রাজীব চক্রবর্তী, দিল্লি, ৩০ মে- অবশেষে পরিযায়ী শ্রমিকের ‘‌নিদারুণ কষ্ট’‌ নজরে পড়েছে প্রধানমন্ত্রীর। 
টানা দু’‌মাস ধরে লকডাউন একের পর এক পর্বে পা রেখেছে। কর্মহীন, অভুক্ত লাখো মানুষ নিঃস্ব হয়ে সেই মার্চের শেষ সপ্তাহ থেকে বড় শহর ছেড়ে গ্রামে ফিরতে শুরু করেছেন। বহু শ্রমিক প্রাণ হারিয়েছেন। মোদি চুপ থেকেছেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় অতিসক্রিয় প্রধানমন্ত্রী কোনও কোনও বিষয়ে এমনই নীরব থাকেন। যেমন বাংলায় আমফান ঘূর্ণিঝড় আছড়ে পড়ার পর দীর্ঘক্ষণ চুপ ছিলেন। কিন্তু, পরিযায়ী শ্রমিকদের নিয়ে আর চুপ থাকা গেল না। 
 দ্বিতীয় মোদি সরকারের প্রথম বর্ষপূর্তিতে চিঠি লিখে দেশবাসীর উদ্দেশে বার্তা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তাতে লিখেছেন, ‘‌লকডাউনে কারও অসুবিধা হয়নি, একথা কোনও ভাবেই বলা যায় না। পরিযায়ী শ্রমিকদের দুঃসহ যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়েছে। নিদারুণ কষ্টে রয়েছেন তাঁরা। ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্পের কর্মী, কারিগর, হকার–‌সহ দেশের একাংশ নাগরিক অত্যন্ত কষ্টের মধ্যে রয়েছেন।’‌ 
এতদিন এ নিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনা চলেছে। বিরোধীরা সরব হয়েছেন। এখন কার্যত গরিব মানুষের কষ্টের কথা স্বীকার করে নেওয়ায়‌ রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেরিতে হলেও পরিযায়ী শ্রমিকের সংখ্যা বুঝতে পেরেছেন প্রধানমন্ত্রী। স্বভাবতই এত বড় ‘‌ভোটব্যাঙ্ক’‌ হাতছাড়া হোক, চাইছেন না তিনি। বিরোধীরা প্রশ্ন তুলেছেন, হঠাৎ সরকারের বর্ষপূর্তির দিনেই কেন পরিযায়ী শ্রমিকদের দুর্দশা নিয়ে ভাবনাচিন্তা শুরু করলেন প্রধানমন্ত্রী? পরিযায়ী শ্রমিক বা দুঃস্থ মানুষগুলোর সমস্যা সমাধানে সরকার এখনও পর্যন্ত কী কী পদক্ষেপ করছে? আর্থিক সহায়তার কী ব্যবস্থা করেছেন প্রধানমন্ত্রী?
বাংলার আমফান ঘূর্ণিঝড় বিপর্যয়ের উল্লেখ করে মোদি বলেছেন, ‘‌কয়েকদিন আগে সাঙ্ঘাতিক ঘূর্ণিঝড় পশ্চিমবঙ্গ ও ওডিশার বেশ কিছু এলাকাকে তছনছ করে দিয়েছে। রাজ্যের মানুষ যেভাবে এই কঠিন পরিস্থিতির মোকাবিলা করেছেন, তা নজির সৃষ্টি করেছে। ওই অঞ্চলের মানুষের সাহস গোটা দেশকে অনুপ্রাণিত করেছে।’‌
এদিকে, উত্তরপ্রদেশের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা বসপা নেত্রী মায়াবতী বলেছেন, ‘‌দ্বিতীয় মোদি সরকারের প্রথম বর্ষপূর্তি উপলক্ষে বিজেপি ঢাক–‌‌ঢোল পেটাচ্ছে। কিন্তু, আমজনতার ন্যূনতম চাহিদা পূরণে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার।’‌ এক বিবৃতিতে ‘‌অসহায় মানুষ, হৃদয়হীন সরকার’‌ শিরোনামে কংগ্রেস বলেছে, ‘এটা ছিল ‌হতাশার বছর। ভয়ঙ্কর ব্যবস্থাপনা এবং মায়াবী কষ্টের একটা বছর।’‌ কংগ্রেস মুখপাত্র অভিষেক মনু সিংভি খোঁচা দিয়ে বলেছেন, ‘‌বছরে দু ‌কোটি কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন নরেন্দ্র মোদি। কিন্তু, গত ৪৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বেকারত্বের সাক্ষী থেকেছে দেশ। সিএমআই–‌‌এর সমীক্ষা অনুযায়ী, ২০১৭–‌‌২০১৮ সালে ২৭.‌১১ শতাংশ বেকারত্বে পৌঁছেছে ভারত।’‌
দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রীর গদিতে বসার ক্ষণটিকে একটি ‘‌সোনার অধ্যায়’‌ আখ্যা দিতেও ছাড়েননি মোদি। বলেছেন, দেশ গত ১ বছরে অনেক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দ্রুত অগ্রগতি হচ্ছে ভারতের। দেশবাসীকে আশ্বাস দিয়েছেন, দেশে অর্থনীতি আবার ঘুরে দাঁড়াবে। দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে। তাঁর কথায়, ‘‌দেশ অনেক চ্যালেঞ্জ ও সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে। আমি দিনরাত কাজ করে চলেছি। নিজের থেকেও দেশবাসীর শক্তি ও দক্ষতায় বিশ্বাস রেখেছি।’‌ আরও বলেছেন, ‘‌বিশ্বব্যাপী অতিমারির কারণে এখন সঙ্কটের সময়। কিন্তু, ভারতীয়দের কাছে এখন দৃঢ় সঙ্কল্পের সময়। মনে রাখতে হবে ১৩০ কোটি মানুষের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ কখনই কোনও প্রতিকূলতার কাছে হার মানবে না।’ প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, অনেকেই আশঙ্কা করেছিলেন করোনাভাইরাস এ দেশে থাবা বসালে সারা বিশ্বের কাছে ভারত মস্ত সমস্যা হয়ে উঠবে। কিন্তু, দৃঢ় আত্মবিশ্বাস ও স্থিতিস্থাপকতার মধ্যে দিয়ে চলেছেন দেশবাসী। ফলে, সেই ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। মোদি বলেছেন, দেশের মানুষের পরিশ্রম ও দক্ষতা ভারতের অন্য দেশের ওপর নির্ভরতা কমাবে এবং দেশকে স্বনির্ভরতার পথে এগিয়ে নিয়ে যাবে। 
লকডাউন মেনে চলার পরামর্শ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘‌প্রত্যেক ভারতবাসীর সরকারি নির্দেশ মেনে চলা উচিত। এখনও ধৈর্য রেখেছে মানুষ। ভবিষ্যতেও রাখবেন৷’ উল্লেখ করেছেন জম্মু–‌‌কাশ্মীর থেকে ৩৭০ ধারা বিলোপের প্রসঙ্গও।‌‌

এখন হঁাটছেন পরিযায়ী শ্রমিকরা। গাজিয়াবাদ থেকে উত্তরপ্রদেশের গ্রামের পথে। ছবি: পিটিআই

জনপ্রিয়

Back To Top