তরুণ চক্রবর্তী: অসমের পর কেউ কেউ চাইছেন, বাংলাতেও চালু হোক এনআরসি। এমনকী, অসমে বসবাসকারী বাঙালি ও নেপালিদের চরম দুর্দশার পরও রাস্তাঘাটে সাধারণ মানুষের মধ্যেও ইদানীং এনআরসি নিয়ে কারও কারও উৎসাহ কানে আসে। ধর্মীয় সুড়সুড়ি দিয়ে মানুষকে ভুল বোঝানোর অভিযোগ নতুন কিছু নয়। বাংলায়ও সেটা যে চলছে, রাস্তাঘাটে কান পাতলেই বোঝা যায়। কিন্তু অসমের ভুক্তভোগীরা বলছেন, এনআরসি হলে বাংলার সর্বনাশ হয়ে যাবে। সেটা অবশ্য বুঝতেও পারছেন এখন অনেকেই। কিন্তু তার পরও একটা ছোট অংশের মধ্যে এখনও এনআরসি–‌প্রীতি চোখে পড়ে। তাঁদের এখন সাবধান করছেন অসমের বাঙালিরা।
আপাতদৃষ্টিতে এনআরসি–তে খারাপ কিছু নেই। কিন্তু হয়রানির যে বিষগদাঁত লুকিয়ে আছে, সেটা সামলাতেই হিমশিম খাচ্ছেন অসমের বাঙালিরা। নিজের দেশেই নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে গিয়ে ওঁরা জেরবার। নথিভুক্ত প্রমাণ দিলেই হচ্ছে না, দিতে হচ্ছে সেই নথির প্রমাণও। যেমন ধরুন, আপনার জন্ম ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চের আগে। জমা দিলেন জন্মের শংসাপত্রের প্রতিলিপি। বা, তালিকার কোনও একটি শংসাপত্র। কিন্তু এখানেই থামছে না প্রক্রিয়া। যে–‌সংস্থা সেই শংসাপত্র দিয়েছে, তাদের কাছে তা যাবে পুনরায় যাচাইয়ের জন্য। সেখানকার রেকর্ড দেখে তারা যদি বলে আপনার পাঠানো নথি ঠিক, তবেই গ্রাহ্য হবে সেই সার্টিফিকেট। নতুবা নয়। বহু পুরনো নথির যদি রেকর্ড না থাকে, তা হলেই বিপদ।
এর পর রয়েছে এনআরসি কেন্দ্রে হাজিরার ঝামেলা। মালদার লোককে ‘‌নাগরিক’‌ প্রমাণ দিতে যেতে হতেই পারে আসানসোল। কিংবা বাঁকুড়ার কাউকে ছুটতে হতে পারে বজবজ ও বালুরঘাটে, নিজের খরচে। বংশবৃক্ষের প্রমাণ দেওয়াটাও বেশ কঠিন। ঘটি হলেই যে উতরে যাবেন, তত সহজ নয় বিষয়টি। বাঙালদের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। অসমের অভিজ্ঞতা অন্তত সে–‌রকমই। হিন্দু বা মুসলিম, নাগরিকত্বের ওই প্রক্রিয়ায় কারও রেহাই নেই। ভোটারদের বর্তমান সচিত্র পরিচয়পত্র, আধার কার্ড, পাসপোর্ট, প্যান কার্ড, রেশন কার্ড— সবই মূল্যহীন এনআরসি–‌র কাছে। লাগবে অন্তত ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চের আগেকার নথি। সঙ্ঘ–‌পরিবার অবশ্য এখন ১৯৭১–‌কেও মানছে না। তাদের দাবি ১৯৫১।
যঁারা ’‌৭১–‌এর পরে জন্মেছেন, তঁাদের সমস্যা আরও বেশি। বংশবৃক্ষের প্রমাণ দিতে হবে। হয়রানির সব রকম রাস্তাই খোলা থাকছে এনআরসি প্রক্রিয়ায়। বার বার ডাকা হতে পারে এনআরসি সেবা কেন্দ্রে। কেউ অভিযোগ করলে তো কথাই নেই। এ ছাড়াও সমস্যা রয়েছে ঠিকানা বদলকারীদের। ধরুন আপনি আগে থাকতেন মালদায়। সেখান থেকে বর্ধমান হয়ে এখন দমদম। সে–‌ক্ষেত্রে তিন জায়গাতেই আপনাকে হাজিরা দিতে হতে পারে। অসমে এমনটাই হয়েছে।
হিন্দু বাঙালিদের প্রকাশ্যে ও গোপনে আশ্বাস কম দেননি বিজেপি নেতারা। কিন্তু এনআরসি–‌ছুট ১৯ লাখের মধ্যে বেশির ভাগই হিন্দু বাঙালি। গোর্খারাও রয়েছেন এই তালিকায়। বাংলাতেও একই ছবির পুনরাবৃত্তির সম্ভাবনাই বেশি। তা ছাড়া গরিব অংশের মানুষদের কাছে প্রামাণ্য দলিল নেই বললেই চলে। সেই সঙ্গে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। এই অবস্থায় এনআরসি নিয়ে দুশ্চিন্তায় অনেকেই। তৃণমূল ছাড়াও সুশীল সমাজ একযোগে এনআরসি–‌র বিরোধিতা করলেও, বাংলায় এনআরসি আনতে চাইছে বিজেপি। অসমের বাঙালিদের আশঙ্কা, অসমের মতো সর্বনাশ হতে চলেছে বাংলারও।

জনপ্রিয়

Back To Top