দাউদ হায়দার: যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক সাহিত্যে পড়াকালীন, বিশ্ববিদ্যালয়েরই মেইন হস্টেল থাকতুম। ১৯৭৭ সালের কথা বলছি। হস্টেলের সামনে প্রিন্স আনোয়ার শাহ রোড রাস্তার একদিকে যাদবপুর, আরেকদিকে যোধপুর পার্ক। যাদবপুরের পোস্টাল কোড বত্রিশ। যোধপুর পার্কের আটষট্টি। জানা ছিল যোধপুর পার্কে বহু খ্যাতনামা মানুষের বাস। এবং মধ্যবিত্তের। 
একদিন ঘনায়মান সন্ধ্যায়, লোডশেডিংয়ের দরুন, লাইটপোস্টের বাতি আলোহীন, এক মহিলা রাস্তা পার হচ্ছিলেন। একটি সাইকেল ধাক্কা মারে, পড়ে যান, সজোরে চিৎকার, চালক সাইকেল রেখে উধাও। রাস্তায় লোকজন নেই। ভদ্রমহিলার চোখে মুখে রক্ত, শাড়ি অনেকটাই ছিঁড়ে গেছে। চিৎকারের পরে কাতরাচ্ছেন। উপায় না দেখে, তাঁর দুই হাত কাঁধে নিয়ে, কোনও রকমে হস্টেলের ওয়েটিংরুমে নিয়ে এলুম। ইতোমধ্যে ছাত্রদের ভিড়। কেউ বললেন, হাসপাতালে নিয়ে যেতে, কারোর পরামর্শ সামনেই (‌যোধপুর পার্কে)‌ ডাক্তারের চেম্বার, ‘‌ডাক্তারকে ধরে আনতে।’‌ এবং সত্যিই ধরে আনা হল। নিয়ে এলেন চার/‌পাঁচজন, প্রত্যেকে হস্টেলের ছাত্র। ডাক্তার বললেন, ‘‌মূর্ছা গেছেন।’‌ জ্ঞান হারানো ও মূর্ছার মধ্যে কী পার্থক্য অজানা। শরীরের দু’‌একটি জায়গায় বিশ্রী রকম ক্ষত। ডাক্তার ওষুধ দিলেন, ব্যান্ডেজ বাঁধলেন। ফি না নিয়ে নির্দেশ, ‘‌ওঁর বাড়িতে খবর দিন।’‌ 
মহা মুসিবত। ভদ্রমহিলার নাম কী, কোথাকার, বাড়ি কোথায় অজানা, খবর দেওয়া অসম্ভব। আমরা প্রমাদ গুনছি, পাহারাও দিচ্ছি। কী করণীয় শলাপরামর্শ চলছে। প্রায় দু’‌ঘণ্টা পরে, রাত আটটা উত্তীর্ণ, ভদ্রমহিলা চোখ খুললেন। আরও আধ ঘণ্টা পরে খুব ক্ষীণ কণ্ঠে জানান তাঁর ছেলের নাম, বাড়ির ঠিকানা। যোধপুর পার্কেই। গেলুম। ছেলে বাড়িতেই। উৎকণ্ঠা। মা কেন ফিরছেন না। বললুম। হন্তদন্ত হয়ে এলেন। ফিরলেন মা–‌‌কে নিয়ে। রিকশায়। ল্যাটা চুকে গেল। না, চোকেনি। তিনদিন পরে ভদ্রমহিলার ছেলে হস্টেলে এসে খোঁজ করছেন, ‘‌যে ছাত্রটি আমার মা–‌‌কে বাঁচিয়েছে, সে কোথায়।’‌ কয়েকজনকে জিজ্ঞাসার পরে জানলেন কে উদ্ধারকারী। ছেলের চেহারা রাশভারী। একে লম্বাচওড়া, তাই, কণ্ঠভারী। জানতে চান, নাম কী?‌‌ ভয়ে–‌ভয়ে বলি। শুনে কিয়ৎক্ষণ চুপ। অতঃপর, ‘‌মেনি থ্যাঙ্কস্‌।’‌ করমর্দন না করে প্রস্থান। 
