ভোলানাথ ঘড়ই, আগরতলা: ত্রিপুরায় ভোটের আগে প্রচারে যে বিজেপি বলে বেড়াচ্ছিল, এখানে মার্কসবাদের ধ্বংসাবশেষ ছাড়া কিছু থাকবে না, তা নেহাত কথার কথা ছিল না!‌ বিলোনিয়ার পার্কে লেনিনের মূর্তি এখনও মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। পাহারায় পুলিস। এরই মধ্যে পুলিসের প্রহরা এড়িয়ে ভাঙা হল লেনিনের আরও একটি মূর্তি। সাব্রুম মোটর স্ট্যান্ডে থাকা অনেক দিনের মূর্তিটি ভেঙে রাস্তায় ফেলে দেওয়া হয়েছে। আসছে লেনিনের রচনাবলি পুড়িয়ে উল্লাস করার খবর। সিপিএমের অভিযোগ, সদ্য জিতে আসা বিজেপি কর্মীদের কীর্তি এগুলি। আর বিজেপি প্রচার চালাচ্ছে, সিপিএম কর্মীরাই গেরুয়া জামা পরে এ সব করছে। কিন্তু সমস্যা হল, একদিকে খোদ রাজ্যপাল, আরেক দিকে উত্তর–‌পূর্বাঞ্চলে বিজেপি–‌র প্রচারের দায়িত্বে থাকা কেন্দ্রীয় নেতা রাম মাধবের টুইটে যেন মূর্তিভাঙারই অনুমোদন!‌ এরই মধ্য পরিস্থিতি সামলাতে কাল রাতে ফোন আসে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের। বিজেপি–র পক্ষ থেকে দলের কর্মীদের জন্য সঙ্ঘর্ষ, সন্ত্রাস বন্ধের বিবৃতি জারি করা হয়েছে মিডিয়ার মাধ্যমে। তাতে বিশেষ কাজ হচ্ছে না। মঙ্গলবার গোলমালের মাত্রা কিছুটা কমলেও জারি আছে অত্যাচার। ভাঙচুর, পার্টি অফিসে আগুন, হুমকি, বামপন্থীদের এলাকাছাড়া করা সবই জারি রয়েছে ১৪৪ ধারার মধ্যেও। 
সোমবার রাম মাধব মূর্তিভাঙার ছবি পোস্ট করে টুইটারে লিখেছেন, ‘‌মানুষ লেনিনের মূর্তি টেনে নামাচ্ছে.‌.‌.‌,‌ রাশিয়ায় নয়, ত্রিপুরায়। ‘‌চলো পাল্টাই’‌।’‌ একটু বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে বুঝেই বোধহয় পরে মুছে দেন পোস্টটি। আর রাজ্যপাল তথাগত রায় টুইট করেন, নির্বাচিত একটি সরকারের কোনও কাজ পরবর্তী নির্বাচিত কোনও সরকার এসে বদলে দিতেই পারে। প্রশ্ন উঠেছে, সাংবিধানিক পদে থেকে এমন একটি ঘটনাকে উনি সমর্থন বা প্রশংসা করতে পারেন কিনা। বা লেনিন ‌মূর্তি উৎখাত কি নতুন সরকারের সিদ্ধান্ত, যে সরকার এখনও শপথই নেয়নি?‌ রাজ্যপালের টুইট নিয়ে ঢিঢি পড়ে যায়। এই মন্তব্যের তীব্র নিন্দা করেছে এসইউসিআই, সিপিআই (‌এমএল)‌ লিবারেশন, সিপিএম–সহ সমস্ত বিরোধী দল। কাল রাতেই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং টেলিফোনে রাজ্যপাল তথাগত রায় ও ডিজিপি এ কে শুক্লার সঙ্গে কথা বলেছেন। নির্দেশ দিয়েছেন, অবিলম্বে শান্তি স্থাপনের জন্য যা যা করার করুন। রাজ্যপালের মন্তব্য প্রসঙ্গে সিপিএম রাজ্য সম্পাদক বিজন ধর বলেছেন, বদলাতে নিশ্চয়ই পারে। তবে নির্বাচিত সরকার যদি সিদ্ধান্ত নিয়ে লেনিন মূর্তি ভাঙে বা সরিয়ে দেয় তা হলেও আমরা প্রতিবাদ করতাম। অন্যভাবে প্রতিবাদ করতাম। কিন্তু এ তো তা হচ্ছে না। জয়ের উন্মাদনায় মূর্তি ভেঙে দেওয়া হচ্ছে। ৮টি জেলায় প্রায় সমস্ত ট্রেড ইউনিয়ন অফিস হয় দখল নিয়েছে, না হয় ভেঙে আগুন দিয়ে দিয়েছে। রাজ্যপাল বলেছেন, তাঁর বক্তব্যের ভুল ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। বিজেপি–র রাজ্য সভাপতি বিপ্লব দেবের প্রশংসা করেন তিনি। 
এই খবর লেখার সময়ও নতুন করে খবর আসছে আরও ভাঙচুরের। ইন্দ্রনগরে একটি ক্লাবের লাইব্রেরিতে থাকা লেনিনের রচনাবলি–সহ সমস্ত মার্কসীয় বই রাস্তায় ফেলে আগুন ধরিয়ে দিয়ে উল্লাস করেছে। এইসব ঘটনায় রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করারও পরিস্থিতি নেই রাজ্যে। ঋষ্যমুখের বিধায়ক তথা প্রাক্তন মন্ত্রী বাদল চৌধুরি বললেন, ৫ হাজার মানুষের উপস্থিতিতে বিলোনিয়ায় ওই লেনিন মূর্তি প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। প্রতি বছর ২২ এপ্রিল হাজার হাজার মানুষ ওখানে এসে শ্রদ্ধা জানান মানবতার প্রতীক লেনিনের মূর্তিতে। হাজার হাজার মানুষই ফের তা প্রতিষ্ঠা করবে। ’‌৮৮–‌র অত্যাচারেও এমন ঘটনা ঘটেনি, যা এখন এরা করছে। এভাবে মূর্তি ভাঙা যায়। কিন্তু মার্কসবাদ একটা মতবাদ, তা মুছে দিতে পারবে না ওরা।

জনপ্রিয়

Back To Top