহেশ শেঠি ও রিয়া। মহেশ শেঠিই সেই ব্যক্তি, যিনি সুশান্তের আত্মহত্যার পর প্রথম তঁার ঘরে ঢুকেছিলেন। মহেশ বিহার পুলিশকে বলেছেন, সুশান্তকে তিনি পরামর্শ দিয়েছিলেন, তঁার সমস্যা নিয়ে তিনি যেন বাড়ির সঙ্গে কথা বলেন। সুশান্ত উত্তরে মহেশকে জানিয়েছিলেন, রিয়া তঁাকে কথা বলতে দিচ্ছেন না। রিয়া সব সময় সুশান্তের ফোনে নজরদারি চালাতেন। রিয়া এবং তঁার মা সন্ধ্যা চক্রবর্তী সুশান্তের গোটা টিম বদলে দিয়েছিলেন। সুশান্ত এতে একেবারেই খুশি হয়নি। রিয়া সুশান্তকে তঁার দিদিদের সঙ্গেও কথা বলতে দিতেন না। বন্ধুদের সঙ্গেও যোগাযোগ কমিয়ে দিয়েছিলেন সুশান্ত। 
এই পরিস্থিতিতে সোশ্যাল মিডিয়ায় রিয়ার একটি ভিডিওকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে হইচই। বছরখানেক আগের তোলা ওই ভিডিওতে রিয়া বলছেন, কীভাবে তিনি তঁার বন্ধুকে নিজের হাতের মুঠোয় রাখেন!‌ বন্ধুটি কখনও ভাবতেই পারেন না যে, রিয়ার মস্তিষ্কে কী চলছে। বন্ধুকে বশে রেখে কীভাবে তিনি প্রযোজকদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করান, তাও খোলসা করেছেন ভিডিওতে। এই ভিডিওটিও এখন খতিয়ে দেখছে পুলিশ। 
সুশান্তের মৃত্যু ঘিরে সরগরম রাজনৈতিক মহলও। সুশান্ত সিংকে ভালবাসার জালে ফঁাসিয়ে খুন করেছেন ‘‌বিষকন্যা’‌ রিয়া চক্রবর্তী, তোপ দেগেছেন জেডিইউ নেতা মহেশ্বর হাজারি। তঁার অভিযোগ, সুশান্তের খুনের পেছনে রয়েছে বলিউডের একাধিক বড় মাথা। রিয়া আসলে ‘‌ভাড়াটে খুনি’। উপযুক্ত তদন্তের মাধ্যমেই অপরাধীকে খুঁজে বের করা হবে বলে মন্তব্য করেছেন হাজারি। মুম্বই পুলিশের তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন দুই কেন্দ্রীয় মন্ত্রী আর কে সিং এবং রামবিলাস পাসোয়ান। আর কে সিং সিবিআই তদন্তের পক্ষে সওয়াল করে বলেছেন, কেন সিবিআই তদন্ত এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে?‌ পেছনে কোন্‌ রহস্য?‌ রামবিলাসের অভিযোগ, মৃত্যুর পর এত দিন কেটে গেলেও মুম্বই পুলিশ কিছুই করেনি। মুম্বই ও বিহার পুলিশের মধ্যে কোনও সমন্বয়ই নেই। সুশান্ত–মৃত্যু রহস্য খুঁজে বের করতে সিবিআই তদন্তের দাবি জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে চিঠি দিয়েছেন বিজেপি বিধায়ক অতুল ভটখলকর। লিখেছেন, সুশান্তের মৃত্যু–‌তদন্ত মুম্বই পুলিশ ঠিকঠাক ভাবে করছে না। তারা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বঁাচানোর চেষ্টা করছে। জানা গেছে, অভিনেতার মৃত্যুর আগের রাতে তঁারই বাড়িতে অনুষ্ঠিত এক পার্টিতে হাজির ছিলেন মহারাষ্ট্রের রাজনীতির অত্যন্ত প্রভাবশালী এক ব্যক্তি। দাবি, ওই ব্যক্তি রাজ্যের প্রভাবশালী এক নেতার ছেলে। ওই পার্টিতে সুশান্তের সঙ্গে নাকি ওই ব্যক্তির বাদানুবাদও হয়। তার পর থেকেই নাকি কাজ করছিল না সুশান্তের ফ্ল্যাটের সিসিটিভি। এই বিষয়টিকে হাতিয়ার করে শিবসেনার দিকে আক্রমণের তীর ছুঁড়তে শুরু করেছে বিজেপি।
