তোমার প্রকাশ হোক। কুহেলিকা করি উদ্ঘাটন, সূর্যের মতন। অভিনেতা প্রকাশ রাজকে নিয়ে লিখতে গিয়ে ভাবলেন অভিজিৎ বসাক
বিরোধিতা প্রকাশিত!‌ এবং প্রবলভাবে। তা সে নিজের রাজ্যে বাম যুবদের সভা হোক বা সোশ্যাল মিডিয়া। 
৪০ ইঞ্চি ছাতির টুইট–বাণে বিদ্ধ হয়েই চলেছেন ৫৬ ইঞ্চি। তবে তিনি একাও নন‌। ‘‌আহত’‌দের তালিকায় নাম থাকছে তাঁর সঙ্গীসাথীদেরও। হামেশা।
কর্ণাটকী অভিনেতার পিতৃদত্ত নাম ছিল প্রকাশ রাই। পরে ‘রাই’ থেকে ‘রাজ’ হয়েছেন। কোন রহস্যে, কে জানে! সৌজন্যে দক্ষিণের বিশিষ্ট চিত্রনির্মাতা কে বালচন্দর। তবে অদ্যাবধি পাঁচটি জাতীয় পুরস্কারবিজয়ী অভিনেতার দেশজুড়ে অসহিষ্ণুতা–বিরোধিতায় কোনও রহস্য নেই। পুরোটাই খোলাখুলি। সোজাসাপ্টা। 
টাটকা ঘটনা বলা যাক। গুজরাতের দলিত নেতা জিগনেশ মেবানি গিয়েছিলেন প্রকাশের কাছে। অভিনয়ের তালিম নিতে আর কী! জিগনেশের ইচ্ছের কথা জেনে রসিক প্রকাশের মন্তব্য ছিল— ‘‌অভিনয় শেখাতে আমি কেন?‌‌ দেশের নটসম্রাটই তো রয়েছেন!‌’‌
নটসম্রাট। অর্থাৎ নরেন্দ্র দামোদরদাস মোদি। 
অভিনয়ে আত্মপ্রকাশ দূরদর্শনের সিরিয়ালে। বিসিলু কুদুরে (‌কন্নড় ভাষায়)‌, গুড্ডাডা ভুথা (‌তুলু এবং কন্নড়)‌। ক্রমে ছোটপর্দা ছেড়ে বড়পর্দা। বেশ কয়েকটি কন্নড় সিনেমায় অভিনয়। সংলাপ বলা এবং অভিনয় ক্ষমতার জেরে ইন্ডাস্ট্রির অনেকের নজরে পড়া। 
অসম্ভব পরিশ্রমী। আর অভিনয়ের প্রতি তীব্র প্যাশন। নইলে কি আর ৩০০ টাকা মাস মাইনেতে পরপর অভিনয় করে যেতেন বেঙ্গালুরুর রবীন্দ্র কলাক্ষেত্রে? যেটি তৈরি হয়েছিল কবিগুরুর জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে। ২ হাজারের বেশি পথনাটিকায় অভিনয় করেছেন। অভিনয় করেছেন 'ডুয়েট' নামে তামিল ছবিতে। পরিচালক? কে বালচন্দর। আবার কে! 
