আবু হায়াত বিশ্বাস, দিল্লি, ৩০ মে- শ্রমিক ট্রেনে মৃত্যু হয়েছে ৮০ জনের!‌ রেলওয়ে প্রোটেকশন ফোর্স (‌‌আরপিএফ)–‌‌এর প্রাথমিক রিপোর্টে উঠে এসেছে এমনই তথ্য‌‌। ওই রিপোর্টের ভিত্তিতে একটি সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, গত ৯ মে থেকে ২৭ মে পর্যন্ত ১৯ দিনে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে চলা শ্রমিক ট্রেনে এবং রেলের স্টেশনে এই ৮০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এরপর শনিবার কংগ্রেস মুখপাত্র রণদীপ সিং সুরজেওয়ালা দাবি করেন, শ্রমিক ট্রেনে মৃত্যুর ঘটনায় রেলমন্ত্রী পীযূষ গোয়েলকে জবাবদিহি করতে হবে। একই সঙ্গে রেলমন্ত্রীর পদত্যাগও দাবি করেছেন তিনি। 
সূত্রের খবর, আরপিএফের রিপোর্টে বলা হয়েছে, সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে পূর্ব–‌মধ্য, উত্তর–‌পূর্ব, উত্তর, উত্তর–‌মধ্য জোনে। উত্তর–‌পূর্ব রেলওয়ের শ্রমিক স্পেশ্যাল ট্রেনে ১৮ জন, উত্তর–‌মধ্য রেলওয়েতে ১৯ জন ও পূর্ব উপকূলীয় বিভাগের ট্রেনে ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। নর্দার্ন রেলওয়ের ট্রেনে যাত্রাকালীন আরও ১০ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। বাকি ২০ জন অন্যান্য ট্রেনে মারা গিয়েছেন। মৃতদের বয়স ৪ থেকে ৮৫ বছরের মধ্যে। রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে, মৃতদের মধ্যে ১ জন করোনাভাইরাসের কারণে এবং ১১ জন কো–মর্বিডিটির (‌করোনার পাশাপাশি অন্য কোনও গুরুতর অসুখের কারণে)‌ দরুন মারা গিয়েছেন। কোন কোন দিনে বেশি মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে তার বিবরণ দিয়ে রিপোর্টে বলা হয়েছে, ১০ জন মারা যান ২৩ মে, ৯ জন করে মারা যান ২৪ ও ২৫ মে, ১৩ জন ২৬ মে এবং ৮ জন ২৭ মে। 
শ্রমিক ট্রেনে ৮০ জনের মৃত্যুর খবর নিয়ে রেল মন্ত্রকের তরফে কোনও প্রতিক্রিয়া মেলেনি। তবে রেলবোর্ডের চেয়ারম্যান বিনোদকুমার যাদব শুক্রবারই জানিয়েছিলেন, শিগগিরই তাঁরা শ্রমিক স্পেশ্যালে মৃত্যুর যাবতীয় তথ্য প্রকাশ করবেন। গত বেশ কিছুদিন ধরে শ্রমিক স্পেশ্যাল ট্রেনে খাবার, জল না পেয়ে অভুক্ত অবস্থায় শ্রমিক মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছিল। যদিও রেলমন্ত্রক অভুক্ত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করে। যাদব দাবি করেন, শ্রমিকদের  নিখরচায় ৮৫ লক্ষের বেশি মিল, ১ কোটি ২৫ লক্ষ জলের বোতল সরবরাহ করেছে রেল। 
কংগ্রেস মুখপাত্র রণদীপ সুরজেওয়ালার অভিযোগ, শ্রমিক ট্রেন নির্দিষ্ট গন্তব্যে দেরিতে পৌঁছচ্ছে। যাত্রাপথে অভুক্ত অবস্থায় মারা যাচ্ছেন শ্রমিকেরা। তবুও রেল ও কেন্দ্রের তরফে কোনও সহায়তা করা হচ্ছে না। রেলমন্ত্রী রাজনীতি করতেই ব্যস্ত!‌ এত কিছুর পরেও কেন পদত্যাগ করছেন না পীযূষ গোয়েল, প্রশ্ন সুরজেওয়ালার। কংগ্রেস নেতা তথা রাজস্থানের মুখ্যমন্ত্রী অশোক গেহলট এক টুইটে প্রধানমন্ত্রীকে পরামর্শ দিয়েছেন, ‘‌কোনও মন্ত্রক ছাড়াই গোয়েলকে মন্ত্রী করে দিন! বরং বিজেপির তহবিল সংগ্রহ করতেই মনোনিবেশ করুন গোয়েল!‌’‌ কংগ্রেস মুখপাত্র জয়বীর শেরগিল টুইটে লিখেছেন, চূড়ান্ত অবহেলায় শ্রমিক মৃত্যু নিয়ে রেল মন্ত্রকের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা হওয়া উচিত। শ্রমিক ট্রেনে মারা যাওয়া ৮০ শ্রমিকের পরিবারকে ন্যায় দিতে হবে। রেলমন্ত্রীকেও জবাবদিহি করতে হবে। 
লকডাউনের সময়ে পরিযায়ী শ্রমিকদের দুর্দশা নিয়ে মোদি সরকারকে বিঁধেছেন অন্য বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতারাও। সিপিএম সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি প্রশ্ন তুলেছেন, ‘‌হৃদয়বিদারক এই ঘটনার জন্য দায়ী কে?’‌‌ মোদির আকস্মিক একতরফা লকডাউনের ঘোষণা কোটি কোটি মানুষকে ঘরে ফিরতে দেয়নি বলে মন্তব্য করে তিনি বলেছেন, ‘‌মোদি সরকার নিজের দায়িত্ব ভুলে এখন রাজ্যগুলির ওপর দায় চাপাচ্ছে। শ্রমিকদের দুর্দশা নিয়ে সরকারের কোনও আক্ষেপ বা অনুশোচনা কিছুই নেই।’‌
রেলবোর্ডের চেয়ারম্যান ট্রেনে ও রেলস্টেশনে মৃত্যুর প্রসঙ্গে বলেছিলেন, যে কোনও মৃত্যুই শোকের। তবে তার দায় রেলের ওপর চাপিয়ে দেওয়া ঠিক হবে না। তারপর শুক্রবার রেলের তরফে যাত্রীদের ‌কাছে আবেদন করা হয়েছিল, কোনও অসুস্থ বা অন্তঃসত্ত্বা যেন শ্রমিক স্পেশ্যাল ট্রেনে না ওঠেন। ১০ বছরের নীচে, ৬৫ বছরের ঊর্ধ্বের কেউ যেন শ্রমিক স্পেশ্যাল ট্রেনে না ওঠেন। এ বিষয়ে শিবসেনা নেত্রী প্রিয়াঙ্কা চতুর্বেদি বলেছেন, ৮০ জনের মৃত্যুর পর এখন রেলমন্ত্রী পরামর্শ দিচ্ছেন দুর্দশাগ্রস্তদের ট্রেন ভ্রমণ এড়িয়ে চলার।‌ আমার মনে হয়, শ্রমিক ট্রেনকে তিনি হলিডে স্পেশ্যাল ট্রেন মনে করছেন!‌ শিবসেনা নেত্রী বলছেন, গন্তব্যে পৌঁছাতে ট্রেনের দেরি, খাবার, জলের বিষয়ে কোনও কথাই নেই রেলমন্ত্রীর।‌

জনপ্রিয়

Back To Top