আজকালের প্রতিবেদন
শ্রীনগর, ১৪ আগস্ট

রাজনীতির আঙিনায় আসার ১৮ মাসের মধ্যেই বৈরাগ্য!‌ ‘‌রেজিগনেশন ম্যান’‌ তকমাটা লেগেই গেল প্রাক্তন আইএএস অফিসার শাহ ফয়জলের নামের সঙ্গে। 
আমলার চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে জম্মু অ্যান্ড কাশ্মীর পিপলস মুভমেন্ট (‌জেকেপিএম)‌ দল গড়েছিলেন ফয়জল। সেই দলের সভাপতি পদে ইস্তফা দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছেন। কিন্তু কেন?‌ শাহ ফয়জলের অকপট স্বীকারোক্তি, ‘‌আইএএস হওয়ার পর ইস্তফা দেওয়ায় ভালর চেয়ে মন্দ ঢের বেশি হয়েছে।’‌ আইএএসের পদে তাঁর ইস্তফাপত্র কিন্তু এখনও গৃহীত হয়নি। তাই ফের তাঁকে আমলার আসনে দেখা যেতে পারে। শাহ ফয়জলের সহাস্য জবাব, ‘‌রাজনীতিকে বিদায়। রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে থেকে যে–‌কোনও বিষয়কে দেখতে চাই। জীবন যেভাবে আমাকে চালাবে সেভাবে চলব।’‌‌
আইএএসের চাকরি ছেড়ে রাজনৈতিক দল গঠন করে এক সময় তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন কাশ্মীরি যুবক শাহ ফয়জল। জনতাকে, বিশেষত তরুণদের সামনে রাজনৈতিক বিকল্প নিয়ে আসার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তারপর কী এমন হল যার জন্য রাজনীতি ছাড়ার সিদ্ধান্ত?‌ ‘‌দ্য অয়্যার’‌–এর প্রশ্নের উত্তরে ফয়জল বলেন, ‘‌২০১৯ সালের ৫ আগস্টের পর জম্মু–কাশ্মীরের রাজনৈতিক চালচিত্র বদলে গিয়েছে। রাজনীতিতে হাতেখড়ি হতে না হতেই আটক হয়ে গেলাম। সিভিল সার্ভিসের যথাযথ ব্যবহার করতে পারলাম না। কাশ্মীরি রাজনীতির ধরনটাই আলাদা। আমার সামান্য মতবিরোধকেও বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে দেখা হয়েছে। তাতে সিভিল সার্ভিসে আগ্রহীরা নিরুৎসাহিত হয়েছেন। সহকর্মীরা বিরক্ত হয়েছেন।’‌
কাশ্মীরের পরিবর্তন প্রয়োজন, প্রতিষ্ঠিত কোনও রাজনৈতিক দল তা পারবে না, সিভিল সার্ভিসে থেকেও সে কাজ হবে না, এইসব কথা বলে জেকেপিএম দল গড়েছিলেন। রোগ নির্ণয়ে কি ভুল হয়েছিল?‌ ফয়জলের জবাব, ‘‌নির্ণয়ে ভুলের ব্যাপার নয়। আমি কখনও বলিনি অফিসার হয়ে দুর্দান্ত কিছু করা যাবে না। কিন্তু আমাদের মতো গণতান্ত্রিক দেশে প্রভাব সৃষ্টির বড় ক্ষেত্র রাজনীতি। আমার ক্ষেত্রে রাজনীতি নিয়ে নয়, যে–পথে রাজনীতিতে এসেছি তা নিয়েই সমস্যা।’‌
গত বছর ৫ আগস্টের পর গৃহবন্দি হয়েছিলেন তিনি। হেবিয়াস করপাসের আওতায় দিল্লি হাইকোর্টে আবেদন করেছিলেন। অথচ শুনানির আগেই আবেদন প্রত্যাহার করে নেন। প্রসঙ্গ উঠতে প্রাক্তন আমলা বলেন, ‘‌রাজনৈতিক বিষয়কে আদালতে টেনে নিয়ে যেতে চাইনি।’‌ তবে কী কাশ্মীর ইস্যুতে নীরব থাকার শর্তেই বন্দিদশা থেকে মুক্তি পেয়েছেন?‌ ফয়জলের ছোট্ট জবাব, ‘‌গণ নিরাপত্তা আইনের আওতায় আটক করা হয়েছিল। নিঃশর্তে মুক্তি পেয়েছি।’‌
২০১৯ সালের ৫ আগস্টের পর কাশ্মীরের রাজনীতি কতটা বদলেছে?‌ ফয়জলের জবাব, ‘‌সত্যি কথা বলতে ৫ আগস্ট ভারতীয় সংবিধানের চৌহদ্দিতে থেকে কাজ করে চলা একটা ধূসর অঞ্চলকে মুছে দিয়েছে। এখনও প্রকৃত অর্থে সংহত রাষ্ট্রচেতনা তৈরি হওয়ার পথে বাধা র‌য়েছে। এখন দেহে–মনে হয় আপনি ভারতীয়, না হলে নয়। হয় পক্ষে, নয় বিরুদ্ধে।’‌ ৩৭০ ধারা, ৩৫–ক ধারা তুলে দেওয়ায় কী জম্মু–কাশ্মীরে রক্তপাত কমবে?‌ ফয়জল বলেন, ‘‌ভুলভাল ভবিষ্যদ্বাণী করতে চাই না। কাশ্মীর নিয়ে কিছু বলা যায় না। আমরা ভবিষ্যতে হিংসামুক্ত উন্নত জম্মু–কাশ্মীর দেখতে চাই। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান সর্বদা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই সমস্ত ক্ষেত্রের উন্নতির জন্য আর্থিক উন্নয়ন জরুরি, অভিজ্ঞতা থেকেই বলেছিলাম সেকথা।’‌
৩৭০ ধারা বিলোপকে সংসদের ভিতর সংবিধানের হত্যা বলে বর্ণনা করেছিলেন। এখনও কি সেটাই ভাবছেন?‌ ফয়জলের জবাব, ‘আমি বুঝতে পেরেছি প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রের মূল বিষয় নিয়েই প্রশ্ন করেছিলাম। ১৯৪৯ সালে সংসদেই ওই ধারাকে সংবিধানভুক্ত করা হয়েছিল। ২০১৯ সালে সেই সংসদেই ধারাটি ছেঁটে ফেলা হল। গণতন্ত্রে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় ঐকমত্যের চেহারা বদলে যায়। তা মানতে হয়। আমার প্রতিক্রিয়া তখন যথাযথ ছিল না।’‌‌‌‌

