নন্দগোপাল পাত্র: এই আবিদ সুরতি? ইনি হলেন ১৯৯৩–‌এ জাতীয় পুরস্কার জয়ী একজন লেখক, চিত্রশিল্পী ও কার্টুনিস্ট। ৪৫টি উপন্যাস, ১০টি ছোট গল্প সমগ্র এবং ৭টি নাটক–‌সহ ৮০টিরও বেশি বইয়ের লেখক। লেখেন গুজরাটি ও হিন্দিতে। জন্ম ৫ মে, ১৯৩৫, গুজরাটে। ছোটবেলায় বাবা মায়ের সঙ্গে চলে আসেন মুম্বই–‌এর ডোংরি এলাকায়। পড়াশুনো জে জে স্কুল অফ আর্ট–এ। লেখালিখি শুরু ১৯৬৫ থেকে। জল সঞ্চয়ের সঙ্গে আবিদ সুরতির সম্পর্ক কোথায়? মুম্বই–‌এর ডোংরি এলাকায় থাকার সময় দেখতেন মা সাকিনা বেগম ভোর থেকে প্রতিদিন জলের আশায় লাইন দিতেন। শৈশবের সেই স্মৃতি সবসময় তাঁকে তাড়া করে বেড়িয়েছে। পরিবারের জীবন রক্ষার জন্য মায়ের এভাবে জল সংগ্রহ তাঁকে জল সঞ্চয়ের কথা ভাবায়। ২০০৭–‌এ তৎকালীন রাষ্ট্রসঙ্ঘের মহাসচিব বুত্রোস বুত্রোস ঘালির এক বক্তব্য ‘২০২৫–‌এ বিশ্বের ২৫টি দেশ জলসঙ্কটের মুখোমুখি হবে’ সুরতির মনকে নাড়া দেয়। একই সময়ে সংবাদপত্রের এক প্রতিবেদন— প্রতি সেকেন্ডে এক ফোঁটা জল কোনও কল থেকে পড়লে মাসে ১০০০ লিটার জল নষ্ট হয়। এরপর গড়ে তোলেন ‘ড্রপ ডেড ফাউন্ডেশন’ নামে এক সংস্থা। যার একমাত্র সদস্য তিনিই। উদ্দেশ্য পানীয় জলের সমস্যা নিরসন ও মানুষকে সচেতন করা। সংস্থার স্লোগান ঠিক করেন, ‘প্রতিটি জলের বিন্দু সঞ্চয় কর অথবা বেছে নাও মৃত্যু’। সুরতি গর্বের সঙ্গে সবসময় তাঁর টি–‌শার্টে এই স্লোগান লিখে পরতে শুরু করেন। ২০০৭–‌এ শুরু করলেন বিন্দু জল সঞ্চয়ের জন্য প্রথম পদক্ষেপ মুম্বই–‌এর মীরা রোডের ফ্ল্যাটগুলোয় জলের কল সারানোর। প্রতি রবিবার এক সহকারীকে সঙ্গে নিয়ে যেতেন এক একটি অ্যাপার্টমেন্টে। অ্যাপার্টমেন্টের প্রতিটি ফ্ল্যাটে গিয়ে জানতে চাইতেন, ‘ফ্ল্যাটের কলগুলো ঠিক আছে তো? কোনও কল থেকে ফোঁটা ফোঁটা জল পড়ছে না তো?’। কল ঠিক থাকলে ওই ফ্ল্যাট মালিকের কাছে দুঃখ প্রকাশ করে চলে যেতেন অন্য ফ্ল্যাটে। যদি কলের সমস্যা থাকে, তাদের কলটি নিজ উদ্যোগেই তিনি সারিয়ে দিতেন বিনামূল্যে। জানা গেছে, প্রথম বছরেই প্রায় ৪.১৪ লক্ষ লিটার জল বেঁচেছিল ১,৬৬৬ ফ্ল্যাটের ৪১৪টি লিক হওয়া জলের ট্যাপ থেকে। এই কাজের জন্য সুরতি এক সহকারীকে দৈনিক পাঁচশো টাকা দিতেন। এ ছাড়াও ছিল কলের জন্য রাবার গ্যাসকেট, যাতায়াতের খরচ। 
