রোহিত ভেমুলা আজ থেকে ঠিক চার বছর আগে এই দিনটিতে আত্মহত্যা করেছিলেন। লিখে গিয়েছিলেন কিছু কথা। আমরা সেই সুইসাইড নোটের একটি বাংলা অনুবাদ আজ প্রকাশ করলাম আজকালের ওয়েবসাইটে। যে প্রবল মানসিক চাপে তিনি আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছিলেন, সে কথা এই চিঠি পড়লেই স্পষ্ট বোঝা যায়।‌

সুপ্রভাত


চিঠিটা যখন আপনারা পড়বেন, আপনাদের আশেপাশে আমি থাকব না। আমি জানি, আপনাদের মধ্যে অনেকেই আমাকে গুরুত্ব দিতেন, ভালবাসতেন, আমাকে একেবারে মাথায় করে রাখতেন। তাই কারোর বিরুদ্ধে আমার কোনও অভিযোগ নেই। আমার সমস্যা শুধু নিজেকে নিয়ে। নিজের শরীর আর আত্মার মধ্যে তৈরি হওয়া দূরত্বকে আমি আরও যেন বুঝতে পারছি। ক্রমে দৈত্য তৈরি হচ্ছি আমি। হতে চেয়েছিলাম একজন লেখক। কার্ল সেগানের মতো এক বিজ্ঞানের লেখক। কিন্তু শেষ পর্যন্ত শুধু এই চিঠিটাই লিখতে পারলাম।
আমি বিজ্ঞান, আকাশের তারা, প্রকৃতিতে ভালবাসতাম। কিন্তু তারপর একদিন মানুষকে ভালবেসে ফেললাম। বুঝিনি প্রকৃতি থেকে মানুষের দীর্ঘদিন আগে এক বিচ্ছেদ ঘটে গিয়েছে। বুঝিনি, আমাদের অনুভূতি ধার করা। প্রেম বানিয়ে তোলা। আমাদের বিশ্বাসেরও রঙ আছে। আমাদের নিজস্বতা প্রমাণিত হয় বানিয়ে তোলা শিল্পে। এসব কিছুই বুঝিনি আমি। কিন্তু বুঝেছি, দুঃখ না পেয়ে ভালবাসা সত্যিই অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। 
একজন মানুষের দাম শুধু মাত্র তাঁর বাহ্যিক পরিচয় ও সামান্য ভবিষ্যতের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। একটি ভোট, একটি নম্বর, এমনই কোনও জিনিস তার পরিচয়। কোনও মানুষকে কখনই একটি চিন্তার আধার হিসাবে দেখা হয়নি। জীবনের এক উজ্জ্বল উপস্থিতিকে কখনও স্বীকারই করা হয়নি। প্রতিটি ক্ষেত্র, যেমন স্কুলে কলেজে, পথে ঘাটে, রাজনীতিতে, জীবনে মরণে, কোথাও না।
আমি জীবনে প্রথমবার এমন চিঠি লিখছি। শেষ চিঠি, জীবনে প্রথমবার। আমায় ক্ষমা করবেন, আমার কথার যদি অর্থ না হয়।
আমার জন্ম একটা দুর্ঘটনার মতো। শৈশবের একাকীত্বের ইতিহাস আমি কখনও কাটিয়ে উঠতে পারিনি। কাটাতে পারিনি অতীতের এক অতি সাধারণ, মমত্বহীন শৈশবকে।
হতে পারে পৃথিবীকে বুঝতে আমি ভুল করেছি। পুরোটাই। ভালবাসা, যন্ত্রণা, জীবন, মৃত্যু, সব বুঝতেই হয়ত আমার ভুল হয়েছে। না, বোঝার কোনও তাড়াও ছিল না। কিন্তু আমি সবসময় দৌড়েছি। একটা জীবন শুরু করার তাগিদে। সেই পথে, কিছু মানুষ দেখেছি, জীবন যাঁদের কাছে অভিশাপ।
 আমার জন্ম একটা দুর্ঘটনা মাত্র। শৈশবের একাকীত্বের ইতিহাস আমি কখনও কাটিয়ে উঠতে পারিনি। কাটাতে পারিনি অতীতের এক অতি সাধারণ, মমত্বহীন শৈশবকে।
না, আমি কষ্টে নেই এখন। আমার কোনও দুঃখ নেই। আমি শূন্য। নিজেকে নিয়ে চিন্তিত নই। আর সেটাই ভয়ঙ্কর। আর সেই জন্যই আমি আজ এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
মানুষ হয়ত আমাকে ভীতু বলবেন। আর স্বার্থপর বলবেন। অথবা বলবেন আমি বোকা। কিন্তু আমাকে কে কি বলল, তাতে আমার কিছু আসে যায় না। আমি মৃত্যু পরবর্তী জীবন, ভূত বা আত্মায় বিশ্বাস করি না। যদি সত্যিই পরকাল বলে কিছু থাকে, তাহলে আমি একদিন তারার দেশে চলে যাবো, আর জানতে পারব অন্য বিশ্ব নিয়ে।
এই চিঠিটা যে পড়ছেন, দয়া করে তিনি আমার হয়ে কয়েকটি কাজ করে দেবেন। আমার এখনও গবেষণার খাতে ৭ মাসের ফেলোশিপ পাওয়া বাকি, মোট ১ লক্ষ ৭০ হাজার টাকা। দয়া করে দেখবেন, সেটা যেন আমার পরিবারের হাতে পৌঁছে যায়। রামজি আমার কাছে ৪০ হাজার টাকা পান, কোনওদিন চাননি কিন্তু দয়া করে ওনার টাকাও শোধ করে দেবেন। 
আমার শ্রাদ্ধ যেন স্বাভাবিক ও সুস্থ ভাবে হয়। জানবেন, আমি বেঁচে থাকার চেয়ে মরে শান্তি পেয়েছি।

‘‌তারাদের ছায়া থেকে’‌

উমা আন্না, ক্ষমা করবেন আপনার ঘর ব্যবহার করলাম বলে।

এএসএ পরিবার.‌.‌.‌ক্ষমা চাইছি সবাইকে নিরাশ করার  জন্য। সবাই বড্ড ভালবেসেছিল আমায়। ভবিষ্যতের জন্য আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ জানাই।

শেষ বারের জন্য।

জয় ভীম।

ওহ, আমি ভুলে গেছি নিয়মলব্ধ কথাটা লিখতে। আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী হয়। কেউ তাঁদের কথায় বা কাজে আমাকে ইন্ধন জোগায়নি। এটা একান্তই আমার সিদ্ধান্ত ও আমিই একমাত্র এই কাজের জন্য দায়ি। আমার বন্ধু, শত্রু, কাউকে আমার মৃত্যুর পর দোষী ঠাওরাবেন না। 

রোহিত ভেমুলা
১৭ জানু্য়ারি
২০১৬

জনপ্রিয়

Back To Top