আজকাল ওয়েবডেস্ক: রজঃস্বলা মহিলাদের জোরাল প্রতিবাদ রাজধানীর বুকে। পুরোহিত স্বামী কৃষ্ণস্বরূপ দাসজির বিতর্কিত মন্তব্যের প্রতিবাদে রাস্তাতেই রান্নাবান্না শুরু করে দিয়েছেন মহিলারা। রান্না হল চাপাটি, সব্জি, শস্য জাতীয় খাবার এবং মিষ্টি। জমে উঠল ‘‌ফিস্ট’‌। ২৫ জন মহিলা এই রান্নায় অংশ নিলেন, আর প্রায় ৩০০ জন মানুষ জমিয়ে খাওয়া দাওয়া করে ফেললেন এই পিকনিকে। এতটুকু পড়ে ভাবছেন হয় তো, এরকমভাবে ‘‌ফিস্ট’‌ করার আলাদা করে প্রয়োজন পড়ল কেন?‌ পড়ল, কারণ কয়েক দিন আগেই গুজরাতের ভুজের স্বামী নারায়ণ মন্দিরের পুরোহিত স্বামী কৃষ্ণস্বরূপ দাসজি বলেছিলেন রজস্বলা অবস্থায় কোনও মহিলা স্বামীর জন্য রান্না করলে তিনি নাকি পরের জন্মে কুকুর হয়ে জন্মাবেন! স্বামী নারায়ণ মন্দিরের অন্যতম পুরনো পুরোহিত এই কৃষ্ণস্বরূপ দাসজি। তাঁর এই বক্তব্যে স্বাভাবিকভাবেই সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্র থেকে সমালোচনার ঝড় উঠে এসেছিল। তিনি আরও যোগ করেছিলেন, যে ঋতুমতী মহিলাদের হাতের রান্না খেলে পরজন্মে সেই পুরুষরা বলদ হয়ে জন্মাবে। এই বক্তব্যের প্রতিবাদেই এই অভিনব ‘‌পিরিয়ড ফিস্ট’‌–‌এর আয়োজন করেছে দিল্লির এনজিও ‘সচ্চি সহেলি‌’‌। দিল্লির সেন্ট্রাল পার্কের ময়ূর বিহারের ফেস টু, পকেট এ–তে এই অনুষ্ঠানে তাঁদের পাশে ছিলেন দিল্লির মহিলা কমিশনের চেয়ারপারসন স্বাতী মালিওয়াল এবং দিল্লির বিধায়ক মণীশ সিসোদিয়া। দুপুর ১২ টা থেকে তিনটে পর্যন্ত হয়েছে এই ‘‌পিরিয়ড ফিস্ট’‌। 
‘‌সচ্চি সহেলি’‌-‌র অন্যতম সদস্য এবং বিশিষ্ট স্ত্রী রোগ বিশেষজ্ঞ ডঃ সুরভী সিং এ বিষয়ে সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছেন, ‘‌মন্দিরের পুরোহিত , রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এঁরা যদি এ জাতীয় মন্তব্য করেন, তখন বাকি সাধারণ মানুষের দায়িত্ব থেকেই যায় সমাজের বাকিদের কাছে সঠিক বার্তা পৌঁছে দেওয়ার। কদিন আগেই গুজরাতের ভুজের সহজানান্দ গার্লস ইনস্টিটিউটে ৬৮ জন ছাত্রীকে লাইন করে দাঁড় করিয়ে খোলানো হয়েছিল অন্তর্বাস। পরীক্ষা করা হয়েছিল তাঁরা ঋতুমতী কি না। অভিযোগ ওঠে, ধর্মীয় রীতি লঙ্ঘন করার কথা বলে ৬৮ জন ছাত্রীর অন্তর্বাস খুলিয়েছেন কর্তৃপক্ষ। এরপর কলেজের অধ্যক্ষ ও অন্য শিক্ষকরা পরীক্ষা করে দেখেন ছাত্রীদের পিরিয়ডস হয়েছে কিনা। এগুলো তো দিনের পর দিন চলতে পারে না।’‌ তাঁর কথায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জ্ঞানের আলো না দেখিয়ে এসবে কেন পিছিয়ে নিয়ে যাচ্ছে দেশকে!‌ তিনি আরও বলছেন, এখনও অনেকেই মনে করেন মেয়েরা ঋতুমতী হলে রান্নাঘরে, পুজোর ঘরে যাবেন না, আচারে হাত দেবেন না, নাচ, শরীরচর্চা করবেন না, এমনকি স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে একটা ঘরেই থাকবেন!‌ এটা কখনও সম্ভব নয়। এতে শারীরিক এবং মানসিক চাপ পড়ে সেই মেয়েটির উপর। অনেক সময়েই গ্রামের দিকে মেয়েদের এই সময় পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার দিকে নজর রাখা হয় না। ফলে তারা অসুস্থ হয়ে পড়ে। পেটে ব্যথা, বমি, স্ত্রী রোগের সমস্যায় ইউটেরাসে সংক্রমণ ইত্যাদিতে ভুগতে হয় তাকে। তাহলে মানুষ আরও একটু সচেতন কেন হচ্ছেন না, প্রশ্ন তুলছেন ডঃ সিং। 
সত্যিই প্রশ্ন তো থাকছেই, একদিকে লোকে টাকা দিয়ে টিকিট কেটে সিনেমা হলে গিয়ে দেখছেন, ‘প্যাডম্যান‌’‌-‌ যে ছবি এক দক্ষিণ ভারতীয় পুরুষের সংবেদনশীলতার কথা তুলে ধরে। অরুণাচলম মুরুগাথন। তিনি স্ত্রীর ঋতু চলাকালীন তাঁর কষ্ট বুঝতে পেরে নানা সামাজিক রোষাগ্নি উপেক্ষা করেই কম টাকায় কী করে স্যানিটারি প্যাড তৈরি করা যায় সে পথ খুঁজে বের করেছিলেন। আবার ২০১৯-‌এই অস্কার পেয়েছে ডকুমেন্টরি ‘‌পিরিয়ড-‌এন্ড এফ সেন্টেন্স’‌। সোস্যাল সাইটে ট্রেন্ড হয়েছে ‘‌রেড ডট চ্যালেঞ্জ’‌-‌এর মতো বিষয়। বিভিন্ন রাজ্যে সরকারি উদ্যোগে ‘‌সুবিধা’‌-‌র মতো প্রকল্প নেওয়া হয়েছে, যেখানে ঋতুমতী মহিলাদের স্কুল কলেজে দেওয়া হচ্ছে স্যানিটারি ন্যাপকিন। তারপরেও ঋতুমতী হলে রান্না করা যাবে না‌‌!‌ তাই রবিবারের এই ‘‌পিরিয়ড ফিস্ট’‌ আলাদা করে অভিনব প্রতিবাদে খবরে উঠে এল জনসচেতনতা আরও একটু বাড়াতে।

জনপ্রিয়

Back To Top