সংবাদ সংস্থা
মুম্বই, ৮ আগস্ট

রহস্যের পারদ ক্রমশ চড়ছে সুশান্ত সিং রাজপুতের মৃত্যু ঘিরে। শুক্রবারই ইডি সুদীর্ঘ জেরা করেছেন সুশান্তের প্রেমিকা রিয়া চক্রবর্তীকে। সুশান্তের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক এবং টাকার লেনদেন বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় তাঁকে। সঙ্গে ছিলেন রিয়ার ভাই সৌভিক চক্রবর্তী, তাঁর বিজনেস ম্যানেজার শ্রুতি মোদি এবং চ্যাটার্ড অ্যাকাউনটেন্ট রীতেশ শাহ। তাঁদের প্রত্যেককে আলাদা আলাদাভাবে জেরা করা হয়। টানা প্রায় ৯ ঘণ্টার সেই জেরায় রিয়ার বক্তব্যে সন্তুষ্ট হতে পারেননি ইডি অফিসাররা। তাই ১১ আগস্ট ফের জেরার জন্য তলব করছে রিয়াকে। রিয়ার ভাই সৌভিককে শনিবার ফের জেরা করেন ইডির আধিকারিকরা। দুপুর ১২–১৫টা নাগাদ ইডির মুম্বই অফিসে পৌঁছন সৌভিক। ইডির অফিসাররা মনে করছেন, সুশান্তের যে দুটি সংস্থার সঙ্গে রিয়া এবং তাঁর ভাই যুক্ত ছিলেন সেখানে বহু অবৈধ লেনদেন হয়ে থাকতে পারে। রিয়া এবং তাঁর ভাইয়ের কাছ থেকে আয়কর রিটার্নের কাগজপত্র চেয়েছে ইডি।  
সুশান্ত মামলার তদন্ত বিহার পুলিশের কাছ থেকে মুম্বই পুলিশের হাতে নিয়ে আসার আবেদন জানিয়েছিলেন রিয়া সুপ্রিম কোর্টে। শনিবার পাল্টা হলফনামা দাখিল করলেন সুশান্তের বাবা কে কে সিং। তাঁর বক্তব্য, বিহারের রাজীবনগর থানায় করা তাঁর এফআইআর–এর তদন্তভার ইতিমধ্যেই সিবিআইয়ের হাতে চলে গেছে। তাই রিয়ার এই আবেদন এখন অপ্রাসঙ্গিক। বলা হয়েছে, রিয়া যদি নিজেই সিবিআই তদন্ত চেয়েছিলেন, তাহলে এখন তাঁর কীসের সমস্যা? কে কে সিং–এর হলফনামায় মুম্বই পুলিশের ভূমিকারও তীব্র নিন্দা করা হয়েছে। ‌ সু্প্রিম কোর্টে রিয়ার আবেদনের শুনানি ১১ আগস্ট। 
পারিবারিক যোগাযোগ কাজে লাগাতে তৎপর সুশান্তের পরিবার। মহারাষ্ট্র এবং বিহারের মধ্যে তীব্র দড়ি টানাটানির মধ্যেই শনিবার, হরিয়ানার মুখ্যমন্ত্রী মনোহরলাল খট্টরের সঙ্গে দেখা করলেন সুশান্তের বাবা এবং দিদি রানি সিং। মুখ্যমন্ত্রী তাঁদের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন। উল্লেখ্য হরিয়ানার ফরিদাবাদের পুলিশ কমিশনার পদে আছেন সুশান্তের জামাইবাবু ও পি সিং। অন্যদিকে সুশান্ত মৃত্যুরহস্য তদন্তে মুম্বই আসা বিহার পুলিশের আইপিএস তথা তদন্তকারী দলের প্রধান বিনয় তিওয়ারি দাবি করেছেন, বৃহন্মুম্বই পুরসভা তাকে কোরেন্টিনে পাঠিয়ে দেওয়ার ফলে সুশান্ত কেসের তদন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গত ২ আগস্ট পাটনা থেকে মুম্বই এসেছিলেন বিনয় তিওয়ারি। 
এদিকে গত শুক্রবার ইডি–র জেরায় রিয়া চক্রবর্তী জানিয়েছেন, তাঁর কাছে সুশান্তের একটি মাত্র ‘সম্পত্তি’ রয়েছে। সেটি হল, সুশান্ত অভিনীত ‘‌ছিছোরে’‌  ছবির স্টিকার লাগানো একটি জলের বোতল। এছাড়াও আছে সুশান্তের ডায়েরির ছেঁড়া পাতা। যেখানে রয়েছে সুশান্ত যে সব মানুষদের কাছে কৃতজ্ঞ ছিলেন তাঁদের নামের তালিকা। সেই ছেঁড়া লাইন টানা পাতার প্রথম লাইনে লেখা, ‘‌আমি আমার জীবনের জন্য কৃতজ্ঞ। আমার জীবনে বেবু আসার জন্য কৃতজ্ঞ। স্যারের কাছে কৃতজ্ঞ। লিল্লু এসেছে আমার জীবনে, সে জন্যও আমি কৃতজ্ঞ। ম্যামের জন্যও আমি কৃতজ্ঞ।’