সংবাদ সংস্থা,মেঙ্গালুরু: নতুন ভারতবর্ষের নবীন প্রজন্মের মুখ, সিপিআই নেতা কানহাইয়া কুমারের পক্ষে জনসমর্থন যত বাড়ে, ততই বেড়ে যায় তঁাকে অপদস্থ করার চেষ্টা। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নানা কুযুক্তিতে তঁাকে বেকায়দায় ফেলার চেষ্টা হয়, আর প্রতিবারই বুদ্ধিদীপ্ত, যুক্তিনির্ভর জবাবের তলোয়ারে সেসব কুযুক্তি হাসতে হাসতে কচুকাটা করেন কানহাইয়া। ফের এক ঘটনা ঘটল মেঙ্গালুরুতে। সিপিআই নেতা বিভি কক্কিলয়ার জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে ‘ইউথ অ্যাট ক্রসরোডস’ শীর্ষক এক অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়েছিল। সেই অনুষ্ঠানে অন্যতম বক্তা ছিলেন জেএনইউ প্রাক্তনী কানহাইয়া কুমার। অনুষ্ঠানের শেষপর্বে দর্শকদের সঙ্গে কানহাইয়ার সওয়াল–জবাব চলছিল। একেবারে পিছনের সারি থেকে এক ছাত্রী উঠে দঁাড়িয়ে দীর্ঘ একটি প্রশ্ন সাজান কানহাইয়ার উদ্দেশে। তবে কোনও রাখঢাক করেননি মেয়েটি। নিজেকে আধুনিক ভারতীয় যুব সম্প্রদায়ের একজন প্রতিনিধি হিসেবে দাবি করে শুরুই করেন ‘‌জয় শ্রীরাম’‌ বলে। তার পর দাবি করেন, আপনি একবার ‘‌জয় হিন্দ’‌ বলুন!‌ একবার অন্তত ‘‌ভারতমাতা কি জয়’‌ বলুন। এর পর এক দীর্ঘ অগোছালো বক্তব্য, যার মূল প্রতিপাদ্য— আপনি কেন এক দেশ, এক জাতি, এক আইন, এবং এক নেতার তত্ত্বে বিশ্বাসী নন?‌
অতি দীর্ঘ প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত ধৈর্য ধরে শোনেন কানহাইয়া। মেয়েটির কথা শেষ হতে সহাস্যে বলেন, ‘‌আপনি বলেন জয় শ্রীরাম, আর আমি বিহারের যে মিথিলা অঞ্চলে জন্মেছি, বড় হয়েছি, সেখানে লোকে বলে— জয় সীতারাম। সবসময় দুজনের নাম একসঙ্গে বলা হয়। প্রতি বছর একটা সময় অযোধ্যা থেকে কমবয়সি ছেলেরা রামের বরযাত্রী হয়ে মিথিলায় আসেন। একজন আসেন রাম সেজে সীতাকে বিয়ে করে নিয়ে যেতে। সীতা চলে যাবে, সেই দুঃখে, ক্ষোভে মিথিলার মানুষ সেই রামকে গালিগালাজ করেন। আমি এই সংস্কৃতির মধ্যে বড় হয়েছি।’‌
‘‌এক দেশ এক নেতা’‌ সম্পর্কে কানহাইয়ার পরের বক্তব্য— ‘‌বিশ্বসংসারে সব কিছু কি একের নিয়মে চলে?‌ এই যে আমি একজন লোক, আমার জন্ম হয়েছে কিন্তু দুজন নারী–পুরুষ, আমার মা এবং বাবা, এই দুজনের সম্মিলনে। আমাদের যে জাতীয় সংসদ, সেখানে দুটি কক্ষ। লোকসভা আর রাজ্যসভা। সংসদ একটাই, কিন্তু কোনও একজন নেতা তার অধিপতি নন, বরং ৫৪৩ জন সাংসদ সমানভাবে সংসদের অধিকারী। আমাদের সংবিধান একটি, কিন্তু তিনশোরও বেশি ধারা তার অন্তর্গত। আপনারা যখন এক দেশ এক নেতার কথা বলেন, আপনারা ভুলে যান যে ভারতের ঐক্য আসলে তার বহুত্ব। আমি সেই ঐক্যবদ্ধ ভারতের জয়ধ্বনি করি। আপনি ‘জয় শ্রীরাম’, ‘জয় হনুমান’, যা খুশি বলতে পারেন। আপনার সেই স্বাধীনতা আছে, যে স্বাধীনতা আপনাকে দিয়েছে ভারতের সংবিধান। সুতরাং আপনাকে অনুরোধ, মাঝে মাঝে সেই সংবিধানের নামেও জয়ধ্বনি দেবেন।’‌‌ 
কানহাইয়ার এই জবাব শুনতে শুনতে মাঝে মাঝেই উচ্ছ্বাসে মুখরিত হয়ে ওঠেন বাকি ছাত্রছাত্রীরা।  
এর পর কানহাইয়া ওই ছাত্রীকে বলেন, ‘‌আমি আশা করি আপনি একদিন পিএইচডি করবেন। যদি করেন, আপনাকে অনুরোধ করব, আমাদের দেশে রামায়ণের যত লিখিত ভাষ্য আছে, সেই নিয়ে করুন। আমাদের দেশে রামায়ণের ৩০০-রও বেশি ভাষ্য আছে। হিমাচলে যে রামায়ণ আছে, তাতে সীতা রাবণের কন্যা। রাম বিনা অনুমতিতে সীতাকে বিয়ে করেন বলেই রাবণের সঙ্গে তঁার বিরোধ হয়।’‌
ভারতমাতার নামে জয়ধ্বনি দেওয়ার কথা চ্যালেঞ্জের সুরে বলেছিল মেয়েটি। কানহাইয়া হাসতে হাসতেই বলেন, ‘‌আপনার দেশ যেমন আপনার, আপনার মা–ও আপনারই। সেই মা–কে কী ভাবে ভালবাসবেন সেটা আপনার ব্যক্তিগত ব্যাপার। কিন্তু আপনি যখন রাস্তা দিয়ে হাঁটবেন, তখন যদি কেউ কোনও রঙের পতাকা নিয়ে এবং মুখে কোনও ধ্বনি নিয়ে আপনার সামনে আসে এবং মায়ের প্রতি ভালবাসার প্রমাণ দিতে বলে, আপনার জবাব কী হবে? এই দেশ আমাদের। আমরা এই দেশকে ভালবাসি। আমাদের কাছে ভালবাসাটা দেখানোর জিনিস নয়। আমরা আমাদের অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে ভালবাসি।’‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top