আজকাল ওয়েবডেস্ক: দিল্লির ভিভিআইপি এলাকায় পর্তুগাল পাসপোর্ট এবং ভুয়ো নামেই রাত কাটিয়েছে জৈশ–ই–মহম্মদ প্রধান মাসুদ আজহার। অথচ কেউ টের পর্যন্ত পায়নি। ঘুরে বেড়িয়েছিল উত্তর ভারতের বিভিন্ন জায়গায়।
১৯৯৪ সালের জানুয়ারিতে মাসুদ আজহার প্রথম ভারতে আসে। তখন সে দিল্লির চাণক্যপুরি এলাকার হোটেলে রাত কাটিয়েছিল। তার পর্তুগাল পাসপোর্ট দেখে অভিবাসন দপ্তরের আধিকারিকদের মাসুদ জানিয়েছিল যে সে গুজরাটি। কাশ্মীরে গিয়েই ধরা পড়েছিল জৈশ জঙ্গিগোষ্ঠীর প্রধান মাসুদ আজহার। তদন্তকারীদের জেরার মুখে তখন মাসুদ স্বীকার করেছিল যে সে কী ভাবে ভারতে এসেছে, কোথায় ছিল, কাদের সঙ্গে দেখা করেছে। সম্প্রতি সেই তথ্যই সামনে এসেছে। তথ্যে জানা গিয়েছে, দিল্লির জনপথ হোটেলে থাকত মাসুদ। লখনউ, সাহারানপুর এবং ইসলামি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দারুল–উলুম দেওবান্দেও যায় সে। তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, ২০০১ সালে সংসদ এবং সম্প্রতি পুলওয়ামা হামরার নেপথ্যে থাকা জৈশ প্রধান মাসুদ আজহার বাংলাদেশ সফরের পর ভুয়ো পর্তুগাল পাসপোর্ট নিয়ে এ দেশে প্রবেশ করেছিল।   
গ্রেপ্তার হওয়ার পর মাসুদ তদন্তকারীদের বলেছিল, ‘‌আমি দু’‌দিন ঢাকায় থাকার পর বাংলাদেশের বিমানে করে দিল্লি আসি। সেটা ছিল ১৯৯৪ সালের ২৯ জানুয়ারি। আন্তর্জাতিক ইন্দিরা গান্ধী বিমানবন্দরের অভিবাসন দপ্তরের অফিসাররা আমায় দেখে বলে যে আমাকে পর্তুগিজদের মতো দেখতে নয়। আমি তাঁদের বলি যে আমি আসলে গুজরাটি। এটা শোনার পর তাঁরা আমার পাসপোর্টে অনুমোদন দিতে বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করেননি।’ এরপর মাসুদ বলে, ‘‌আমি ট্যাক্সি ভাড়া করে ট্যাক্সি চালককে ভালো হোটেলে নিয়ে যাওয়ার জন্য বলি। আমাকে ট্যাক্সি চালক চাণক্যপুরির অশোক হোটেলে নিয়ে যায়। ওখানেই আমি থাকতে শুরু করি।’‌‌ ‌
তদন্তকারীকে জৈশ প্রধান জানায়, ওই রাতেই অশোক হোটেলে মাসুদের সঙ্গে দেখা করতে আসে হরকত উল–আনসার জঙ্গি গোষ্ঠীর সদস্য আবু মেহমুদ এবং আসরফ দার। এই আসরাফ কাশ্মীরি বলে জানা গিয়েছে। মাসুদ বলে, ‘‌দেওবন্দিদের কবরে শ্রদ্ধার্ঘ জানানোর জন্য আমি আসরফকে দেওবন্দ নিয়ে যাওয়ার জন্য বলি। আমায় এরপর আসরফ মারুতি গাড়ি করে দেওবন্দ নিয়ে যায়। সঙ্গে ছিল আবু মেহমুদ। আমরা সেখানে দারুল–উলুমে রাত কাটাই। দেওবন্দে প্রার্থনার পর আমরা পরের দিন সকালে গুনগো এবং সেখান থেকে উত্তরপ্রদেশের সাহারানপুরে যাই।’‌ সাহারানপুরে তাবলিক–উল–জামাত নামে একটি মসজিদে ৩০ জানুয়ারির রাতটা কাটায় মাসুদ। গোয়েন্দাদের দাবি, যেখানে যেখানে গিয়েছে সেখানে নিজের আসল পরিচয় গোপন রেখেছিল মাসুদ।