‌ সেই পৃষ্ঠার ছবি ইডির অফিসারদের দেখিয়ে রিয়া দাবি করেন, ‘‌এটা ওরই হাতের লেখা। লিল্লু মানে সৌভিক, বেবু মানে আমি, স্যার অর্থাত্‍ আমার বাবা এবং ম্যাম মানে আমার মা। ফাজ হল ওর পোষা কুকুর।’ সুশান্তের ডায়েরির ছেঁড়া পৃষ্ঠা সম্পর্কে এর আগে সুশান্তের বন্ধু সিদ্ধার্থ পিঠানি পুলিশকে জানিয়েছিলেন, কোনও লেখা পছন্দ না হলে ডায়েরির পাতা ছিঁড়ে ফেলতেন সুশান্ত। ইডির আধিকারিকদের বেশিরভাগ প্রশ্নেরই উত্তর দেননি রিয়া। বার বার দাবি করেছেন, তিনি কোনও অপরাধ করেননি। তবে মুম্বইয়ের অভিজাত এলাকায় রিয়ার বিলাসবহুল দুটি ফ্ল্যাট, তাঁর আয়কর রিটার্ন, ব্যবসায়িক লেনদেন বা পেশাগত আর্থিক ব্যপারগুলি খতিয়ে দেখছে ইডি। কে কে সিং–এর  এফআইআর–এর ভিত্তিতে শনিবারই সুশান্তের বন্ধু সিদ্ধার্থ পিঠানিকেও জেরার জন্য ডেকে পাঠিয়েছিল ইডি।
এদিকে সুশান্ত কেসে এখনও সিবিআই তদন্তের বিরোধিতা করে চলে চলেছে মহারাষ্ট্র সরকার। শনিবার নাগপুরে মহারাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অনিল দেশমুখ বলেছেন, সুশান্ত সিংয়ের মৃত্যু নিয়ে সিবিআই তদন্তের কোনও প্রয়োজনই নেই। মুম্বই পুলিশ ঠিকঠাকই তদন্ত চালাচ্ছে। কিন্তু ইতিমধ্যেই বিহার পুলিশের হাত থেকে তদন্তভার নিয়ে নিয়েছে সিবিআই। দুটি দলে ভাগ হয়ে রহস্য সমাধানে চেষ্টা চালাচ্ছেন কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা। এদিকে সসুশান্তের ফরেন্সিক রিপোর্ট নিয়ে উঠছে নানা প্রশ্ন।  জানা গেছে, অভিনেতার নখের নমুনা নাকি পরীক্ষা করতে পাঠানোই হয়নি।  করা হয়নি সোয়াব টেস্ট। ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞদের দাবি, সুশান্ত যে সিলিং ফ্যান থেকে ঝুলছিলেন, তা যথেষ্ট বাঁকা ছিল না। সুশান্তের প্রাক্তন সহায়ক অঙ্কিত আচার্য এক সাক্ষাৎকারে অভিযোগ করেছেন, সুশান্তকে খুন করা হয়েছে। বলেছেন, ‘‌সুশান্ত ভাইয়া যদি নিজে গলায় দড়ি দিতেন তবে তাঁর গলায় ইংরেজি ‘‌ইউ’‌ শেপের দাগ থাকার কথা। ঠেলে বেরিয়ে আসার কথা ছিল তাঁর চোখ ও জিভ। সে সব কিছুই মেলেনি। বরং গলায় মিলেছে ইংরেজি ‘‌ও’‌ শেপের দাগ। ওই দাগ সুশান্তেরই পোষা কুকুর ফাজ এর গলার বেল্টের। সেই বেল্ট গলায় লাগিয়েই শ্বাসরোধ করে খুন করা হয়েছে সুশান্ত ভাইয়াকে।’‌ ২০১৯– এর আগস্ট পর্যন্ত সুশান্তের সঙ্গে কাজ করেছিলেন অঙ্কিত।   
সোশ্যাল মিডিয়ায় রিয়াকে সমর্থন করে লেখার জন্য ক্ষোভের মুখে পড়েছেন অভিনেতা আয়ুষ্মান খুরানা। নেটিজেনরা তাঁকে বয়কটের ডাক দিয়েছেন। অন্যদিকে সুশান্তের জন্য ন্যায় বিচারের দাবি এবার ক্যালিফোর্নিয়াতেও। সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল সেই ভিডিও। সুশান্তের দিদি শ্বেতা সিং কীর্তি শেয়ার করেছেন সেই ভিডিও। জানিয়েছেন ক্যালিফর্নিয়ার উত্তরে গ্রেট মল পার্কের কাছে লাগানো হয়েছে একটি বিলবোর্ড। লেখা হয়েছে, ‘‌জাস্টিস ফর সুশান্ত সিং রাজপুত’‌।  সুশান্তের মৃত্যু তদন্ত সিবিআই–এর হাতে যাওয়ার পর থেকেই আরও একটি হ্যাশট্যাগ ভাইরাল হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। তা ব্যবহার করে একাধিক পোস্ট করেছেন সুশান্তের দিদি, তাঁর প্রাক্তন প্রেমিকা অঙ্কিতা লোখান্ডে, অভিনেত্রী কঙ্গনা রানাওয়াত, বন্ধু মহেশ শেট্টি এবং বিজেপি সাংসদ সুব্রহ্মণ্যম স্বামীর মতো বহু মানুষ।‌


‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top