এই অবস্থায় সুশান্তের পরিবারের পাশে দঁাড়িয়েছে বিহার সরকার। অভিনেতার মৃত্যুর তদন্ত মুম্বইয়ে নিয়ে আসার জন্য রিয়া চক্রবর্তী সর্বোচ্চ আদালতে যে পিটিশন দাখিল করেছিলেন, তার প্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার সুশান্তের পরিবারের তরফে আগাম একটি ক্যাভিয়েট জমা করা হয়। সুপ্রিম কোর্টের কাছে আর্জি জানানো হয়, রিয়ার আবেদনের ভিত্তিতে কোনও সিদ্ধান্ত গ্রহণে র আগে আদালত যেন তাদের কথাও শোনে। শুক্রবার বিহার সরকারের তরফেও ক্যাভিয়েট জমা করে একই আর্জি জানানো হয়েছে সর্বোচ্চ আদালতে। পাশাপাশি, সুশান্ত–মামলায় প্রাক্তন অ্যাটর্নি জেনারেল মুকুল রোহতগিকে আইনজীবী নিয়োগ করার কথাও ভাবছে নীতীশ কুমারের সরকার।
সুশান্ত সিং রাজপুতের মৃত্যু–‌তদন্তে বিহার পুলিশের সাত সদস্যের যে দল মুম্বই পৌঁছেছে, তাদের নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠছে। বৃহস্পতিবার অঙ্কিতা লোখান্ডের বাড়িতে তঁারা গিয়েছিলেন অটোয় চেপে। কিন্তু অঙ্কিতার বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন জাগুয়ারে চেপে। শুক্রবার সকালে মুম্বইয়ের রাস্তায় বিএমডব্লিউ করেও ঘুরতে দেখা গেছে ওই দলকে। কেন বার বার গাড়ি বদল? তদন্তের স্বার্থে? উঠেছে এই প্রশ্নও। 
সুশান্ত সিং রাজপুতের মৃত্যুর পর থেকে সোশ্যাল মিডিয়ায় যুদ্ধে শামিল কঙ্গনা রানাওয়াত। বার বার সুশান্তকে বলিউডের প্রভাবশালীরা ঠান্ডা মাথায় খুন করেছেন বলে দাবি তঁার। দাবি করেছেন সিবিআই হস্তক্ষেপেরও। দাবি করেছিলেন, সুশান্তের মৃত্যুর আগের রাতের পার্টিতে হাজির ছিলেন বলিউডের এক অত্যন্ত প্রভাবশালী। বলিউডে সবাই তঁার নাম জানলেও, কিছুতেই সেই নাম প্রকাশ্যে আনা যাবে না। টুইটে লিখেছিলেন, ‘‌সবাই তঁার নাম জানে। করণ জোহরের প্রিয় বন্ধু এবং পৃথিবীর সেরা মুখ্যমন্ত্রীর সেরা ছেলে। ভালবেসে সবাই তঁাকে বেবি পেঙ্গুইন বলে।’‌ এই বক্তব্যের জন্য নিজের প্রাণসংশয় হতে পারে বলেও দাবি তঁার। শুক্রবার বলেছেন, ‘‌আমাকে যদি ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায়, জানবেন, আমি আত্মহত্যা করিনি!’

জনপ্রিয়

Back To Top