তাঁর রাজনীতি তাঁর বাবার মতো নয়। রাজনীতিতে তাঁর আগ্রহও ছিল না। কিন্তু সেই উদ্ধব ঠাকরেই এখন মহারাষ্ট্রের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। জীবন ফিরে দেখলেন স্বরূপ গোস্বামী।

বাবার মতো কার্টুন আঁকার হাত তাঁর ছিল না। তাঁর  সঙ্গী ছিল ক্যামেরা। নিছক শখের ফটোগ্রাফি নয়। একেবারে হেলিকপ্টার ভাড়া করে ওপর থেকে ছবি তোলার নেশা। জঙ্গলে লুকিয়ে আছে বাঘ— জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তোলা এমন একটা ছবি এখনও সযত্নে সাজানো ‘মাতোশ্রী’র ড্রয়িংরুমে। এখনও গর্ব করে সেই সাবেকি ক্যামেরায় হেলিকপ্টার থেকে ছবি তোলার কথা বলেন। তখন ডিজিটাল ক্যামেরার কথা জানতেন না। যেমন জানতেন না, একদিন তিনিই হবেন মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী।
বালাসাহেব ঠাকরে যে ঘরানার রাজনীতির জন্য পরিচিত, তার সঙ্গে হাজার মাইলের ব্যবধান পুত্র উদ্ধব ঠাকরের। জঙ্গিপনা তো দূর, এই ছেলে সকলের সঙ্গে ঠিকঠাক মিশতেও পারতেন না। লাজুক, নম্র, শান্ত। একটু গুটিয়ে থাকতেই পছন্দ করতেন। কাছের লোকেদের বলতেন, ‘রাজনীতি আমার জন্য নয়। এই তো বেশ আছি।’ তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনি সবথেকে ছোট। ক্ষমতার উত্তরাধিকারের অলিখিত শর্ত হল, ব্যাটনটা সচরাচর বড়দের দিকেই আগে আসে। অর্থাৎ সেখানেও তিনি পিছিয়ে। আকস্মিক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হল বড় ভাই বিন্দুমাধবের। মেজছেলে জয়দেবের সঙ্গে বালাসাহেবের কোনওকালেই তেমন বনিবনা ছিল না (‌বরং জয়দেবের স্ত্রী স্মিতাকে বালাসাহেব স্নেহ করতেন। সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে তাঁর নামও ভেসে উঠত)‌। দলের মধ্যেও ছগন ভুজবল, মনোহর যোশি, নারায়ণ রানেরা প্রভাবে অনেক এগিয়ে।
উদ্ধব তখন ক্ষমতার বৃত্ত থেকে অনেকটাই দূরে। বাবরি মসজিদ ভাঙা, মুম্বই বিস্ফোরণ ইত্যাদি আবহে শিবসেনা যখন হিন্দুত্ব নিয়ে সোচ্চার, বালাসাহেব যখন ক্রমশ নিজের দাপট বাড়াচ্ছেন, তখনও এসব ‘‌ঝুটঝামেলা’‌ থেকে গা বঁাচিয়েই চলতেন উদ্ধব। মনে মনে বিশ্বাস করতেন, ‘ইট্‌স নট মাই কাপ অফ টি।’ মায়ের জোরাজুরিতে পরের দিকে কয়েকটা সভায় যাওয়া শুরু করেন। তা–ও নিছক শ্রোতা হিসেবে। ভাষণ দেওয়া তখনও রপ্ত হয়নি। আলাদা করে নজর কাড়ার মতো তেমনকিছু ছিল না। নিজেকে জাহির করার চেষ্টাও নয়। ভিড়ে মিশে থাকতেই স্বচ্ছন্দ বোধ করতেন। দলের অনেকে তাঁকে চিনতেনও না।   
অন্যদিকে, সাত বছরের ছোট খুড়তুতো ভাই রাজ তখনই ‘‌স্বনামধন্য’‌। কাকার মতোই তিনিও হুঙ্কার দেন। মিছিল করেন। হাজার হাজার লোক জড়ো করে জ্বালাময়ী ভাষণ দেন। কাকার ঘরানার সার্থক উত্তরসূরি। এরই ফাঁকে কখনও মাইকেল জ্যাকসনকে এনে, কখনও লতা মঙ্গেশকরের কনসার্ট করে হইচই ফেলে দিচ্ছেন। 
কিন্তু রাজললাট বলতে যা বোঝায়, তা হয়ত রাজের ছিল না। সাংগঠনিকভাবে যতই এগিয়ে থাকুন, ছেলে আর ভাইপোর ফারাকটা সেই থেকেই যায়। বালাসাহেবের অপত্য স্নেহ যে ছেলের দিকেই ঝুঁকে, সেই নির্মম সত্য বুঝতে দেরি হল না রাজের। দলের কার্যকরী সভাপতি হিসেবে তিনিই কিনা উদ্ধবের নাম প্রস্তাব করে বসলেন (‌যদিও পরে বলেছেন, সেটাই তাঁর জীবনের সবথেকে বড় ভুল)‌। অবশ্য তখন রাজের উপায়ও ছিল না। দেওয়াল লিখন অনেক আগেই পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল। নয়ের দশকের শেষদিকে দলের মধ্যে উদ্ধবের নিয়ন্ত্রণ ক্রমশ বাড়ছিল। রাজের অনুগত লোকেদের ছেঁটে ফেলা, নইলে নিজের দিকে টেনে নেওয়া। দু’টি কাজই নিঃশব্দে চালিয়ে গেছেন উদ্ধব। পুরনির্বাচনে নিজের অনুগতদের টিকিট বিলিয়েছেন। সেখানে রাজের অনুগামীরা অনেকটাই ব্রাত্য।
