আজকালের প্রতিবেদন: যথারীতি নির্জলা মিথ্যে দিয়ে ভুয়ো ইতিহাস গড়তে চাইছে মোদি সরকার এবং বিজেপি। কিন্তু ইতিহাসের সন, তারিখ সঙ্গ দিচ্ছে না। স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু নাকি রাষ্ট্রপুঞ্জে নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যপদ নেওয়ার হাতে আসা প্রস্তাব পায়ে ঠেলেছিলেন। বরং চীনকে সদস্যপদ দেওয়ার জন্য তিনি নাকি সওয়াল করেছিলেন। অথচ ১৯৪৫ সালে নিরাপত্তা পরিষদ প্রথম তৈরি হওয়ার পর থেকে তার গঠনে কোনও রদবদল হয়নি। তৈরির সময় ভারতকে সদস্য করতে চাওয়ার প্রশ্ন ওঠে না, কারণ ভারত তখনও স্বাধীন দেশ নয়। তা সত্ত্বেও চেষ্টা করেছিলেন ভারতীয় নেতারা, কিন্তু বাগড়া দিয়েছিলেন খোদ ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল। এ সবই নথিভুক্ত, প্রামাণ্য ইতিহাস।
কিন্তু পরেও কি ভারতকে নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যপদ দিতে চাওয়া হয়েছিল?‌ ২৭ সেপ্টেম্বর, ১৯৫৫ লোকসভায় সাংসদ ডঃ জে এন পারেখ–এর এই প্রশ্নের উত্তরে প্রধানমন্ত্রী নেহরুর লিখিত জবাব— সরকারি অথবা বেসরকারি, কোনওভাবে এ ধরনের কোনও প্রস্তাব আসেনি। সংবাদপত্রে এ ব্যাপারে কিছু অনির্দিষ্ট খবর প্রকাশিত হয়েছে, যার কোনও বাস্তব ভিত্তি নেই। নিরাপত্তা পরিষদের গঠন কী হবে, কোন দেশ তার সদস্য হবে, তা নির্দিষ্টভাবে বলা আছে রাষ্ট্রপুঞ্জের একটি সনদে। সেই সনদ সংশোধন না করে নিরাপত্তা পরিষদে রদবদল সম্ভব নয়। কাজেই ভারতের সদস্য হওয়ার প্রস্তাব পাওয়া এবং প্রত্যাখ্যান করার প্রশ্নই ওঠে না। আর এ ব্যাপারে ভারতের ঘোষিত নীতি হল, যে সব দেশের রাষ্ট্রপুঞ্জের সদস্য হওয়ার যোগ্যতা আছে, তাদের সবারই অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত। 
অনুমান করতে অসুবিধে হচ্ছে না, নেহরু মারা যাওয়ার প্রায় ৫০ বছর পরে বিজেপি কোথা থেকে এই অসত্য এবং অনৈতিহাসিক তথ্য খুঁড়ে বের করল। উৎস অবশ্যই ১৯৫৫ সালের ওই ভুল সংবাদপত্র রিপোর্ট। রাষ্ট্রপুঞ্জে সদ্য মাসুদ আজহারকে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী ঘোষণা করার যৌথ প্রয়াসের বিরুদ্ধে ভেটো দিয়েছে চীন।

যার পর রাহুল গান্ধী টুইট করেছিলেন— ‘‌দুর্বল মোদি শি (‌জিংপিং)‌–কে ভয় পান। চীন যখন ভারতের বিরুদ্ধে কাজ করে, তিনি (‌মোদি)‌ একটা কথাও বলেন না’‌। রাহুলের পরের কটাক্ষ ছিল— গুজরাটে শি–র সঙ্গে দোলনায় দোলা, দিল্লিতে শি–কে জড়িয়ে ধরা, চীনে গিয়ে মাথা ঝুঁকিয়ে শি–কে সম্ভাষণ, এই–‌ই হল মোদির চীন কূটনীতি। ক্ষিপ্ত বিজেপি এর জবাব দিতে গিয়ে রাষ্ট্রপুঞ্জে চীনের এই শক্তিশালী অবস্থানের জন্যে নেহরুকে দায়ী করে। টুইট করে— তোমার প্রপিতামহ যদি ভারতকে বঞ্চিত করে সদস্যপদ উপহার না দিতেন, তা হলে চীন নিরাপত্তা পরিষদে থাকতই না!‌ ভারত এখন তোমার পূর্বপুরুষদের সব ভুল শুধরে নিচ্ছে। ব্যাপারটা প্রধানমন্ত্রী মোদির ওপর ছেড়ে দাও। তুমি বরং চুপিচুপি গিয়ে চীনা রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে দেখা করো।
এর পর কেন্দ্রীয় মন্ত্রী রবিশঙ্কর প্রসাদ বিজেপি দপ্তরে সাংবাদিক সম্মেলন ডেকে অভিযোগ তোলেন, ১৯৫৩ সালে ভারতকে নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যপদ দিতে চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু নেহরু তা ফিরিয়ে দেন, বদলে চীনকে সদস্য করার সুপারিশ করেন। যদিও এই রটনা নিয়ে নেহরুর ওই লোকসভার বক্তব্যই বাস্তবে প্রামাণ্যতা পায়। আসলেই রাষ্ট্রপুঞ্জ সনদের সংশোধন না করে নিরাপত্তা পরিষদে রদবদল করা যায় না। আর তা করতে প্রয়োজন রাষ্ট্রপুঞ্জের দুই–তৃতীয়াংশ সদস্য এবং নিরাপত্তা পরিষদের পঁাচ বড় সদস্যের সম্মতি। যে কারণে ভারত দীর্ঘদিন ধরে কূটনৈতিক স্তরে স্বপক্ষে সমর্থন জোগাড় করেও স্থায়ী সদস্যপদ হাসিল করতে পারছে না। ভারত একা নয়, জার্মানি, জাপান, ব্রাজিল এবং উন্নয়নশীল বিশ্বের অনেক দেশই নিরাপত্তা পরিষদে জায়গা পাওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে। কাজেই নেহরু চাইলেন, তাই চীন ভারতের বদলে সদস্যপদ পেয়ে গেল, বিষয়টা আদৌ অত সহজ–সরল নয়। এবং চীন সদস্যপদ পেয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্রশক্তির হয়ে জাপানের বিরুদ্ধে মহা পরাক্রমে লড়াই করার জন্য। নেহরুর দাক্ষিণ্যে নয়। 

জনপ্রিয়

Back To Top