আজকালের প্রতিবেদন, আগরতলা: অরাজকতার আদর্শ নমুনা। বিলোনিয়ায় লেনিন–মূর্তি ভাঙা নিয়ে বিজেপি নেতৃত্বের নানাজনের নানা মত। ‘‌ভারত মাতা কি জয়’‌ স্লোগান দিতে দিতে বিজেপি কর্মী–‌সমর্থকরা বুলডোজার চালিয়ে ভেঙে ফেলে বেদি–সমেত পঁাচ ফুট উচ্চতার ফাইবার গ্লাসের মূর্তিটি। তার পর মূর্তিটির ভাঙা মাথা নিয়ে ফুটবল খেলে বলেও অভিযোগ। এই ভাঙচুরের সমর্থন জানিয়ে টুইট করেছেন ত্রিপুরার রাজ্যপাল তথাগত রায়। ওদিকে ত্রিপুরায় বিজেপি–র জয়ের যিনি নেপথ্য কারিগর, একসময় আরএসএসের ‘‌প্রচারক’‌, সেই সুনীল দেওধর জানিয়েছেন, বিজেপি কোনও ধরনের অসহিষ্ণুতার পক্ষে নয়। লেনিন মূর্তি ভাঙার এই কাজ তঁারা সমর্থন করছেন না। সেই দেখেই বোধহয় আরেক আরএসএস প্রাক্তন, বিজেপি–র সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক রাম মাধব তড়িঘড়ি নিজের টুইটটি মুছে দেন। তিনিও প্রথমে সোৎসাহ সমর্থন জানিয়েছিলেন মূর্তি ভাঙায়।
এর পাশাপাশি ত্রিপুরার নানা জায়গা থেকে রাজনৈতিক সন্ত্রাসের খবর আসছে। বিজয়ী বিজেপি এবং তাদের সহযোগী দল ইন্ডিজেনাস পিপলস ফ্রন্ট অফ ত্রিপুরা–র কর্মীদের আক্রমণের শিকার হচ্ছেন বাম কর্মীরা। সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক বিজন ধর অভিযোগ করেছেন, তঁাদের প্রায় ৫০০ কর্মী, সমর্থক আক্রান্ত হয়েছেন, ১৩৪টি পার্টি অফিসে ভাঙচুর, লুঠপাট হয়েছে, তার মধ্যে ৬৪টি অফিসে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ত্রিপুরা বিজেপি–‌র সহ–‌সভাপতি সুবল ভৌমিক পাল্টা অভিযোগ করেছেন, সিপিএম থেকে বিজেপি–তে যোগ দেওয়া কিছু অজ্ঞাত পরিচয় কর্মী এই কুকীর্তি করে বেড়াচ্ছে। তাদের চিহ্নিত করা গেলেই দল থেকে বহিষ্কার করা হবে। এই প্রেক্ষিতে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী রাজনাথ সিং ত্রিপুরা পুলিসের ডিজি–কে নির্দেশ দিয়েছেন, নতুন সরকার প্রশাসনিক দায়িত্ব না নেওয়া পর্যন্ত রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কড়া হাতে নিয়ন্ত্রণে রাখতে। রাজ্যপাল তথাগত রায়ের কাছেও একই নির্দেশ গেছে। যদিও তিনি লেনিন–মূর্তি ভাঙার ঘটনায় খুবই উৎফুল্ল।      
সাংবাদিক রাজদীপ সরদেশাই এদিন টুইটারে কটাক্ষ করেছেন, ‘‌তা হলে লেনিন মূর্তি ভেঙে উপড়ে ফেলাই ত্রিপুরার নতুন সরকারের প্রথম নজরকাড়া সাফল্য! তবে ত্রিপুরার এই মুহূর্তে অনেক বেশি দরকার কাজের সুযোগ, অর্থনৈতিক উন্নতি। পুরনো মূর্তি ভেঙে, বা নতুন মূর্তি বানিয়ে তার সুরাহা হবে না।‌’‌ মূর্তি ভাঙার ঘটনার সঙ্গে আফগানিস্তানের বামিয়ানে বুদ্ধমূর্তি ধ্বংসের তুলনা টেনেছেন অনেকেই। পাহাড়ের গা খোদাই করে তৈরি বামিয়ান বুদ্ধের বিশাল মূর্তি ২০০১ সালে কামান দেগে ভেঙে ফেলেছিল তালিবান জঙ্গিরা। ১৪ বছর পর মূর্তিটি পুনর্নির্মিত হয়। টুইটারে একজন বলেছেন, ‘পছন্দ না হলে লেনিনের মূর্তি অন্যত্র সরাতেই পারেন। কিন্তু এজন্য সভ্য সমাজের নিয়ম অনুসরণ করা যেত। মাথা দিয়ে ফুটবল খেলারই বা কী প্রয়োজন ছিল? তাহলে যারা বামিয়ানের বুদ্ধমূর্তি গুঁড়িয়ে দিয়েছিল, সেই অশিক্ষিত তালিবানের সঙ্গে আমাদের পার্থক্য কী?’ একজন প্রশ্ন করেছেন, ‘লেনিনের মূর্তি ভেঙে দিলে কি ত্রিপুরার যুবকদের চাকরি দেওয়া যাবে।’ আপ নেতা আশুতোষ লিখেছেন, ‘এটা কি ভারতের বামিয়ান–মুহূর্ত? তালিবান যেমন আফগানিস্তানে করেছিল, সেই ধারাই গড়ছে বিজেপি। আগামীকাল কেন্দ্রে ও রাজ্যে যদি কংগ্রেস বা বাম সরকার গঠিত হয়, তা হলে কি আরএসএস ও বিজেপি–‌র সমস্ত প্রতীক ধ্বংস করে দেওয়া হবে? এটা বিপজ্জনক, পশ্চাদপদ, হীনম্মন্যতার ফল।’ জনৈক অনিরুদ্ধ শর্মা লিখেছেন, তিনি বামপন্থী নন বা আরএসএস–বিজেপির মতাদর্শে বিশ্বাসী নন। কিন্তু মূর্তি ধ্বংস আফগানিস্তানের বামিয়ানের স্মৃতিই ফিরিয়ে আনল।
উজমা নামে একজনের পোস্ট:‌ ‘‌ভারত মাতা কি জয় স্লোগান গিয়ে লেনিনের মূর্তি ভেঙে ফেলল বিজেপির উগ্র সমর্থকরা। বামিয়ানে বুদ্ধমূর্তি এভাবেই ভেঙে ফেলেছিল তালিবান। অন্য কোনও মতাদর্শের জায়গা নেই। জঙ্গলের রাজত্বে স্বাগত।’‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top