আলাদা দল গড়া ছাড়া রাজের উপায় ছিল না। ২০০৬ সাল নাগাদ শিবাজি পার্কে আলাদা দলের ঘোষণা করলেন তিনি। বালাসাহেব তখন জীবনের পশ্চিম সীমান্তে। কাকার মতোই মারাঠা তাস খেলে বাজার মাত করার চেষ্টা করলেন রাজ। উদ্ধব প্রতিযোগিতার রাস্তায় গেলেন না। জানতেন, ওই খেলায় তিনি পেরে উঠবেন না। বারবার বলেছেন, ‘বাবার স্টাইল আলাদা। তঁাকে যেটা মানায়, সেটা আমাকে মানায় না।’ 
তবে দলের মধ্যে অনেকটাই নিষ্কন্টক তিনি। অন্য দাবিদাররা  কালের নিয়মে হারিয়ে গেলেন। বালাসাহেবের মৃত্যুর পর ‘মাতোশ্রী’র একমেবাদ্বিতীয়ম হয়ে উঠলেন উদ্ধবই। অনেকটা ঈশপের গল্পের সেই কচ্ছপের মতো। যে ধীর অথচ স্থির থেকে দৌড়ে জিতে যায়। 
নির্বাচনী সাফল্য সবসময় আসেনি। বিশেষত, রাজ নতুন দল গড়ার পর ধাক্কা খেয়েছিল শিবসেনা। ২০০৯–‌এর বিধানসভায় চার নম্বরে নেমে যায় তারা। রাজের ‘নবনির্মাণ সেনা’ বিরাট সাফল্য না পেলেও নিজের নাক কেটে উদ্ধবের যাত্রাভঙ্গ করেছিল। ২০১৪ সালে লোকসভায় বিজেপি–র সঙ্গে ঠিকঠাক জোট হলেও বিধানসভায় সেই জোট ভেঙে গেল। সরকার গড়ার সময় অবশ্য ‘‌স্বাভাবিক মিত্র’ শিবসেনা হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল।
গত পাঁচ বছরে দিল্লির সঙ্গে মাঝে মাঝেই বিবাদ হয়েছে উদ্ধবের। কখনও তাঁকে না জানিয়েই সুরেশ প্রভুকে কেন্দ্রে মন্ত্রী করা হয়েছে। আদবানি–‌বাজপেয়িদের কাছে বালাসাহেব যে গুরুত্ব পেয়েছেন, মোদি–‌শাহ জুটির কাছে উদ্ধব তার কণামাত্রও পাননি। লাগাতার উপেক্ষায় ভেতরে ভেতরে একটা ক্ষোভ ছিলই। কখনও তা প্রকাশ্যেও এসেছে। লোকসভা ও বিধানসভায় কম আসনে জোট মানতে হয়েছে কিছুটা ঠেলায় পড়ে। কিন্তু বিজেপি নামক হাতি কাদায় পড়তেই উদ্ধব মেলে ধরেছেন ঝুঁকির তাস। অনেক নাটকীয় ঘটনার পর মিলিজুলি সরকার। কদিন টিকবে, সেটা অবশ্য সময় বলবে। 
দু’টি বিষয় উল্লেখ না করলেই নয়। একটি— ‘সামনা’। শিবসেনার মুখপত্রের প্রতিবেদন এবং সম্পাদকীয় বারবার হয়ে উঠেছে জাতীয় রাজনীতির শিরোনাম। গত দু–‌তিন দশকে আর কোনও দলের মুখপত্র এতখানি প্রাসঙ্গিকতা রাখতে পেরেছে কিনা সন্দেহ। অন্তত মুখপত্রের পরিচিতির ব্যাপারে যে কোনও দলকে টেক্কা দিতে পারে শিবসেনা। এর কৃতিত্ব উদ্ধবের।
দ্বিতীয়ত, গত দু’‌দশকের বেশি সময় ধরে সক্রিয় থাকলেও কখনও ভোটে লড়েননি। চাইলেই লোকসভা বা রাজ্যসভায় যেতে পারতেন। রাজ্যে বা কেন্দ্রে মন্ত্রী হতেই পারতেন। দক্ষিণপন্থী কোনও দলে এই সংসদীয়–‌সংযম সচরাচর দেখা যায় না। হলেন তো একেবারে সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী! সম্ভবত তাঁর রাজনৈতিক জীবনে সবথেকে বড় সাফল্য। আবার সবথেকে বড় ব্যর্থতাও। এতদিনের সংসদীয়–‌সংযম হারাতে হল। কিং মেকার থেকে হলেন ‘মিলিজুলি কিং’। বালাসাহেব হওয়া তো সকলের কম্মো নয়!

জনপ্রিয়

Back To Top