পরদিন সন্ধ্যায় আরেক কাণ্ড। ছেলে এসেছেন, সঙ্গে বৌ। বললেন, ‘‌মা তোমাকে ডেকেছেন। চলো।’‌ ইতঃস্তত করছি। ছেলের বৌয়ের কথা, ‘‌আপত্তি না থাকলে আমাদের সঙ্গেই চলুন।’‌ গেলুম। ভদ্রমহিলা বিছানায় শুয়ে। ঘরেই ডাকছেন, ‘‌দাঁড়িয়ে কেন, আমার বিছানার পাশেই বসো। তুমি নারায়ণ, আমাকে বাঁচিয়েছ, নামটি তবে মোছলমানের।’‌ সম্বোধন করলুম ‘‌পিসিমা।’‌ রেহাই নেই। প্রশ্ন করেন, ‘‌মোছলমানরা পিসিকে কী বলে?‌’‌— গোটা ভারতের বা বিশ্বের মুসলমানরা পিসিমাকে কি সম্বোধন করে, বলতে অপারগ। বাংলাদেশে বলি ‘‌ফুফু’‌ বা ‘‌ফুম্মা।’
‘‌বাহ!‌’‌ পুত্রবধূ বললেন, ‘‌হিন্দি ছবিতে ‘‌ফুম্মা, ‘‌ফুফু’‌ শুনেছি।’‌ ভদ্রমহিলা বললেন, ‘‌তুমি নারায়ণ। আচ্ছা, আমাকে ফুম্মা বলো। এর মধ্যে মা আছে।’‌
— যে ভাষায় বলছিলেন, এই লেখা হুবহু নয়, তাঁর উচ্চারণ উত্তর কলকাতার। 
মাস তিনেকের মধ্যেই, ‘‌ফুম্মার’‌ ন্যাওটা হয়ে যাই। প্রায়–‌সন্ধ্যায় ফুম্মার বাড়িতে ডিনার। একই টেবিলে। 
ন্যাওটা হওয়ার বিপদ সমূহ। তিনি একা, নিঃসঙ্গ। পুত্র ও পুত্রবধূ চাকরি করেন। ফেরেন বিকেলের পরে। তাঁর সঙ্গে কথা বলার কেউ নেই। পুত্র ও পুত্রবধূ সপ্তাহান্তে পার্টিতে যান কিংবা কয়েকদিনের ছুটিতে কলকাতার বাইরে। তো, তাঁর সব প্যাঁচাল শুনতে হয়। 
নিজের বৃত্তান্ত জানান। আদি বাড়ি কলকাতার বাগবাজারে। লেখাপড়া বিদ্যেসাগরের বর্ণপরিচয়ের ‘‌পেরথম’‌ ভাগ। আট বছর বয়সে বিয়ে, স্বামীর বয়স‌ কুড়ি। আমরা কুলীন, খাঁটি বামুন, ভটচায। স্বামী ‘‌সগ্গে’‌ গেছেন ২৯ বছর বয়সে। 
ফুম্মার বয়স কত, জিজ্ঞেস করি না। আন্দাজ করাও দূর অস্ত। কথায়–‌কথায় জানান একদিন, ‘‌তিন সন্তানের জননী। দীননাথ সবচেয়ে ছোট’‌ (‌তাঁর কনিষ্ঠ সন্তান। বয়স পঞ্চাশের বেশি)‌।
দীননাথের আশ্রয়েই তাঁর জীবন এখন। ছেলের প্রশংসায় বিগলিত। বৌমার ব্যাপারে মৌনী। দীননাথের স্ত্রী দেবলীনা। সুভাষিণী। চাকরি করেন। তৃতীয়বার যখন গেছি, বিকেল গড়িয়েছে, দীননাথ–‌দেবলীনা বেরোচ্ছিলেন। দেবলীনা জানতে চান, ‘‌তিন ঘণ্টা সময় আছে তো?’‌‌ এই প্রশ্নে বিস্ময়, জিজ্ঞেস করি, ‘‌কেন?‌’‌ খোলসা না করে উত্তর, ‘‌আমরা একটু রাতে ফিরব।’‌ নিশ্চয় রহস্য আছে উত্তরে। টের পেলুম ঘণ্টাখানেক পরেই। ফুম্মার দাঁড়িকমাহীন ননস্টপ গল্প। গল্পের আগামাথা নেই, শুরু ও শেষ বোঝা দুষ্কর, অনর্গল ‘‌বকে’‌ যাচ্ছেন, মাঝে–‌মাঝে ‘‌বুজেচ, ছেই তখন.‌.‌.‌’‌। উত্তরে কলকাতার আদি টান, সেই সঙ্গে ‘‌ছ’‌ধ্বনি কণ্ঠে, এও বাহুল্য। ‘‌ছেই তখন’‌ সে কবে, প্রশ্ন করারও ফাঁকফোকর নেই। বুঝলুম, দেবলীনা কেন বলেছিলেন তিনঘণ্টা সময় আছে কি–‌না। বুঝলুম ফুম্মা কথা বললে শ্রোতা নেই। ধরে নিই, দেবলীনা যখন বৌ হয়ে বাড়িতে আসেন, কিছুদিন পরে নিশ্চয় কান ঝালাপালা। এখন আর শুনতে চান না হয়তো। হতে পারে একই কথার পুনরাবৃত্তি। বুঝলুম, ফুম্মা বড় নিঃসঙ্গ। বলতে চান ফেলে আসা অতীত, সুখদুঃখের কথামালা। নিঃসঙ্গতার প্রহর। 
