রাজীব চক্রবর্তী, দিল্লি, ১১ ফেব্রুয়ারি- তাঁর হাসি, টিকলো নাক, হেয়ারস্টাইল, বাচনভঙ্গি, কবজির ঘড়ি, এমনকী, হিলারি ক্লিন্টনের কায়দায় ‘‌থাম্বস-‌আপ’‌–এর আত্মবিশ্বাসের মধ্যে কয়েক দশক আগের ইন্দিরা গান্ধীকে খুঁজে পেল লখনউ শহর। 
কোনও নেত্রীকে একঝলক দেখার, মোবাইলে লেন্সবন্দি করার এমন তাড়না আগে দেখেনি ইন্দিরা-‌পরবর্তী উত্তরপ্রদেশ। বোঝা গেল, রাস্তার দু’‌‌পাশে আমজনতার ভিড়, ঘরের ছাদ, জানালা ও যানজটে আটকে পড়া গাড়ির ভেতর থেকে শহরের লক্ষ লক্ষ চোখ প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভদ্রর মধ্যে ‘প্রিয়দর্শিনী’–কেই খুঁজছিল। 
থেকে থেকে স্লোগান শোনা যাচ্ছিল, ‘‌আ গ্যয়া বদলাওকি আঁধি, রাহুল সঙ্গ প্রিয়াঙ্কা গান্ধী’‌। বিমানবন্দর থেকে ‘নেহরু ভবন’, প্রদেশ কংগ্রেসের কার্যালয়ের দূরত্ব ২৫ কিলোমিটার। এই যাত্রাপথ পার হতে বড়জোর আধঘণ্টা সময় লাগে। সোমবার রাহুল‌–প্রিয়াঙ্কা–‌জ্যোতিরাদিত্যের ছবি-‌সহ ব্যানার, প্ল্যাকার্ড, পোস্টার ও কাটআউটে ঢাকা শহরে সেই পথ পার হতে ঘণ্টাছ’‌য়েকেরও বেশি সময় লেগে গেল। অর্থাৎ, প্রিয়াঙ্কার শুরুটাই হয়ে দাঁড়াল রীতিমতো ‘হিট’। জনতার উচ্ছ্বাসের ঢেউ আছড়ে পড়ছিল প্রিয়াঙ্কার চোখে‌মুখেও। লোকসভা ভোটের বাজারে বাড়তি অক্সিজেন পেয়ে উজ্জীবিত কংগ্রেসও।
রোড–শোয়ে অংশ নিয়েছিল ‘প্রিয়াঙ্কা সেনা’। প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি তথা অভিনেতা রাজ বব্বর ৫০০ কর্মীকে আলাদা করে বেছে নিয়েছিলেন। তাঁদের পরনে ছিল গোলাপি টি-‌শার্ট। তাতে প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর ছবি ও স্লোগান। যে স্লোগান বলছিল, ‘দেশের সম্মানের জন্য প্রিয়াঙ্কা ময়দানে। মন দেব, সম্মান দেব। প্রয়োজনে জীবনও দেব’। এঁরাই ‘প্রিয়াঙ্কা সেনা’–র সদস্য। এর মধ্যে প্রিয়াঙ্কা আসছেন বলে সেজে উঠেছে ‘নেহরু ভবন’। রং চড়েছে দেওয়ালে। এদিন সকাল পর্যন্ত দপ্তরের চেয়ার-‌টেবিল, সোফা, পর্দা ইত্যাদি বদলানোর কাজ চলেছে। 
প্রথমে একটি সুসজ্জিত বাসের ছাদে, পরে নিরাপত্তার কারণে এসইউভি-‌তে সওয়ার হয়েছিলেন রাহুল-‌প্রিয়াঙ্কা। রোড-‌শো চলাকালীন পথে দু-‌একবার ভাষণ দিতে গিয়ে রাফাল ইস্যুতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে আক্রমণ করেছেন রাহুল। এক দলীয় কর্মীর হাত থেকে রাফাল বিমানের মডেল নিয়ে তুলে ধরেছেন। আগাগোড়া ‘‌চৌকিদার চোর হ্যায়’‌ স্লোগান ছিল তাঁর মুখে। আরও একবার অভিযোগ করেছেন, ‘‌মোদিজি চুরি করিয়েছেন। বন্ধু শিল্পপতি অনিল আম্বানিকে ৩০ হাজার কোটি টাকা পাইয়ে দিয়েছেন।’‌ আরও বলেছেন, ‘‌প্রিয়াঙ্কাকে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে আনা হয়েছে শুধু লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি’‌কে পরাস্ত করার জন্যই নয়। উত্তরপ্রদেশে কংগ্রেসের মতাদর্শের মুখ্যমন্ত্রী আনার জন্যও।’‌ 