আমলার ইস্তফা
    শাহ ফয়জলের পদত্যাগ পত্র কখনও গৃহীতই হয়নি। তার অর্থ, তাঁর জন্য দরজা খোলা আছে।
    চাকরি ছাড়ার কারণ লিখিতভাবে জানিয়ে চিঠি লিখতে হয়। কেন্দ্রীয় কর্মী সংক্রান্ত দপ্তরের নির্দেশিকায় বলা আছে, পদত্যাগের বিষয়টি হবে স্বচ্ছ এবং নিঃশর্ত। 
    নিজ ক্যাডারে কর্মরত আইএএস অফিসার পদত্যাগপত্র জমা দেবেন সংশ্লিষ্ট রাজ্যের মুখ্যসচিবের কাছে। কেন্দ্রের ডেপুটেশনে থাকা অফিসার চিঠি জমা দেবেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রকের সচিবের কাছে। মন্ত্রক থেকে মন্তব্য–‌সহ চিঠি পাঠানো হবে সংশ্লিষ্ট রাজ্য ক্যাডারকে।
    পদত্যাগপত্র পাওয়ার পর রাজ্য দেখে, ওই আইএএস অফিসারের কাছ থেকে কোনও পাওনা বকেয়া রয়েছে কি না, ভিজিল্যান্স সংক্রান্ত সমস্যা আছে কি না। সেসব জানিয়ে পদত্যাগের চিঠি ফরোয়ার্ড করা হয় কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে। সব দেখে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয় কেন্দ্রের কর্মী ও প্রশিক্ষণ সংক্রান্ত দপ্তর।

জনপ্রিয়

Back To Top