সাড়ে তিন ঘণ্টা কথা বলেও ক্লান্তি নেই তাঁর, ঘুমও আসে না চোখে। ছেলে–‌বৌ ফিরলেন, দেবলীনা মৃদু হেসে বললেন, ‘‌আপনার ফুম্মা কিছু খেতে দেননি?‌’‌ ফুম্মার কথা, ‘‌ভুলেই গেচিলাম, আরেকদিন এসে লুচি খেও বাবা।’‌
ফুম্মার স্নেহ ‘‌জগৎ জননীর’।‌ যতদিন কলকাতায় ছিলুম, পুজোয় ধুতি ও পাঞ্জাবি উপহার দিয়ে বলতেন, ‘‌নারায়ণবাবার জন্যে কিনেচি।’‌
তিন যুগের বেশি ইয়োরোপের বাস, মাসে অন্তত একবার ফুম্মাকে ফোন করি। ফোন ধরলে ছাড়ে না। প্রায়শ কেটে দিই। বলি, ‘‌আপনার ফোনে গোলমাল, কথা ঠিক শোনা যাচ্ছে না।’‌ ইত্যাদি।
গত সপ্তাহে ছিল ফুম্মার ৯০ জন্মদিন। জানতুম, এক কথায় শুভেচ্ছা জানানো শেষ হবে না। তাঁর কথা শুনতে হবে। শুরু করেন বলতে। ‘‌আচ্চা বাবানারায়ণ, তোমাদের ওকানে কী ছিত শুরু হয়েচে?‌ জবাব শোনার গরজ নেই। অতীত স্মৃতি কচলান। সব কথা স্পষ্ট নয়। বলেছিলেন, তাঁর কিশোরী বয়সে বাগবাজারে, শীতের সময় কাশ্মীর থেকে ‘‌মোচলমানরা’‌ সাল (‌শাল)‌ বিক্রি করতে আসত। শুধু ‘‌সাল’‌ নয়, নানা ফলও। প্রতি বছর। বাড়ির মেয়ে–‌বৌঝিরা বেছে বেছে ‘‌সাল’‌ কিনত। বাকিও দিত।’‌ তিনি যখন ভবানীপুরে, ভবানীপুর থেকে যোধপুর পার্কে, একজন শাল বিক্রেতা, বয়স্ক, পূর্বপরিচয় সূত্রে ছয় বছর আগেও এসেছেন। কিনেছেন। গত কয়েক বছর কাশ্মীর থেকে শাল বিক্রেতা কলকাতায় প্রায়–‌অদেখা, বাড়ি–‌বাড়ি যায় না, আগে যেমন যেত। কলকাতায় শুধু নয়, গোটা ভারতেই। এখন দোকানে–‌দোকানে যে সব কাশ্মিরী শাল, ‘আ‌ছল (‌আসল)‌ নয়, ভেজাল। কলে তৈরি।’‌ ফুম্মা আরও বললেন (‌অস্পষ্ট হলেও)‌, তাঁর ছেলে ও বৌমা বিজেপিকে ভোট দিয়েছেল। দিয়ে একী কাণ্ড!‌!‌ বিজেপি ভারত ‘‌ভাগ করেচে।’‌ কাশ্মীরের ‘‌আছল সাল’‌ আর ভারতের কোথায়ও পাওয়া যাবে না। কাশ্মীরি ‘‌সালের ইতিহাছ এখন ‘‌ছিতি’‌ (‌স্মৃতি)‌। কাশ্মীরি আসল ‘‌সাল’‌, কাশ্মীরি আসল পশমি কার্পেট আর ভারতে পাওয়া যাবে না। কাশ্মীরি সাল, কার্পেট সব ইতিহাছ হয়ে গেল।  তোমাকে জেটি (‌যেটা)‌ দিয়েচিলেম ‘‌ছযতনে’‌ (‌সযত্নে)‌ রাখিও।‌

জনপ্রিয়

Back To Top