অভাব দেখা দিল অর্থের। এমন সময়ে হিন্দি সাহিত্যে অবদানের জন্য উত্তরপ্রদেশের ‘হিন্দি সাহিত্য সংস্থান’ থেকে পেলেন এক লক্ষ টাকার পুরস্কার। পরবর্তী সময়ে এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুর দেওয়া দশ হাজার টাকা, পঞ্চাশ হাজার টাকার মহারাষ্ট্র সরকারের ‘লাইভ টাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড’ সুরতিকে লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সুরতি পাল্টে ফেলেছেন তাঁর কাজের ধরনও। এখন তাঁর টিমের তিন সদস্য বহুতল ফ্ল্যাটের কমিটির কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে কবে, কখন এখানে আসবেন তার পোস্টার দিয়ে আসেন। মুম্বইয়ে বেড়েছে তাঁর ফ্যানও। সেই তালিকায় আছেন শাহরুখ খান, শেখর কাপুর প্রমুখ। তবে তহবিলের অভাবের জন্য তাঁর কাজ মীরা রোড এলাকায় আটকে আছে।
ইতিহাস বলছে জলের অভাবে বহু নগরী–‌জনপদ মরুভূমি হয়ে গেছে। অনেক অঙ্গরাজ্য উজাড় হয়ে গিয়েছে অথবা স্থানান্তরিত করতে হয়েছে। আর এখন দেশজুড়ে পানীয় জলের সঙ্কট চলছে। সেই সঙ্কট যে কতটা তীব্র হতে পারে তা জানতে পারছি মিডিয়ার কল্যাণে। শহর হোক বা শহরতলি বা গ্রামীণ এলাকা যেখানে নল বাহিত জল সরবরাহ করা হয় সেখানে বেশিরভাগ কলেরই মুখ নেই। কত সংখ্যক কলের মুখ নেই, তার কোনও হিসেব জনস্বাস্থ্য কারিগরি বিভাগ, পুরসভা বা পঞ্চায়েতের কাছে আছে বলে মনে হয় না। প্রতিদিন এভাবে কত জল নষ্ট হয়, তারও কোনও নির্দিষ্ট হিসেব নেই। এবং তা নিয়ে কখনও সমীক্ষাও হয়েছে কিনা জানা নেই।
আমরা অনেকেই প্রত্যক্ষ করি, যখন জল আসে, সেই সময় মুখবিহীন কলগুলি থেকে অবিরাম জল পড়েই যায়। অবশ্যই ব্যবহারকারীদের সচেতনতার অভাবই দায়ী। সেক্ষেত্রে প্রশাসন আর কী করতে পারে? আবার এও দেখা গেছে রাস্তার কলগুলোয় মুখ লাগিয়ে দেওয়ার এক–দু’মাসের মধ্যে তা ভেঙে বা খুলে ফেলেন স্থানীয় বাসিন্দারাই। এক্ষেত্রে প্রয়োজন আবিদ সুরতির মতো মানসিকতা সম্পন্ন মানুষদের। যাঁরা রাস্তায় ঘুরে ঘুরে জলের অপচয় রোধে নিজে উদ্যোগী হয়ে কলগুলো ঠিক করে দেবেন। নীতি আয়োগের সতর্কতা, চেন্নাই, বেঙ্গালুরুর বাস্তব পরিস্থিতি জানার পর কুর্নিশ জানাতেই হয় ‘ওয়াটার ওয়্যারিয়র’ আবিদ সুরতিকে। যিনি জল সঞ্চয়ের কাজটা শুরু করেছিলেন দু’দশক আগে থেকেই। শেষ করব আজ থেকে একশো বছর আগে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লিখে যাওয়া কথা দিয়ে যা আজকের সময়ে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক, ‘জল জিনিসটা নিত্য–‌প্রয়োজনীয়, অথচ ইহার দাম নাই। কিন্তু যদি কখন ঐটির একান্ত অভাব হয়, তখন রাজাধিরাজও বোধ করি একফোঁটার জন্য মুকুটের শ্রেষ্ঠ রত্নটি খুলিয়া দিতে ইতস্ততঃ করেন না।’‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top