আবু হায়াত বিশ্বাস, দিল্লি: ইজরাইল শেখ। ১৩ বছরের কিশোর। নেহরু বিহার ডি ব্লকের পাশের আরাবিয়া তারতিলুল কোরান মাদ্রাসার ছাত্র। ২৩ ফেব্রুয়ারি রাত থেকে তার খোঁজ মিলছে না। বাবা ফিরোজ শেখ, মাদ্রাসার শিক্ষক মহম্মদ রেজি আহমেদ হন্যে হয়ে ছুটেছেন এক থানা থেকে অন্য থানায়, সেখান থেকে হাসপাতালে। কারওয়াল নগর থানায় অভিযোগ লেখাতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছেন। সেখান থেকে দয়ালপুর থানায় ছুটেছেন নিখোঁজ ডায়েরি করতে। পুলিশ বলেছে, হাসপাতালে খোঁজ নিন। তারপরে এক হাসাপাতাল থেকে আরেক হাসপাতাল। কেবল ফিরোজ শেখ নন, ছেলের সন্ধান না পাওয়ায় এভাবেই ছুটে বেড়াচ্ছেন মহম্মদ ইউনুস, মহম্মদ ইলিয়াসরা। কিন্তু নিহত, আহতদের তালিকাও নেই হাসপাতালে। কেউ বুঝে উঠতে পারছেন না কোথায় যাবেন, কী করবেন।
উত্তর–পূর্ব দিল্লির হিংসার ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা যেমন লাফিয়ে বাড়ছে, তেমনই বাড়ছে নিখোঁজের সংখ্যাও। গুরু তেগ বাহাদুর হাসপাতালের মর্গের সামনে এখন নিখোঁজদের ছবি হাতে স্বজনদের ভিড়। হাসপাতালের জরুরি বিভাগ থেকে মর্গে ছুটোছুটি করছেন ওঁরা। দুঃসংবাদ আসতে পারে, আশঙ্কায় রয়েছেন মহম্মদ ইউনুস, মহম্মদ ইলিয়াসরা। তাঁরা বলছেন, সর্বত্র খোঁজখবর চালিয়েও ছেলের সন্ধান মেলেনি। মোস্তাফাবাদের ব্রজপুরির ৬ নং গলির মহম্মদ ইউনুসের ছেলে মহম্মদ ইউসুফ (‌‌২০)‌‌ গত সোমবার থেকে নিখোঁজ। অঝোরে কেঁদে চলেছেন তাঁর পরিবারের লোকেরা। কোনও খবর দিয়ে তাঁদের সাহায্য করারও কেউ নেই। খোঁজ মেলেনি শাস্ত্রী পার্কের সোনুর। ১৬ বছরের সোনু মঙ্গলবার থেকে নিখোঁজ। বাবা মহম্মদ ইলিয়াস, কাকা মহম্মদ ওয়াহিদ আলি, কাকি কামরুন বিবি দু’‌দিন ধরে মর্গের সামনে বসে আছেন। হাতে সোনুর ছবি। সকাল গড়িয়ে বিকেল, অপেক্ষার প্রহর কাটছে। ভাঙছে ধৈর্যের বাঁধ। বছর দুয়েক আগে আদতে বিহারের ভাগলপুরের বাসিন্দা ইলিয়াস কাজের খোঁজে সপরিবার দিল্লি আসেন। রাজমিস্ত্রির কাজ করেন। ওয়াহিদ আলি বললেন, আত্মীয়-‌স্বজনদের বাড়িতে খোঁজখবর নিয়েও হদিশ না মেলায় থানায় লিখিতভাবে জানিয়েছি। কিন্তু, পুলিশ বলছে, হাসপাতালে খোঁজ নিন। অগত্যা, এক হাসাপাতাল থেকে আরেক হাসপাতাল ছুটে বেড়াচ্ছি। অভিযোগ, প্রথম দু’‌দিন নিখোঁজ ডায়েরি নিতেও অস্বীকার করেন স্থানীয় থানার পুলিশ আধিকারিকরা।
এর মধ্যে শুক্রবার সকাল ৮টায় গুরু তেগবাহাদুর হাসপাতালের মর্গের সামনে দেখা গেল, প্রিয়জনের ছবি হাতে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন উত্তরাখণ্ডের বিজয় নেগি, বিগার সিংরা। অশক্ত শরীরে বার বার জ্ঞান হারাচ্ছেন দেবেন্দর সিং। ছেলে দিলবরের খোঁজ না মেলায় গত চারদিনে মুখে দেননি এতটুকু খাবার। দাঙ্গা-‌হাঙ্গামার পর মৃত্যু ও নিখোঁজের সন্ধানে হাসপাতালের পরিবেশ ক্রমেই ভারাক্রান্ত হয়ে উঠেছে। মর্গের সামনে বসে আছেন দু’‌দিন আগে শিব বিহারের হিংসায় প্রাণ হারানো দলবীর সিংয়ের কাকা বিগার সিং। তিনি বললেন, ‘‌২০ বছরের দলবীর কাজের খোঁজে দিল্লি এসেছিল। শিববিহারের একটি হোটেলে কাজ করত। আর্থিক অনটনের জন্যই কাজের সন্ধানে রাজধানীতে আসতে হয়েছিল। গত সপ্তাহেই ফোনে বলেছিল, দিন দশেকের ছুটি নিয়ে বাড়ি আসবে। কিন্তু, হিংসার বলি হতে হবে, তা কল্পনাও করতে পারিনি।’‌ 
এমন পরিস্থিতি দিল্লি পুলিশ, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছিলেন সিলমপুরের আবদুর রউফ। চূড়ান্ত অব্যবস্থার অভিযোগ করে বলছেন, হিংসায় নিহত, আহতদের তালিকাটুকুও রাখা হয়নি হাসপাতালে। না পুলিশ, না হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, কারও হেলদোল নেই। তিনি বলছেন, ‘‌হিংসা থামাতে দিল্লি পুলিশ মোটেই সক্রিয় ছিল না। বরং তারা দাঙ্গাকারীদের মদত দিয়েছে। প্রথম থেকে সক্রিয়তা দেখালে কখনওই এমন ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হত না।’‌‌

 

৬ বছরের আদিবা মর্গের বাইরে। এখনও নিখোঁজ তার বাবা দিলসাদ। শুক্রবার, জিটিবি হাসপাতালে। ছবি: পিটিআই

জনপ্রিয়

Back To Top