জেদ ধরে দিল্লি এসেছিলেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে এমফিলের ছাত্রী তথা জেএনইউ ছাত্র সংসদের লড়াকু সভানেত্রী। প্রশ্নমালা সাজালেন রাজীব চক্রবর্তী

 রাজনীতির শুরুটা কীভাবে হয়েছিল?‌
ঐশী ঘোষ: বাবা-‌মা দুজনেই রাজনীতি সচেতন মানুষ। বাড়িতে সকালের চা-‌চক্রে রাজনৈতিক আলোচনা শুনে বড় হয়ে ওঠা। মনে মনে স্বপ্ন দেখতাম, মানুষের জন্য কাজ করব। কিন্তু সে তো বড় হয়ে!‌ এখন তবে কী?‌ দেরি না করে ছাত্র রাজনীতিতে ঝাঁপিয়ে পড়ি। তারপর এসএফআই। এখন জেএনইউয়ে ছাত্র আন্দোলন। 
 মেয়ে হওয়ায় বাড়তি কোনও চাপ সামলেছেন?‌
ঐশী: অবশ্যই! শুধুমাত্র মেয়ে বলে পরিবারের একটা দুশ্চিন্তা তো থাকেই। পাশাপাশি, আরও বেশকিছু সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে। এমনিতে সর্বত্রই মেয়েদের সমালোচনা। তির্যক দৃষ্টি। আমি জানতাম, সহজে ছবিটা বদলাবে না। তাই তৈরি ছিলাম। জেএনইউ-‌তে ভর্তি হয়ে কিছুটা হলেও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছি। কারণ, এখানে ছেলেমেয়ের আনুপাতিক হার প্রায় সমান। নিজের কথা অনায়াসে বলা যায়।
 জেএনইউ জয়ের প্রস্তুতিপর্ব কেমন ছিল?‌
ঐশী: যেহেতু ততদিনে দৌলতরাম কলেজে ছাত্র সংসদের ভোটে জিতে ছাত্র রাজনীতিতে হাতেখড়ি হয়ে গিয়েছে, তাই জেএনইউ পর্বে পূর্ব অভিজ্ঞতায় ভর করতে সুবিধা হয়েছে। সবার আগে ছাত্রছাত্রীদের সমস্যাগুলো বুঝে নেওয়া। দাবি আদায়ে অথবা কর্তৃপক্ষের অন্যায় নির্দেশিকার প্রতিবাদে সম্মিলিতভাবে ঝাঁপিয়ে পড়া। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত লড়ে যাওয়াই একমাত্র কৌশল। এছাড়া আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ রাখা। সবটাই রপ্ত করেছি সিনিয়রদের কাছ থেকে। এইভাবেই ছাত্র সংসদে জয় ও ছাত্রছাত্রীদের প্রতিনিধি হয়ে ওঠা।
 ফি-‌বৃদ্ধির প্রতিবাদে জেএনইউ–তে আন্দোলন চালাচ্ছেন। কিন্তু ২০১৯ সালে ১০ টাকা হস্টেল ফি কি সত্যিই সম্ভব?
ঐশী: আন্দোলনকে হেয় করার জন্য দেশজুড়ে অপব্যাখ্যা করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, হস্টেল ফি ১০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০০ টাকা করা হলে অসুবিধা কীসের! আসলে গভীরে না গেলে সমস্যাটা চোখে পড়বে না। শুধু হস্টেল ফি নয়, সঙ্গে আরও অনেক কিছু রয়েছে। সেগুলো কেউ বলছেন না। এতদিন পানীয়জল, বিদ্যুতের খরচ ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে নেওয়া হত না। এখন বলা হচ্ছে, বিদ্যুৎ ও পানীয় জলের খরচও দিতে হবে। এমনকী, হস্টেলের ঠিকা শ্রমিকদের মজুরিও পড়ুয়াদের থেকে নেওয়া হবে। বিশ্বের কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে এই নিয়ম আছে?‌ এখন প্রতি মাসে ছাত্রছাত্রীদের ৩,০০০ হাজার টাকা দিতে হয়। ফি-‌বৃদ্ধি হলে এই খরচ বেড়ে দাঁড়াবে প্রায় ৯,০০০ টাকা। প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে আসা ছাত্রছাত্রীরা কীভাবে এই খরচ জোগাবে?‌ তাছাড়া এসবের বাইরে সেমিস্টারের খরচও তো প্রতি ছ‌’মাস অন্তর দিতে হয়। 