আশ্চর্য নয় যে, ভবিষ্যতে প্রকাশ যখন নিজের প্রযোজনা সংস্থা খুলবেন, তখন তার নামকরণ করবেন তাঁর অভিনীত সেই প্রথম তামিল সিনেমার স্মৃতিতেই— ‘‌ডুয়েট মুভিজ’‌। ১৯৯৮ সালে মণিরত্নমের বিখ্যাত সিনেমা ‘ইরুভর’ তাঁকে তুমুল জনপ্রিয় করে তুলল। সেইসঙ্গে এনে দিল সেরা সহ–অভিনেতার জাতীয় পুরস্কার। এই প্রকাশের লাগাতার যাত্রা শুরু হল মালায়ালম, হিন্দি, তেলেগু এবং ইংরেজি ছবিতে। আর হিন্দির ‘‌ওয়ান্টেড’‌–এ গনিভাই এবং  ‘‌সিংহম’‌–এ জয়কান্ত শিকরের চরিত্র তাঁকে আলাদা পরিচিতি দিল সর্বভারতীয় দর্শকসমাজে। 
বিতর্ক, সাফল্য, পুরস্কার, সংগ্রাম অবশ্য প্রকাশের জীবনে নতুন কোনও বিষয় নয়। তিনি দারুণ অভিনেতা, সফল প্রযোজক ও উপস্থাপক। 
এবং স্পষ্টবক্তা। আপাতত তাঁর সেই পরিচয়টাই প্রথম হয়ে গিয়েছে। 
ঘটনাচক্র বলছে, বছরপাঁচেক আগে ‘ওঙ্গোলে গীথা’ সিনেমায় আদিকেশাভালু চরিত্রের দাবিতে একটি দৃশ্যে প্রকাশকে নগ্ন হয়ে অভিনয় করতে হয়েছিল। এখন সেই তিনিই নিত্যদিন কাপড় খুলে ছাড়ছেন‌ প্রতিপক্ষের। সে প্রতিপক্ষ কখনও বিজেপি, কখনও সঙ্ঘ, কখনও দেশজোড়া গোরক্ষাকর্তারা।
বেঙ্গালুরুতে সাংবাদিক গৌরী লঙ্কেশের হত্যাকাণ্ডের পর প্রধানমন্ত্রী মোদির তুমুল সমালোচনা করেছিলেন প্রকাশ। বেঙ্গালুরুতে ডিওয়াইএফআই–এর (তিনি এই বামপন্থী সংগঠনের সক্রিয় সদস্য) কর্ণাটক রাজ্য সম্মেলনের সভায় প্রশ্ন তুলেছিলেন, ওই ঘটনার পর প্রধানমন্ত্রী নীরব কেন?‌ গৌরীর হত্যাকারীরা এখনও ধরা পড়েনি। সেটা হতাশাজনক। কিন্তু তার চেয়েও হতাশার, যে গৌরীর মৃত্যু নিয়ে উল্লাস হচ্ছে। সেই আনন্দধ্বনি যারা তুলছে, তাদের অনেকে টুইটারে প্রধানমন্ত্রীর ‌‘ফলোয়ার’‌। অনেককে আবার প্রধানমন্ত্রীও টুইটারে ‘ফলো’ করেন। কিন্তু সেই প্রধানমন্ত্রীর চোখ এখন বন্ধ। এমনই সব আক্রমণাত্মক এবং অকুতোভয় বিবৃতি তাঁর। কবে থেকে শুরু, কে জানে। তবে বাক্যবাণের শেষ নেই। 
পদ্মাবত–বিরোধিতায় কর্ণী সেনার স্কুলবাস আক্রমণ নিয়ে কটাক্ষ— ‘‌দেশের শিশুরা ভয় পেয়ে কাঁদছে। নির্বাচিত সরকার মুখ ঘুরিয়ে রেখেছে। বিরোধীপক্ষ দার্শনিকদের মতো প্রতিক্রিয়া দিচ্ছে। নিজেদের ভোটব্যাঙ্কের জন্য শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে ব্যবসা করেও আপনারা লজ্জিত নন?‌’‌ 
মানুষের মনোবল বাড়াতে বার্তা— ‘‌আমরা, দেশের সব নাগরিক একসঙ্গে.‌.‌.‌অনেক বেশি শক্তিশালী তথাকথিত নেতাদের থেকে’‌। 
গুজরাট–গুঁতো—‘‌প্রিয় প্রধানমন্ত্রী, জয়ের জন্য অভিনন্দন। কিন্তু আপনি কি খুশি’‌?
