শুভেন্দু রায়চৌধুরি,দিল্লি: প্রসঙ্গ ছিল রাষ্ট্রপতির ভাষণ। তার ওপর জবাবি ভাষণ দিতে গিয়ে সংসদের দুই কক্ষে রীতিমতো যুদ্ধং দেহি মেজাজে কংগ্রেসকে লাগাতার আক্রমণ করে গেলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। দেশভাগের জন্য কংগ্রেসকে দায়ী করা থেকে শুরু করে জরুরি অবস্থা, সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলকে প্রধানমন্ত্রী হতে না–দেওয়া, অন্ধ্রের আত্মমর্যাদা ও সঞ্জীব রেড্ডির প্রতি অবিচার, ইউপিএ আমলের দুর্নীতি–সহ নানা বিষয় তুলে নিয়ে এলেন তিনি। কিন্তু গত সাড়ে তিন বছরে তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে যে যে অভিযোগ উঠেছে তার একটিরও জবাব দিলেন না প্রধানমন্ত্রী। কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী তাই প্রশ্ন তুলেছেন, মানুষের জীবনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলির ও রাফাল চুক্তির কথা কেন বললেন না প্রধানমন্ত্রী?‌ জনসভায় বিরোধীদের যত খুশি আক্রমণ করুন, সংসদে তো তাঁর দেশবাসীর কাছে জবাবদিহি করা উচিত, মন্তব্য রাহুলের। এর জবাবে বিজেপি–র বক্তব্য, কংগ্রেসের ৫৫ বছরের শাসনের চেয়ে মোদির সাড়ে তিন বছরের শাসন অনেক বেশি সফল। সেই কারণে বিরোধীরা এতটাই ঈর্ষান্বিত যে, তিনি ইতিহাস তুলে ধরলেও তারা সমালোচনা করছে। কংগ্রেসের শশী থারুর আবার এর জবাবে বলেছেন, মোদির বক্তব্য ছিল ভুল তথ্য ও অর্ধসত্যের বিভ্রান্তিকর মিশেল।
ঘটনা হল, গত সাড়ে তিন বছরে প্রধানমন্ত্রীকে সংসদে এমন আক্রমণাত্মক মেজাজে কখনও দেখা যায়নি। বলেন, ‘গণতন্ত্র গান্ধী পরিবারের ট্রেডমার্ক নয়। গণতন্ত্র ভারতের ঐতিহ্য। তাই গণতন্ত্র নিয়ে আমার সরকারের কারও উপদেশের প্রয়োজন নেই।’ অভিযোগ করেন, ‘কংগ্রেস দলই দেশ ভাগ করেছে।’ স্বভাবসিদ্ধ ঢঙে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দশকের পর দশক এই দল দেশের স্বার্থের চেয়ে বড় করে দেখেছে একটি পরিবারের স্বার্থকে। তাঁর বক্তব্য, ১৫টি কংগ্রেস কমিটির মধ্যে ১২টি কমিটিই দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলকে চেয়েছিল। তবুও প্যাটেল প্রধানমন্ত্রী হতে পারেননি। ‘এটা কী ধরনের গণতন্ত্রে?’ প্রশ্ন মোদির। এরপরই বিজেপি সাংসদদের তুমুল হর্ষধ্বনির মধ্যে বলেন, ‘যদি সর্দার প্যাটেল প্রধানমন্ত্রী হতেন, তাহলে কাশ্মীর আজ আমাদেরই থাকত।’ এর মধ্যেই আবার তাঁর আমলে বিরাট কর্মসংস্থানের দাবির সমর্থনে তিনি বলেন, পশ্চিমবঙ্গ, কেরল, ওডিশা ও কর্ণাটকে (‌সব ক’‌টি বিরোধীশাসিত)‌ ১ কোটি মানুষের 
কর্মসংস্থান হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ থেকে এ বিষয়ে কী রিপোর্ট কেন্দ্রে এসেছে, তা অবশ্য এদিন যাচাই করা যায়নি।
প্রধানমন্ত্রী আজ রুষ্ট শরিক দলগুলিকে সন্তুষ্ট করতে চেয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের সময় সভাকক্ষেই বিক্ষোভে শামিল হয়েছিল তেলুগু দেশম সাংসদেরাও। এরপর মোদি টেনে আনেন প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি নীলম সঞ্জীব রেড্ডির প্রসঙ্গ। বলেন, ‘কেউ ভুলতে পারবে না কীভাবে অন্ধের কৃতী সন্তান নীলম সঞ্জীব রেড্ডিকে অপমান করেছিল কংগ্রেস।’ ঋণখেলাপি সমস্যা নিয়ে বলেন, ‘গণতন্ত্রের মন্দিরে দাঁড়িয়ে বলছি, ঋণখেলাপির সমস্যা একান্তভাবেই কংগ্রেসের সৃষ্টি।’‌ সেই সঙ্গে তিনি যোগ করেন, দুর্নীতি ও কালো টাকার বিরুদ্ধে সরকারের অভিযান 
অনেকেরই নাপসন্দ। অটলবিহারী বাজপেয়ীর উক্তিকে স্মরণ করে তিনি বলেন, ছোট মনের কংগ্রেসের পক্ষে কোনও বড় কাজ করা সম্ভব নয়। পরে রাজ্যসভায় মোদি মনে করিয়ে দেন, 
স্বাধীনতার পর দেশে যে আর কংগ্রেসের কোনও প্রয়োজন নেই সে–কথা বলেছিলেন স্বয়ং মহাত্মা গান্ধীই। এরপর আধারের ভাবনা শুরু হয়েছিল বাজপেয়ীর শাসনকালে, মোদির এই দাবি শুনে গোটা সভাকে চমকে দিয়ে কংগ্রেসের রেণুকা চৌধুরি বিদ্রুপের হাসি হাসতে শুরু করেন। ক্ষুব্ধ চেয়ারম্যান বেঙ্কাইয়া নাইডু তাঁকে ভর্ৎসনা করলে, মোদি বলেন, ‘চেয়ারম্যান স্যর, ওঁকে হাসতে দিন। রামায়ণের (‌সিরিয়াল)‌ পর এমন হাসি শুনিনি।’ 
‌আসর জমেছিল ঠিকই। কিন্তু মোদির ভাষণ ঠিক প্রধানমন্ত্রীর জবাবি ভাষণের মতো শোনাল না। হয়ে দাঁড়াল অনেকটা নির্বাচনী জনসভা ভাষণের মতো।

লোকসভায় নরেন্দ্র মোদি।
ছবি: পিটিআই

জনপ্রিয়

Back To Top