 পশ্চিমবঙ্গে রাজনীতি করার ইচ্ছে নেই?‌
ঐশী: অবশ্যই! যেখানে জন্মেছি সেই অঞ্চলের মানুষের পাশে আগে দাঁড়ানো উচিত। ভীষণ ইচ্ছে বাংলার মানুষের জন্য লড়াই করার। ভবিষ্যতে সুযোগ পেলে করব নিশ্চয়ই। তবে কোন ক্ষেত্র বেছে নেব, সেটা এখনও ভাবতে শুরু করিনি। পড়াশোনা আগে শেষ করতে হবে। আরও জানতে হবে। রাজনীতি বুঝতে হবে। 
 কীভাবে নিজেকে ভবিষ্যতের জন্য তৈরি করছেন?‌
ঐশী: এভাবে বলা কঠিন। কাজ করতে করতেই তৈরি হয়ে যাওয়া। তবে মূল রাজনীতির মতো ছাত্র রাজনীতিতেও তৃণমূলস্তরে মিশতে হয়। মিশছিও। রাজনীতিকদের আত্মজীবনী পড়ছি। প্রতিদিন কতকিছু শিখছি! 
 ভারতীয় রাজনীতিতে নীতি–আদর্শের লড়াই কতটা কঠিন?‌
ঐশী: এ দেশে নীতি–আদর্শের লড়াই ক্রমশ অর্থবল ও বাহুবলের যুদ্ধে পরিণত হয়েছে। এর ফলে রাজনীতি অনেকটাই ম্লান হয়ে এসেছে। কর্ণাটক, মহারাষ্ট্রের দিকে তাকালে বোঝা যাবে কী চলছে। অনেকেই ভেবেছিলেন, কানহাইয়া জিতবেন। কিন্তু জয়ী হননি। ‘‌নতুন ভারতে’ ‌বামপন্থীদের নির্বাচনে জেতা সত্যিই কঠিন। এই পরিস্থিতিতে বামপন্থীদের অস্তিত্ব সঙ্কটে বলে মনে হতে পারে। কিন্তু অবস্থা বদলাতে পারবেন শুধু বামপন্থীরাই। হাল ছাড়লে চলবে না। মানুষের মধ্যে থাকতে হবে। লড়ে যেতে হবে।
 বামপন্থী রাজনীতি। ঘুরে দাঁড়ানোর উপায় কী?‌
ঐশী: ছাত্র ও যুব আন্দোলন থেকে উঠে আসা মুখদের মূল রাজনীতিতে নিয়ে আসাই একমাত্র উপায়। তাছাড়া রাজনৈতিক ইস্যুগুলোকে সাধারণ মানুষের কাছে নিয়ে যেতে হবে। সেই চেষ্টা হচ্ছে। মানুষ আবার বামপন্থীদের ভোট দিচ্ছেন। পশ্চিমবঙ্গের কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বাম ছাত্র সংগঠনগুলো ফিরছে। আরও বেশি চেষ্টা করতে হবে। আমার বিশ্বাস, এমনটা করতে পারলেই আবার সুদিন ফিরবে।
 এ পর্যন্ত কী কী ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে?‌
ঐশী: এইটুকু পথ পেরোতে অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছি। দিনভর আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া আর রাতে পড়াশোনা— এই দুটো একসঙ্গে চালাতে গিয়ে সময়ের অভাবে খিদে ভুলে থাকতে হয়েছে। অন্য ছাত্রীদের মতো নিজের শখ–আহ্লাদ পূরণে আলাদা সময় বের করার কথা ভাবতেই পারি না। আত্মীয়, পরিজনদের সঙ্গে সবসময় যোগাযোগ করতেও পারি না। বাবা–‌মা এখন আমার নিরাপত্তা নিয়ে ভীষণভাবে চিন্তায় থাকেন। একে তো দিল্লি, তার ওপর জেএনইউ। কথা হলেই বলেন, যেন সাবধানে থাকি।
 ‌এখন যদিও আর সেসব নেই‌। কিন্তু জেএনইউ–তে জয়ের পরেই সোশাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া আঙুলের আংটি-‌পাথর ইত্যাদি নিয়ে কী বলবেন?‌
ঐশী: কমিউনিস্ট হয়ে তো জন্মাইনি। আর জন্মেই কমিউনিস্ট হয়ে যাইনি। একটা সমাজে বড় হয়েছি। পরিবারের সদস্যরা বামপন্থায় ভরসা রাখলেও সকলেই ঠাকুর‌–দেবতায় বিশ্বাসী। তাঁরা পুজো করেন। মন্দিরেও যান। তঁারাই আমাকে বড় করেছেন। তাঁদের ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রভাব তো আমার ওপর পড়বেই। তবে ধীরে ধীরে যত পড়াশোনা করেছি, ততই এসব থেকে বেরিয়ে এসেছি।

জনপ্রিয়

Back To Top