তরুণ চক্রবর্তী, শিলচর, ১৫ এপ্রিল- বাংলা ভাষার স্বীকৃতির দাবিতে অসমের শিলচর একদিন গর্জে উঠেছিল। শহিদ হয়েছিলেন ১১ জন। সোমবার, বাংলা নববর্ষের আয়োজনে অবশ্য তেমন উন্মাদনা চোখে পড়েনি। রাজনৈতিক দলগুলি তাঁদের প্রচারে বাংলা গানের হরেক প্যারোডি ব্যবহার করলেও, বিভাজনের রেখাটা স্পষ্ট। বেদের মেয়ে জোস্‌না থেকে শুরু করে রবীন্দ্রনাথ, ভোট প্রচারে কাউকেই বাদ দেয়নি কংগ্রেস বা বিজেপি। বাদ শুধুই বাঙালিয়ানা। এনআরসি–‌র ভয়ঙ্কর হয়রানিও বিভাজনের রাজনীতি থেকে মুক্ত করতে পারছে না শিলচরকে। 
সোমবার সকালে ঢাক পিটিয়ে শোভাযাত্রায় পা মেলান শহরের গোটাকয়েক বিশিষ্ট নাগরিক এবং বিশাল সংখ্যায় স্কুল পড়ুয়ার দল। উদ্যোক্তা শিলচর পুরসভা। ৭৭ বছরের পুরপ্রধান নীহারেন্দ্র রায়চৌধুরি জানালেন, তিনি ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছেন পয়লা বৈশাখের এই শোভাযাত্রা। তাঁর দাবি, সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক এই আয়োজন। বাস্তবেও ভোটপ্রার্থীদের দেখা যায়নি শোভাযাত্রায়। 
তবে বাঙালিদের মধ্যে রাজনীতিই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় শিলচরে। শহর জুড়ে কান ফাটানো মাইকে নাগরিকত্ব নিয়ে প্রচার চালাচ্ছে বিভিন্ন দল। এমনকী, এসইউসিআই–‌ও সেই প্রচারে শামিল। তৃণমূল কংগ্রেসও প্রার্থী দিয়েছে শিলচরে। কংগ্রেস ও বিজেপির বিরুদ্ধে দ্বিচারিতার অভিযোগ তুলে প্রচারে ঝড় তুলছেন তাঁরাও। তবে আক্ষরিক অর্থেই এদিন সকালে ঝড় উঠল। হঠাৎই কালো মেঘে ঢাকা পড়ে পয়লা বৈশাখের সকাল। প্রবল ঝড়। সঙ্গে বৃষ্টি। তবে বেশিক্ষণ থাকেনি। ঝড় থামতেই শুরু হল শব্দব্রহ্মের নিনাদ। কারও মাইকে বাজছে, ‘তোমায় প্রধানমন্ত্রী রাখবো, ছেড়ে দেবো না।’ আবার কারও মাইক চষে বেড়াচ্ছে, ‘টাকা দেবো বলে মোদি ফাঁকি দিয়েছে।’ পয়লা বৈশাখে প্রচারে খামতি নেই। কংগ্রেস প্রার্থী সুস্মিতা দেব রবিবারই প্রিয়াঙ্কা গান্ধীকে এনে প্রচারে ঝড় তুলেছেন। এদিন তিনি নিজেই সকাল থেকে এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত দৌড়ে বেড়াচ্ছেন। একই অবস্থা বিজেপি প্রার্থীর রাজদীপ রায়েরও। দুবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ঘুরে গেছেন। হিমন্ত বিশ্বশর্মা বা সর্বানন্দ সোনোয়ালরা তো আছেনই। তবু বাঙালির বিভাজনই ফুটে উঠছে প্রচারে।
বরাক উপত্যকা বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির কাছাড় জেলা সভাপতি তৈমুর রাজা চৌধুরির আক্ষেপ, বাঙালিকে দুটি সম্প্রদায়ে ভাগ করা হচ্ছে। ভোটের দেওয়াল লিখনেও সেটা ফুটে উঠছে। তিনি মনে করেন, শিলচরে জমকালো পয়লা বৈশাখের আয়োজনই পারে বাঙালির মৈত্রী সুদৃঢ় করতে। কিন্তু রাজনৈতিক স্বার্থে শিলচরেও বিভাজনের দাগ কাটতে সচেষ্ট স্বার্থান্বেষীর দল। আর বিভাজনের রাজনীতির হাতে বাঙালির বাঙালিয়ানা উধাও শিলচরে। পয়লা বৈশাখ শহর ঘুরেও এটাই স্পষ্ট হয়ে দেখা দিচ্ছে। তবে শুধু তৈমুর রাজা নন, অনেকেই ভাবতে শুরু করেছেন, বাংলাদেশের মতো শিলচরেও সাড়ম্বরে হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায় মিলেই নববর্ষ পালন করার কথা। বাঙালির ঐক্য নিয়ে শুরু হয়েছে ভাবনাচিন্তাও। অসম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য তপোধীর ভট্টাচার্যের মতে, ‘বাঙালির হিন্দু–‌মুসলিম হয় না, বাঙালি বাঙালিই। দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া বাঙালি যদি এটা এখনও না বোঝে, তবে সর্বনাশ হয়ে যাবে।’ বৃহস্পতিবার ভোট। এখন দেখার, এনআরসি–‌তে জর্জরিত শিলচর ‘দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া পরিস্থিতি’ থেকে ঘুরে দাঁড়ায় কি না। সুস্মিতা আশাবাদী।   

‌‌‌কেমন যেন ম্যাড়মেড়ে বর্ষবরণ। শিলচরে। ছবি:‌ প্রতিবেদক

জনপ্রিয়

Back To Top