রাজীব চক্রবর্তী,দিল্লি: ২৬ আগস্ট পর্যন্ত সিবিআই হেফাজতে থাকবেন পি চিদম্বরম। কারণ, প্রাপ্ত তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে তাঁকে হেফাজতে নেওয়া যুক্তিসঙ্গত বলে মনে করেছেন রাউজ অ্যাভিনিউ কোর্টের বিশেষ বিচারক অজয়কুমার কুহার। একইসঙ্গে বৃহস্পতিবার বিচারক তাঁর নির্দেশে বলেন, এই ক’‌দিন আধ ঘণ্টার জন্য তাঁর সঙ্গে দেখা করতে পারবেন পরিবারের সদস্যরা। 
সিবিআই সূত্রের খবর, বুধবার বেশি রাতে এবং এদিন সকাল ৮টা থেকে দু’‌‌দফায় সিবিআই কর্তাদের মোট ২০টি প্রশ্নের মুখে পড়তে হয় চিদম্বরমকে। এর বেশিরভাগই তাঁর ও ছেলে কার্তির লেনদেন সম্পর্কে। তবে, কোনও সাংবাদিক বা অন্য কোনও ব্যক্তির বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়নি তাঁর কাছে। তারপর এদিন বিকেল ৩টে ২০ মিনিটে দুর্নীতি বিষয়ক দিল্লির বিশেষ আদালতে তোলা হয় প্রাক্তন স্বরাষ্ট্র ও অর্থমন্ত্রীকে। আদালত জানিয়েছে, ২৭ আগস্ট ইডি–‌‌র আবেদন শোনা হবে। সেক্ষেত্রে আবার তাঁকে হেফাজতে নেওয়ার আর্জি জানাতে পারে ইডি।
এদিন কাঠগড়ায় উঠে নিজে কিছু বলতে চান চিদম্বরম। দুই আইনজীবী কপিল সিবাল ও অভিষেক মনু সিংভি নিজেদের যুক্তি পেশ করার পরেও তাঁকে বলার অনুমতি দেন বিচারপতি। এরপর বিচারপতির উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘‌২০১৮ সালের ৬ জুন ‌ওঁরা (‌সিবিআই)‌ জানতে চেয়েছিলেন বিদেশে আমার ছেলের কোনও ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট আছে কিনা। আমি বলেছি, হ্যাঁ আছে।’‌ আরও বলেন, ‘‌সিবিআই আমাকে আগে জেরা করেছে। সব প্রশ্নের জবাব দিয়েছি। পূর্ণ সহযোগিতা করেছি। দয়া করে প্রশ্নোত্তরের সেই নথি পড়ে দেখুন। ওঁরা আমার বিদেশে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের কথা জানতে চেয়েছিল। আমি বলেছি নেই।’‌ তার আগে আদালত কক্ষে ঢোকার সময় চিদম্বরম সিবিআই আধিকারিকদের বলেন, ‘‌নতুন আদালত, ভেবেছিলাম বড় ঘর হবে। এখন দেখছি বড্ড ছোট ঘর।’‌ রাউজ অ্যাভিনিউ আদালত ভবনের উদ্বোধন হয়েছিল গত এপ্রিলে। আর্থিক প্রতারণার সব মামলার শুনানি হবে এই আদালতেই।
দিল্লি হাইকোর্ট তাঁর আগাম জামিনের আর্জি খারিজ করে দেওয়ার পর টানা ২৭ ঘণ্টা ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিলেন চিদম্বরম। তারপর হাজির হন কংগ্রেসের সদর দপ্তরে। সেখানে সাংবাদিক বৈঠক সেরে বাড়ি ফেরেন। তারপর বুধবার রাতে রীতিমতো পাঁচিল টপকে বাড়িতে ঢুকে তাঁকে গ্রেপ্তার করেছেন সিবিআই আধিকারিকরা। আজ আদালতে চিদম্বরমের পক্ষে সওয়াল করে জামিনের আর্জি জানান কপিল সিবাল ও অভিষেক মনু সিংভি। যদিও তা ধোপে টেকেনি।  সিবালের সওয়াল ছিল, মামলার অপর অভিযুক্ত কার্তি চিদম্বরমকে জামিন দিয়েছে দিল্লি হাইকোর্ট। চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ভাস্করমান আগাম জামিনে রয়েছেন। পিটার ও ইন্দ্রাণী মুখার্জিরাও এই মামলায় জামিন পেয়েছেন। তাহলে চিদম্বরমকে হেফাজতে নেওয়া হবে কেন, প্রশ্ন তোলেন তিনি। সিংভি যুক্তি খাড়া করেন, এই মামলায় তথ্য–‌প্রমাণের বালাই নেই। তাঁর মক্কেলকে অন্য উদ্দেশ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। 
উল্টোদিকে, সিবিআইয়ের আইনজীবী সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা এদিন চিদম্বরমের বিরুদ্ধে তদন্তে অসহযোগিতার অভিযোগ তোলেন। সেইসঙ্গে তদন্তের স্বার্থে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৫ দিন সিবিআই হেফাজতে রাখার আবেদন জানান। আদালতে মেহতা বলেন, ‘‌আর্থিক দুর্নীতির ক্ষেত্রে এটি দৃষ্টান্তমূলক মামলা। তাঁর বিরুদ্ধে জামিন অযোগ্য ধারায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছিল। তিনি নিখোঁজ ছিলেন। তারপর গ্রেপ্তার করা হয়েছে।’‌ তিনি দিল্লি হাইকোর্টের রায়ের প্রতিলিপিও দেন বিচারককে। হাইকোর্ট বলেছিল, এই মামলায় চিদম্বরমকে হেফাজতে নিতে না–দেওয়া হলে সমাজে ভুল বার্তা যাবে।
‘‌অসহযোগিতা’‌ প্রসঙ্গে আদালতে সিংভি বলেন, ‘‌জিজ্ঞাসাবাদের জন্য কাউকে ৫ বার ডাকা হলে তিনি যদি একবারও না যান, তাকে অসহযোগিতা বলা হয়। কিন্তু, চিদম্বরমকে একবার ডাকা হয়েছে। তিনি হাজির হয়েছেন। তাই অসহযোগিতার অভিযোগ ভিত্তিহীন। তদন্তকারীদের অভিযোগ মেনে নিলে তবেই কি সহযোগিতা করা হবে!‌’‌ এর উত্তরে তুষার মেহতা বলেন, অভিযুক্তের নীরব থাকার সাংবিধানিক অধিকার আছে। কিন্তু চিদম্বরমের কাছ থেকে অনেক তথ্য ও নথি পাওয়া প্রয়োজন।
২০০৭ সালে চিদম্বরম যখন অর্থমন্ত্রী, তখন বেআইনি ভাবে আইএনএক্স মিডিয়াকে ৩০৫ কোটি টাকার বিদেশি লগ্নি পাইয়ে দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ। সংস্থার কর্ত্রী ইন্দ্রাণী মুখার্জি জেরায় সিবিআইয়ের কাছে স্বীকার করেছেন, ২০০৮ সালে অর্থমন্ত্রী চিদম্বরম তাঁকে ওই লগ্নিতে সহযোগিতা করেছিলেন। বিনিময়ে ছেলে কার্তির কোম্পানিতে টাকা দিতে বলেছিলেন।‌ নিজের মেয়ে শিনা বরার হত্যায় অভিযুক্ত ইন্দ্রাণী এই মামলার রাজসাক্ষী।‌

 

আদালতের পথে চিদম্বরম। বৃহস্পতিবার। ছবি: পিটিআই

জনপ্রিয়

Back To Top