ওই বছরের ৩১ জানুয়ারি মাসুদ ফের দিল্লিতে ফিরে আসে এবং সাহারানপুর থেকে দিল্লিতে ফিরে আসার আগে পাঞ্জাবের ফাজিলকা জেলার জালালাবাদে একটি খান জি–তে গিয়েছিল মাসুদরা। এরপর সেই একই গাড়িতে করে দিল্লিতে ফিরে আসে তারা। দিল্লিতে আসার পর মাসুদ কনট প্লেস এলাকার জনপথ হোটেলে থাকতে শুরু করে। এখান থেকে ৯ ফেব্রুয়ারি শ্রীনগরে যাওয়ার বিমানের টিকিট ছিল তার। মাসুদ তদন্তকারীদের জানায়, শ্রীনগর যাওয়ার আগে তার হাতে অনেকটাই সময় ছিল তাই ওই সময়ের মধ্যে আরও কয়েকটা জায়গা ঘুরে আসার পরিকল্পনা করে সে। লখনউয়ে আলি মিয়াঁর মাদ্রাসায় যাওয়ার পরিকল্পনা করে মাসুদ। তবে এ বার ভাড়ার কোনও গাড়ি নয়, বাসে চেপেই ৬ অথবা ৭ ফেব্রুয়ারি মাসুদ ওই মাদ্রাসায় পৌঁছায়। এখানেও নিজের পরিচয় গোপন করেছিল সে। তবে আলি মিয়াঁর সঙ্গে দেখা হয়নি তার। ফের বাসে দিল্লিতে ফিরে আসে। তবে এ বার করোল বাগের কাছে শিসমহল নামে একটি হোটেলে ওঠে মাসুদ। দিল্লির যে ক’টি হোটেলে ছিল সব কটিতেই নিজেকে পর্তুগিজ নাগরিক ভ্যালি অ্যাডাম ইসা বলেই নাম রেজিস্ট্রার করায় সে।  
মাসুদ তদন্তকারীদের জানায়, ৮ ফেব্রুয়ারি সে নিজামুদ্দিনে তাবলিক–উল–জামাত সেন্টারে যায়। কিন্তু কারও সঙ্গে দেখা করেনি সেখানে। তবে ফেরার পথে নিজামউদ্দিন থেকে ১২টা কম্পাস কিনেছিল কাশ্মীরের জঙ্গিদের উপহার দেওয়ার জন্য। জেরায় মাসুদ এমনটাই জানিয়েছিল। ৯ ফেব্রুয়ারি সেই আশরফ দারই মাসুদকে শ্রীনগরে নিয়ে যায়। সেখানে লাল বাজারের কাসমিয়া মাদ্রাসায় একটা ঘর আগে থেকেই ব্যবস্থা করে রেখেছিল আশরফ। ওই দিন সন্ধ্যায় হরকত–উল–জিহাদ অল–ইসলামি জঙ্গিগোঠীর সদস্য সাজ্জাদ আফগানির সঙ্গে দেখা করে মাসুদ। পরদিন সকাল অর্থাৎ ১০ ফেব্রুয়ারি আফগানির সঙ্গে মাটিগুন্দে যায় মাসুদ। সেখানে পাকিস্তানের সব জঙ্গি একত্রিত হয়েছিল। মাটিগুন্দ থেকে আফাগানি এবং ফারুক মানে দুই জঙ্গির সঙ্গে ফেরার পথে তাদের গাড়িতে সমস্যা হয়। তখন একটা অটোরিক্সায় উঠে অনন্তনাগের দিকে যাওয়ার সময় পথেই তাদের আটকায় সেনা। সেনাদের দেখেই ফারুক গুলি ছুড়তে শুরু করে। ফারুক পালাতে সক্ষম হলেও ধরা পড়ে মাসুদ ও আফগানি।
জেলেই পাঁচবছর কাটে জৈশ প্রধান মাসুদের। ১৯৯৯ সালে মাসুদকে ছাড়ানোর জন্য ভারতের যাত্রীবাহী বিমানকে হাইজ্যাক করে কন্দহরে নিয়ে যায় জঙ্গিরা। যাত্রীদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনতে মাসুদকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় ভারত সরকার। তার পরে ভারতে একের পর এক হামলা চালিয়েছে মাসুদ। সংসদে হামলা, উরি এবং সবশেষে এ বছরে পুলওয়ামায় হামলা চালায় জৈশ। যার জেরে ৪০ জওয়ানের মৃত্যু হয়। বার বারই মাসুদকে আন্তর্জাতিক জঙ্গি হিসেবে ঘোষণা করার দাবি জানিয়েছিল ভারত। কিন্তু প্রতি বারই বাধা হয়ে দাঁড়ায় চীন। পুলওয়ামা হামলার পর ভারত এ বার অনেক দেশকেই পাশে পেয়েছিল। রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদে মাসুদকে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদীর তকমা দেওয়ার জন্য জোর দাবি করে সকলে। কিন্তু এ বারও সেই চিনই সেই প্রচেষ্টায় জল ঢেলে দিল।


‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top