রাজীব চক্রবর্তী, দিল্লি: প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আলো নিভিয়ে প্রদীপ, মোমবাতি জ্বালানোর আহ্বানে রবিবার রাতে পাওয়ার গ্রিড ব্যবস্থা থমকে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। সেই আশঙ্কা যে অমূলক নয়, তার প্রমাণ মিলেছে কেন্দ্রীয় বিদ্যুৎ মন্ত্রকের এক বিজ্ঞপ্তিতে। তাতে বলা হয়েছে, ‘‌প্রধানমন্ত্রী রবিবার রাতে ন’‌মিনিটের জন্য যে আলো নেভানোর পরামর্শ দিয়েছেন, তাতে দেশের বিদ্যুৎ গ্রিড ব্যবস্থায় প্রভাব পড়তে পারে। তাই একাধিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। মনে রাখতে হবে, প্রধানমন্ত্রী শুধুমাত্র আলো নেভানোর আহ্বান জানিয়েছেন। পাখা, এসি, ফ্রিজ, কম্পিউটার, টিভি বন্ধ করার প্রয়োজন নেই।’‌ সেইসঙ্গে বিবৃতিতে স্থানীয় প্রশাসনকে পথবাতি জ্বালিয়ে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া হাসপাতাল, থানা এবং জরুরি পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত দপ্তরে আলো জ্বালিয়ে রাখতে হবে। অর্থাৎ, বিষয়টা যাতে শুধু ঘরের আলো নেভানোয় সীমাবদ্ধ থাকে, তা নিশ্চিত করতে চেয়েছে মন্ত্রক।
রবিবার, ৫ এপ্রিল রাত ন‌টায় ন’‌মিনিটের জন্য বাড়ির আলো নিভিয়ে প্রদীপ, মোমবাতি, টর্চ অথবা মোবাইলের ফ্ল্যাশলাইট জ্বালানোর কথা বলেছেন। কিন্তু, বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গোটা দেশে সমস্ত বৈদ্যুতিক বাতি নিভে গেলে, এবং ন’‌মিনিট পর আবার জ্বলে উঠলে বিদ্যুৎ পরিষেবায় মারাত্মক প্রভাব পড়বে। এ ব্যাপারে মোদি সরকারকে সতর্ক করে প্রিয়াঙ্কা গান্ধী টুইটারে লিখেছেন, ‘‌করোনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে গোটা দেশ একজোট হতে রাজি। আশা করি, সঙ্কটের এই সময় বিদ্যুৎ সরবরাহে কোনও বাধা না হয় তা নিশ্চিত করতে পাওয়ার গ্রিড এবং ইঞ্জিনিয়ারদের দুশ্চিন্তার কথাও ভাবছে কেন্দ্রীয় সরকার।’‌ কংগ্রেস নেতা শশী থারুর লিখেছেন, ‘এতে পাওয়ার গ্রিডে বিপর্যয় আসতে পারে। এখন ওঁর (‌মোদির)‌ আহ্বান সফল করতে বিদ্যুৎ দপ্তর ওই দিন রাত ৮টা থেকে ধাপে ধাপে লোডশেডিংয়ের কথা ভাবছে। ধাপে ধাপে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে হবে। এই বিষয়টা মোদিজি ভেবে দেখেননি।’‌ কথাটা কিন্তু কেউই অস্বীকার করতে পারছেন না।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ মানতে গিয়ে গোটা দেশে পাওয়ার গ্রিড ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন রাজ্যস্তরের ‘‌স্টেট লোড ডেসপ্যাচ সেন্টার’‌–‌‌এর কর্তারা। তাঁদের বক্তব্য, রবিবার রাত ন‌টায় ন’‌মিনিট ধরে দেশে সব বাড়ির আলো নিভিয়ে দেওয়া হলে বিদ্যুতের চাহিদায় বড়সড় ঘাটতি হবে। চাহিদায় ঘাটতি হলে স্বাভাবিক ভাবেই অতিরিক্ত বিদ্যুতের পরিমাণ বিপুল মাত্রায় বেড়ে যাবে। এর ফলে প্রবল চাপ পড়বে পাওয়ার গ্রিডের ওপর। আবার ন’‌টা ন’‌মিনিটের পরে সবাই একসঙ্গে আলো জ্বালালে বিপুল চাহিদার জোগান দিতে গিয়ে মুখ থুবড়ে পড়বে পাওয়ার গ্রিড ব্যবস্থাটাই। যার জেরে একাধিক রাজ্য দীর্ঘক্ষণ অন্ধকারে ডুবে থাকতে পারে। কারণ একবার গ্রিড ব্যবস্থা খারাপ হলে ফের তা চালু করতে ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা সময় লাগে। প্রসঙ্গত, গোটা দেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ করার জন্য পাওয়ার গ্রিডগুলি সাধারণত ৩৭০ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ ধরে রাখতে পারে। বিদ্যুতের চাহিদা মোটামুটি ১৫০ গিগাওয়াট। এই হিসেবে তারতম্য ঘটলেই গ্রিড বিগড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। 
পশ্চিমবঙ্গের বিদ্যুৎমন্ত্রী শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় এবং মহারাষ্ট্রের বিদ্যুৎমন্ত্রী নীতিন রাউত–‌সহ অনেকেই বিষয়টি নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। অনেকেই দাবি করেছেন, প্রধানমন্ত্রীর আলো নেভানোর আহ্বান পুনর্বিবেচনা করা উচিত। তবে, পরিস্থিতি যা–‌‌ই হোক, তা সামাল দিতে প্রস্তুত উত্তরপ্রদেশের যোগী আদিত্যনাথের সরকার। রাজ্যে বিদ্যুৎ বিপর্যয় এড়াতে রবিবার রাত ৮টা থেকেই লোডশেডিং করানোর ব্যবস্থা করছে তারা। এরমধ্যে নরেন্দ্র মোদিকে একহাত নিয়েছেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী। টুইটারে করোনা টেস্টিংয়ের একটি গ্রাফ পোস্ট করে তিনি লিখেছেন, ‘‌কোভিড ১৯–‌‌এর সঙ্গে যুদ্ধে ভারতে যথেষ্ট পরীক্ষা করা হচ্ছে না। জনতাকে হাততালি ও টর্চ জ্বালানোর উপদেশ দিয়ে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।’‌ মোদি অবশ্য এসব সমালোচনা গ্রাহ্যের মধ্যে আনছেন না। তিনি আজ আজ একটি ভিডিও পোস্ট করেছেন, যেখানে অটলবিহারী বাজপেয়ীকে ‘‌আও ফির সে দিয়া জলায়ে’‌ আবৃত্তি করতে শোনা যাচ্ছে।

জনপ্রিয়

Back To Top