আশার আলো— ‘‌উঠুন। গলার জোর বাড়ান। প্রশ্ন করুন। এটা আমাদের অধিকার।’‌
বব মার্লেও তো অনেকটা একই কথা বলেছিলেন।
কেন প্রকাশ এবং তাঁর এই অকপট প্রতিবাদ আর কঠোর সমালোচনা এত গুরুত্বপূর্ণ?‌ যুতসই ব্যাখ্যা রয়েছে ‘ফার্স্টপোস্ট’–এর প্রতিবেদনে— ‘‌গুরুত্বপূর্ণ, কারণ, তিনি এমন একটা সময় মুখ খুলেছেন, যখন বাকি অনেকে চুপ করে রয়েছেন। গুরুত্বপূর্ণ, কারণ, এখন ট্রোল্‌ড হওয়ার ভয়ে বা পাকিস্তানের ভিসা ধরিয়ে দেওয়ার হুমকিতে অনেকের মুখ দিয়ে কথা সরছে না। সেখানে প্রকাশ মুখ খুলছেন। তিনি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ, তিনি ভোটারদের মনে করিয়ে দিচ্ছেন, নির্বাচিতদের বার্তা দেওয়ার জন্য ভোটই তাঁদের একমাত্র অস্ত্র নয়। অন্ধকার সুড়ঙ্গ শেষে যে আলোর রেখার দেখা মিলবে, সেকথা জানান দিচ্ছেন তিনি’‌। 
সেই সঙ্গে উত্তরপ্রদেশ বা  গুজরাটে পিটিয়ে–মারা সেই দলিতদের বুকে বল যোগাচ্ছেন প্রকাশ। সেই মানুষগুলো ভরসা পাচ্ছেন, তাঁদের মতো প্রান্তবাসীদের হয়ে গলা ফাটানোর জন্য গ্ল্যামার জগতের কেউ একজন তো আছেন।
তেলেঙ্গানার মহবুবনগরে কোন্দারেড্ডিপল্লে গ্রামে কিছু জমি রয়েছে প্রকাশের। দেখাশোনার জন্য মাঝেমধ্যে যেতে হয়। সেই সূত্রেই গ্রামটা ভাল লেগে গিয়েছিল। ঠিক করেছিলেন গ্রামের উন্নয়ন এবং সেখানকার মানুষকে স্বাবলম্বী করে তুলতে কিছু করতে হবে। কয়েক মাস আগে গ্রামটি দত্তক নিয়েছেন প্রকাশ। তার আগে আটমাস ধরে পরিকল্পনা করেছেন করণীয় নিয়ে। আদ্যন্ত পারফেক্টশনিস্ট। তাই গ্রামটি নতুন করে গড়ে তুলতে কাজে লাগিয়েছেন একদল বিশেষজ্ঞকে। আরও কয়েকটি গ্রাম দত্তক নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে প্রকাশের। 
চমৎকার কথা বলেছেন প্রকাশের এক অনুরাগী এবং সমর্থক (‌‘ভক্ত’ নয় কিন্তু)‌ ড্যানিয়েল ইয়েগ্গোনি। অভিনেতা প্রকাশের ফেসবুক প্রোফাইলে গবেষক ড্যানিয়েল লিখেছেন, ‘‌রিল লাইফে খলনায়ক। আগাপাশতলা নায়ক রিয়েল লাইফে। সত্যি কথা বলার জন্য শ্রদ্ধা জানাই। এমন একটি মানুষ একা ১০ হাজার অন্ধ ভক্তের চেয়ে অনেক ভাল’‌। 
প্রশ্ন ছুঁড়ে চলেছেন। প্রতিপক্ষকে বিব্রত করে চলেছেন— ‘হ্যাশট্যাগজাস্টআস্কিং’ তাঁর অভিজ্ঞান। জানার অধিকার রয়েছে সকলের। প্রশ্ন করারও। এম এম কালবুর্গি, নরেন্দ্র দাভোলকর, গৌরী লঙ্কেশরা কি অন্তরীক্ষ থেকে স্মিত হাসছেন? ভাবছেন, খুন হওয়ার ভয় থাকা সত্ত্বেও কেউ একজন প্রশ্ন করার সাহস রাখেন। 
কিছু সময়ের জন্য এগিয়ে থাকতে পারে। কিন্তু সিনেমার গনি ভাই, ‌জয়কান্ত শিকরেরা জেতেনি। জেতে না।

জনপ্রিয়

Back To Top