রাজীব চক্রবর্তী
লকডাউন কি ১৪ এপ্রিল উঠে যাবে, না কি দীর্ঘায়িত হবে?‌ সোমবার ভিডিও কনফারেন্সে মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় এই প্রশ্নের কোনও জবাব দিলেন না কেন্দ্রীয় তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী প্রকাশ জাভড়েকর। তিনি বলেন, ‘‌আমরা গোটা বিশ্বের পরিস্থিতির ওপর সারাক্ষণ নজর রাখছি। জাতীয় স্বার্থে যা প্রযোজন সেইরকম সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। সঠিক সময়ে সেই সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেওয়া হবে।’‌ তার আগে বিজেপি–‌র প্রতিষ্ঠা দিবস উপলক্ষে তাঁর ভাষণে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি করোনা ভাইরাস প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘‌সামনে দীর্ঘ লড়াই।’‌ এই সমস্ত বক্তব্য থেকে ইঙ্গিত মিলেছে, লকডাউন ১৪ তারিখ শেষ হবে কি না তা নিয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। পরে এদিন সন্ধেয় বিভিন্ন মন্ত্রকের আমলাদের নিয়ে বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন কমিটির বৈঠক হয়। সেখানে আজ পর্যন্ত কী পরিস্থিতি তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।  
সরকারি সূত্রের বক্তব্য, ১৫ তারিখ যদি লকডাউন তুলে নেওয়া হয়, তাহলেও তা আংশিকভাবে তোলা হবে। সেক্ষেত্রে অত্যাবশ্যকীয় পরিষেবার পাশাপাশি আরও কিছু পরিষেবা ও সরকারি দপ্তর আংশিক খোলা হতে পারে। যানবাহন চলাচলে নিয়ন্ত্রণ রাখা হতে পারে। কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে ট্রেন চলাচল শুরু হতে পারে। চালু হতে পারে কিছু বিমান পরিষেবাও। তবে, গোটা দেশে ২৭৪ জেলায় করোনা সংক্রমণের হদিশ মিলেছে। ওই জেলাগুলিতে করোনা ভাইরাস সংক্রমণের হার ক্রমশ ঊর্ধ্বমুখী। এই জেলাগুলিতে বেশ কিছু নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা হতে পারে। তাছাড়া করোনা–‌যুদ্ধে বিভিন্ন রাজ্যে ৩০টির মতো ‘‌হটস্পট’‌ চিহ্নিত করেছে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রক। ওই এলাকাগুলিতে একশো শতাংশ লকডাউন জারি রাখা হতে পারে বলে সূত্রের খবর।
তবে, লকডাউন পুরোপুরি তোলার ক্ষেত্রে কোভিড–১৯ সংক্রমণ কী অবস্থায় রয়েছে, সেটাই যে নির্ণায়ক হবে তা স্পষ্ট হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর গড়া টাস্ক ফোর্সের সদস্য রামন আর গঙ্গাখেড়করের কথায়। তিনি জানান, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল সংক্রমণের শৃঙ্খলকে ছিন্ন করা। তাৎপর্যপূর্ণভাবে তিনি জানিয়েছেন, এখন টেস্ট কিট ও আনুষঙ্গিক সরঞ্জামের বিপুল ঘাটতি রয়েছে। ঘাটতি রয়েছে ভেন্টিলেটরেরও। এপ্রিলের শেষে অ্যান্টিবডি টেস্ট কিটগুলো তৈরি হয়ে যাবে। এই কিটে পরীক্ষা শেষ হবে ১৫ থেকে ২০ মিনিটের মধ্যে। ঘাটতি মেটাতে কেন্দ্রীয় সরকার ৫০ লক্ষ অ্যান্টিবডি টেস্ট কিটের বরাত দিয়েছে। অ্যান্টিবডি টেস্টেই সবচেয়ে ভাল ফল পাওয়া যায়। তাই দ্রুত পরীক্ষা হলে সংক্রমণের মাত্রাও তাড়াতাড়ি ধরা পড়বে। 
আইসিএমআর‌এর সংক্রামক রোগ ও মহামারী বিভাগের প্রধান গঙ্গাখেড়কর বলেন, কত দিনে সংক্রামিতদের সংখ্যা দ্বিগুণ হচ্ছে, তার হার দেখেই বোঝা যাবে করোনা নিয়ন্ত্রণে এসেছে কি না। তঁার মতে, পরবর্তী তিন সপ্তাহে কতজন কোভিড–১৯ পজিটিভ রোগীর খেঁাজ মিলছে, তার ওপরেই লকডাউন প্রত্যাহারের বিষয়টি নির্ভর করবে। লকডাউন কতটা শিথিল হবে, সেই সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে সংক্রমণের হটস্পটগুলি। গঙ্গাখেড়কর বলেন, গোষ্ঠী সংক্রমণের পর্যায়ে এখনও পৌঁছোয়নি ভারত। তবলিগি জমায়েতের প্রভাব ২০০ জেলায় পড়লেও একে গোষ্ঠী সংক্রমণ বলা যাবে না।
এর আগে সরকারের তরফে জানানো হয়েছে, লকডাউনের মেয়াদ বাড়ানো নিয়ে কোনও সিদ্ধান্ত নেয়নি সরকার। তারপর পরিস্থিতি আরও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে। এর মধ্যে উত্তরপ্রদেশের অতিরিক্ত মুখ্য সচিব অবনীশ অবস্থি এদিন বলেছেন, ‘লকডাউন তখনই পুরোপুরি খোলা হবে যখন রাজ্যে আর করোনার রোগী থাকবেন না। যতক্ষণ একজনও করোনা পজিটিভ মানুষ থেকে যাবেন, ততক্ষণ লকডাউন তোলা কঠিন। কাজেই এর জন্য সময় লাগতে পারে।’‌ এ সবের পাশাপাশি এখনকার মতো লকডাউন চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা হল, এর গেরোয় আটকে পড়েছেন অসংখ্য দরিদ্র‌ মানুষ। কাজ হারিয়ে দু’‌বেলা অন্নের সংস্থান নিয়ে চিন্তায় বহু মানুষ। সবচেয়ে বড় কথা, সার্বিক লকডাউন দীর্ঘায়িত হলে দেশের অর্থনীতি গভীর থেকে গভীরতর সঙ্কটে চলে যাবে। 
এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রী এদিন বিজেপি–‌র ৪০তম প্রতিষ্ঠা দিবস উপলক্ষে বক্তৃতায় বলেছেন, ‘সামনে দীর্ঘ লড়াই। এজন্য দেশবাসীকে প্রস্তুত থাকতে হবে। করোনার বিরুদ্ধে জয় না–আসা পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যেতে হবে।’‌ আরও বলেছেন, ‘‌এবার এমন এক সময়ে দলের প্রতিষ্ঠা দিবস পালিত হচ্ছে যখন শুধু ভারতই নয়, সমগ্র বিশ্ব এক কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে চলেছে। মানবতার এই সঙ্কটের সময় একনিষ্ঠভাবে দেশের সেবা করে যেতে হবে।’ করোনার সংক্রমণের জেরে ২৪ মার্চ দেশ জুড়ে ২১ দিনের লকডাউন ঘোষণা করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী। এদিন করোনা পরিস্থিতিতে নিজেদের জীবনপণ করে যাঁরা কাজ করে চলেছেন, সেই চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী এবং জরুরি পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত মানুষকে ধন্যবাদপত্র পাঠানোর পরামর্শ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।‌

জনপ্রিয়

Back To Top