ভারতে কৃষকরা রুখে দাঁড়িয়েছেন বারবার.‌.‌

আজকাল ওয়েবডেস্ক:‌ এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে রাজধানী দিল্লির সীমান্তে অবস্থান করছেন কৃ্ষকরা। এই চরম ঠান্ডায় পথেই কাটছে তাঁদের দিন–রাত। দফায় দফায় সরকারের সঙ্গে আলোচনা চলছে। রফাসূত্র অধরাই থাকছে। নিজেদের দাবিতে তাঁরা অনড়। নতুন কৃষি আইন প্রত্যাহার করতে হবে। দেশের বেশিরভাগ মানুষ পাশে রয়েছে কৃষকদের। বিদেশি রাষ্ট্রনেতাও মুখ খুলেছেন। 
ভারতে কৃষকদের এই প্রতিবাদ কিন্তু নতুন নয়। সেই ব্রিটিশদের আমল থেকে বারবার মাথা তুলে দাঁড়িয়েছেন কৃষকরা।
• নীল বিদ্রোহ (‌১৮৫৯–৬০)‌:‌ ধানের বদলে জোর করে কৃষকদের নীলচাষে বাধ্য করত ব্রিটিশ সরকার। কখনও লাঠি দেখিয়ে, কখনও আগাম টাকা দিয়ে জাল চুক্তিতে ফাঁসানো হত তাঁদের। ১৯৫৯ সালে নদীয়ায় প্রথম রুখে দাঁড়ান দিগম্বর বিশ্বাস ও বিষ্ণু বিশ্বাস। তাঁদের নেতৃত্বে জোটবদ্ধ হয় কৃষকরা। দীনবন্ধু মিত্র ‘‌নীলদর্পণ’‌ নাটকে লেখেন সেই ভয়ঙ্কর অত্যাচারের কথা। বাধ্য হয়ে ‘‌ইন্ডিগো কমিশন’‌ গঠনে বাধ্য হয় ব্রিটিশ সরকার।
• পাবনা আন্দোলন (‌১৮৭২–৭৬)‌:‌ পূর্ববঙ্গে জমিদারদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে ওঠেন কৃষকরা। বিভিন্ন ছুতোয় কর বাড়াতে থাকে জমিদার। ১৯৫৯ সালের আইনে কৃষকদের জমির অধিকারও কেড়ে নেওয়া হয়। ১৮৭৩ সালের মে মাসে পাবনার ইউসুফজাহি পরগণায় ভূস্বামী লিগ গঠন হয়। এর পর আদালতে জমিদারদের মোকাবিলা করেন কৃষকরা।
• পশ্চিমে কৃষক বিদ্রোহ (‌১৮৭৫)‌:‌ গুজরাটি ও মাড়োয়ারি মহাজনদের অত্যাচারে জর্জরিত হয়ে ওঠেন কৃষকরা। প্রথমে মহাজনদের সামাজিকভাবে বয়কট শুরু করেন কৃষকরা। এর পর মহারাষ্ট্রের পুনে ও আহমেদনগরে সশস্ত্র প্রতিবাদে নামেন তাঁরা। জ্বালিয়ে দেন মহাজনদের ঘর, কাগজপত্র। পুনে সার্বজনিক সভার এম জি রানাডে সমর্থন করেন এই আন্দোলনকে।
• পাঞ্জাবে বিক্ষোভ (‌১৮৯০–১৯০০)‌:‌ মহাজনদের দৌড়াত্ম্য। জমির অত্যাধিক কর। ধনেপ্রাণে শেষ হচ্ছিলেন কৃষকরা। জমি হাতছাড়া হচ্ছিল তাঁদের। রুখে দাঁড়ান। ১৯০০ সালে আইন করে মহাজনদের কাছে কৃষকদের জমি বিক্রি বা বন্ধক রাখা নিষিদ্ধ হয়। 
• চম্পারণ সত্যাগ্রহ (‌১৯১৭)‌:‌ বিহারের চম্পারণে কৃষকদের নীলচাষে বাধ্য করত ইংরেজরা। তিনকাঠিয়া রীতিতে কৃষকদের প্রতি ২০ কাঠার জমির মধ্যে তিন কাঠায় নীল চাষ করতে হত। সেই নীল ইউরোপীয়দের কাছে বিক্রি করতে হত। তাদের বাধা দামে। ১৯১৭ সালে বাবু রাজেন্দ্র প্রসাদ, মজদর উল হক, জে বি কৃপালনি, মহাদেব দেশাইকে নিয়ে চম্পারণে পৌঁছন গান্ধীজি। জেলাশাসক চম্পারণ ছাড়তে বললে মানেননি। কারাবরণ করেন গান্ধীজি। ১৯১৭ সালের জুনে তদন্ত কমিটি গঠন করে ইংরেজ সরকার, যার এক সদস্য ছিলেন মহাত্মা গান্ধী।
• খেড়া সত্যাগ্রহ (‌১৯১৮)‌:‌ গুজরাটের খেরায় অনাবৃষ্টির কারণে ফসলহানি হয়। ব্রিটিশ সরকার কর মকুব করতে অস্বীকার করে। কৃষকদের পাশে পৌঁছে যান মহাত্মা গান্ধী। সঙ্গে বল্লভভাই প্যাটেল। শুরু হয় সত্যাগ্রহ। শেষ পর্যন্ত সরকার কৃষকদের দাবি মানতে বাধ্য হয়।
• মোপলা বিদ্রোহ (‌১৯২১)‌:‌ কেরলের মালাবার জেলায় হিন্দু জমিদারদের হাতে শোষিত হতেন মুসলিম কৃষকরা। ১৯২১ সালের আগস্টে বিদ্রোহ শুরু করেন কৃষকরা। এই নিয়ে সোচ্চার হন খিলাফৎ আন্দোলনকারী নেতারা। ১৯১৬ সাল থেকেই সেখানে চলছিল এই আন্দোলন। শেষ পর্যন্ত যদিও এই আন্দোলন সাম্প্রদায়িক হয়ে ওঠে। গুরুত্ব হারায়।
• বারদোলি সত্যাগ্রহ (‌১৯২৮)‌:‌ জমির রাজস্ব ৩০ শতাংশ বাড়িয়ে দেয় ব্রিটিশ সরকার। রুখে দাঁড়ান কৃষকরা। নেতৃত্ব দেন বল্লভভাই প্যাটেল। ‘‌সর্দার’‌ উপাধি পান। শেষ পর্যন্ত তদন্ত কমিটি বসায় সরকার। কমিটি জানায় এই রাজস্ব বৃদ্ধি অযৌক্তিক।
• তেভাগা আন্দোলন (‌১৯৪৬)‌‌:‌ জোতদাররা ভাগচাষীদের বা বর্গাদারদের উৎপাদিত ফসলের অর্ধেক দাবি করত। ভাগচাষীরা জানিয়ে দেন, উৎপাদিত ফসলের তিন ভাগের একভাগই দেবে জোতদারদের। তাঁদের এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয় ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির কৃষক সংগঠন কিষাণ সভা। বাংলার জমি কমিশনও কৃষকদের দাবিতেই সায় দেয়।