দপ্তরে পৌঁছে জনতার সামনে প্রিয়াঙ্কা, জ্যোতিরাদিত্য এবং রাজ বব্বরদের রাহুল বলেছেন, ‘‌রাজ্যে সব দলকে মানুষ দেখে নিয়েছে। রাজ্যে কংগ্রেসকে দাঁড় করাতে হলে মাটির সঙ্গে সম্পর্ক আছে, এমন নেতাদের তুলে আনুন। প্রয়োজনে আমাকে ডাকুন।’‌ সপা-‌বসপা জোট নিয়ে বলেছেন, ‘অখিলেশ ও মায়াবতীজিকে আমি সম্মান করি। কিন্তু, কংগ্রেস পুরোদমে নিজের শক্তিতে লড়বে।’‌
এদিন বেলা ১টা নাগাদ রাহুল, প্রিয়াঙ্কারা লখনউ বিমানবন্দরে পৌঁছোন। সেখানে নজরকাড়া ‘‌‌গ্র্যাণ্ড ওয়েলকাম’‌ হয়। এরপর সুসজ্জিত অত্যাধুনিক বাসে আলমবাগ, চারবাগ, হুসেনগঞ্জ, হজরতগঞ্জ, লালবাগ হয়ে ভা‌ইবোনের ‌রোড-শো‌ পৌঁছোয় প্রদেশ দপ্তর ‘নেহরু ভবন’–এ। লখনউ রওনা হওয়ার আগে গতকাল দলের ‘‌শক্তি’‌ অ্যাপে প্রিয়াঙ্কা এক অডিও বার্তায় বলেছিলেন, ‘আগামিকাল লখনউ আসছি। আসুন, সবাই মিলে নতুন ভবিষ্যৎ, নতুন রাজনীতি শুরু করি। এই রাজনীতির অংশীদার হবেন আপনারাও। নতুন এই রাজনীতির পরিসর এমন হবে যেখানে যুব বন্ধু, বোন এবং প্রান্তিক দুর্বল মানুষ-‌সহ প্রত্যেকের কথা শোনা হবে।’ এদিন অবশ্য প্রিয়াঙ্কা বক্তৃতা করেননি। কংগ্রেসের এক নেতা ক’‌দিন আগেই জানিয়েছিলেন, ‘‌অনেকদিন ধরে প্রিয়াঙ্কাকে রাজনীতির ময়দানে নামানোর দাবি উঠছিল। কিন্তু এতদিন পরিবার নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন তিনি। এখন প্রিয়াঙ্কার ছেলে রেহান ও মেয়ে মিরায়া বড় হয়ে গেছে। তাই এখন তাঁর সক্রিয় রাজনীতিতে আসতে আর কোনও বাধা নেই।’‌
এই সফরে প্রিয়াঙ্কার মোট চারদিন উত্তরপ্রদেশে থাকার কথা। প্রসঙ্গত, এদিন সকালে প্রিয়াঙ্কা লখনউয়ের উদ্দেশে রওনা হতেই ফেসবুকে তাঁর স্বামী রবার্ট ভদ্র তাঁকে ‘‌পারফেক্ট স্ত্রী’‌ বলে বর্ণনা করেছেন। একটি সূত্র জানাচ্ছে, আজ, মঙ্গলবার রাজস্থানের জয়পুরে রবার্টকে জিজ্ঞাসাবাদ করবে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট। ‘‌পারফেক্ট ‌স্ত্রী’‌ হিসেবে সেখানে যেতে পারেন প্রিয়াঙ্কা। তবে তারপরেই আবার ফিরে যাবেন লখনউ। নেতা–কর্মীদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। দলের পদাধিকারী, প্রাক্তন সাংসদ, বিধায়ক-‌সহ সমস্ত জনপ্রতিনিধির সঙ্গে কথা বলবেন। প্রতিটি কেন্দ্রের নেতাদের জন্য পৃথক সময়ও বরাদ্দ করা হয়েছে। ‌

 

লখনউয়ের পথে প্রিয়াঙ্কা গান্ধী। সোমবার। ছবি: পিটিআই

জনপ্রিয়

Back To Top